কলকাতা টেকস্পার্কস দিল সাফল্যের রোড ম্যাপ

আকাশের মুখ কখনও গোমড়া কখনও রোদ ঝিকোচ্ছে, মাঝে মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। তা সত্ত্বেও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অডিটোরিয়ামটা উপচে পড়ছে ভিড়ে। কে বলে কলকাতায় স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ নেই! দেড়টায় শুরু হয়েছিল রেজিস্ট্রেশন। আধঘণ্টায় ঘর ভরে গিয়েছে আলো-ঝলমলে তরুণ উদ্যোগপতির ভিড়ে।

2
কলকাতায় টেকস্পার্কস। টেকস্পার্কস, ইওরস্টোরির এমন এক ইভেন্ট যেখানে যোগ দিতে মুখিয়ে থাকে টেক স্টার্ট আপ সংস্থাগুলি। দেশের তাবড় উদ্যোগপতিরা আসেন। 

বেঙ্গালুরুতে রীতিমত চাঁদের হাট বসে। এবারও হবে সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ এবং অক্টোবরের ১ তারিখ। এবারও আসবেন গোটা দুনিয়ার টেক সংস্থার কর্ণধাররা। যোগ দিতে আসবে গোটা দেশের বিভিন্ন কোণা থেকে টেক স্টার্টআপ। তার আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে তারই টিজার ইভেন্ট। দুদিন আগে হয়ে গেল হায়দরাবাদে। ২৫ তারিখ হল কলকাতায়। বৃহস্পতিবার। আকাশের মুখ কখনও গোমড়া কখনও রোদ ঝিকোচ্ছে, মাঝে মাঝেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। তা সত্ত্বেও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অডিটোরিয়ামটা উপচে পড়ছে ভিড়ে। কে বলে কলকাতায় স্টার্টআপের ভবিষ্যৎ নেই! দেড়টায় শুরু হয়েছিল রেজিস্ট্রেশন। আধঘণ্টায় ঘর ভরে গিয়েছে আলো-ঝলমলে তরুণ উদ্যোগপতির ভিড়ে।

কলকাতার সিবিয়া অ্যানালাইটিকসের কর্ণধার অংশুমান ভট্টাচার্য শুরু করলেন তাঁর পথ চলার কথা দিয়ে। ডেটা অ্যানালাইটিকসের কাজে কলকাতার ভবিষ্যৎ এবং ভাবনার নানা দিক উঠে এলো অংশুমানের আলোচনায়। তাঁর মতে বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস করার কাজটা দারুণ হতে পারে। কারণ এখানে যোগ্য ছেলেমেয়ে রয়েছে। প্রতিভার কমতি নেই। কিন্তু সেই প্রতিভার ব্যবহার ঠিক মত হচ্ছে না। অংশুমানের বক্তব্য, কলকাতায় সম্ভাবনা অনেক আছে। কিন্তু একটু আধটু পরিবর্তন দরকার। যেমন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে ডেটা অ্যানালাইসিস ম্যাজিকের মত কাজ করবে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপতিদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। দাম নিয়ে অত্যধিক সতর্ক। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে কম দামে, চাই কি জলের দরে তথ্য বিশ্লেষণ দারুণ হতে পারে। তথ্যের অভাবের অজুহাত আর চলে না। এখন প্রচুর তথ্য সহজেই পাওয়া যায় যেখান থেকে প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর সেটা সত্যিই ম্যাজিকের মত কাজ করতে পারে। ভবিষ্যতের স্ট্র্যাটিজি তৈরিতে ডেটা অ্যানালাইসিসকে ওষুধের মত প্রয়োজনীয় বলছেন অংশুমান। আর কলকাতার প্রশ্নে অংশুমানের দাবি তিনি কলকাতায় থেকে কাজ করতেই চান। 

সান ফ্রান্সিসকোয় কাজ করেছেন, বেঙ্গালুরুর মত ভারতের অন্যান্য শহরে কাজ করেছেন। কিন্তু কলকাতায় থেকে কাজ করে তিনি খুশি। বলছেন কলকতা বদলাচ্ছে।

কলকাতা নিয়ে আশাবাদী ওয়াও মোমোর সহ প্রতিষ্ঠাতা বিনোদ কুমার হোমাগাইও। তিনি বলছেন, বন্ধন ব্যাঙ্ক পেরে থাকলে আপনি পারবেন না কেন? কলকাতা কোনও অংশে কম নয়। বরং অন্য শহরের তুলনায় কলকাতা অনেক ব্যাপারে এগিয়ে। ২০০৮ সালে মাত্র তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসায় নেমেছিলেন বিনোদ কুমার হোমাগাই এবং তার বন্ধু সাগর দরিয়ানি। আজ একশ কোটির ব্যবসা ওয়াও মোমো। হাজার লোকের কাজ দিয়েছে এই স্টার্টআপ। দশ কোটি টাকার ফান্ডিং পেয়েছে এই সংস্থা। গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ওয়াও মোমো। কলকাতায় হেন জায়গা নেই যেখানে ওয়াও মোমোর হলুদ কাউন্টার নেই। পথ চলতি মানুষ থেকে বাছাই করা কাস্টমর সকলের সবরকম পকেটের চাহিদা মেটাচ্ছে ওয়াও মোমো। বিনোদ বলছেন আমাদের তো শুরুর দিনের বুটস্ট্ৰ্যাপিং থেকে আজ পর্যন্ত কখনও মনে হয়নি কলকাতা ছেড়ে যেতে হবে। বরং কলকাতাই সেই জায়গা যেখানে ক্রেতাদের ফিডব্যাক আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। কলকাতা হল ফুড টেম্পল। বিনোদ এটুকু বলেই থেমে থাকেননি, তিনি বলছেন, কলকাতায় ব্যবসা বাণিজ্য দারুণ সাফল্য পাচ্ছে, ফলে অযথা বাইরে চলে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।

ট্যাক্সমন্ত্রার প্রতিষ্ঠাতা অলোক পাতনিয়া বলছেন, এখানে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এখনও পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। আর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা বেশ ধীর লয়ে চলছে। কলকাতায় তরুণ প্রজন্মের স্টার্টআপ মেন্টর পান না। বিশেষজ্ঞরা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। অনতিক্রম্য হাজার একটা বাধা থাকে। বেঙ্গালুরুতে কিন্তু এই সমস্যা নেই। পাশাপাশি স্টার্টআপদেরও আরও একটু পরিণত হতে হবে। বুঝতে হবে কেবলমাত্র বিজনেস প্ল্যান, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেখেই বিনিয়োগকারী টাকা ঢালবেন না। একই কথা বললেন ক্যালকাটা অ্যাঞ্জেলসের চিফ অপারেটিং অফিসার সৌম্যজিত গুহ। রিস্ক নিতে হবে। সবসময় ইকোসিস্টেমকে দুষলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। কারণ সৌম্যজিতের মতে কলকাতার স্টার্টআপ ফান্ডিং পায়। তাঁদের সংস্থাই কলকাতার স্টার্টআপকে ফান্ড দিতে উৎসাহী। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্টার্টআপ সংস্থার কর্তারা আগেভাগে ফান্ডিং নিতে চলে আসেন। ব্যবসা করার মানসিকতার কথা বললেন স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত অ্যাপলিকেশন টিওর কর্ণধার রানা দত্ত। তিনি বলছেন কলকাতায় ব্যবসা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এবং তাঁর মতে গোটা ইকোসিস্টেমেই মানসিকতার সমস্যা রয়েছে। টাকা তৈরি না হলে ব্যবসা করার মানেই হয় না। যতদূর কলকাতার প্রশ্ন উঠছে, রানা এবং অলোকের সাফ কথা। অন্য যেকোনও শহরের তুলনায় কলকাতা অন্তত দশ গুণ ভালো। নিরাপদ শহর, বিদ্যুৎ যায় না, পরিকাঠামো আছে। ২০১০ থেকে টিও অ্যাপের যাত্রা শুরু। প্রথম দিনগুলোয় যখন বুটস্ট্র্যাপিং চলছিল সেই সময় ওদের ক্রেতা, গ্রাহকদের পয়সাতেই সংস্থা চলেছে এবং লাভের মুখ দেখেছে। ফলে ক্রেতা গ্রাহক এই শহরে আছে। শুধু চাই ঠিকঠাক ব্যবসা করার মানসিকতা। এর পর শুরু হল পিচিং। টেকস্পার্কসের কলকাতা ইভেন্টের হলে তখন একের পর এক উদ্যোগপতির দুর্দান্ত সব আইডিয়া যেন ফুলঝুরি ছোটাচ্ছে। সৌম্যজিত গুহ মন দিয়ে শুনলেন সবগুলি পিচিং। সকলের অগোচরে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও হয়ত তৈরি হল।