সৌম ও স্বরলিপির স্টার্টআপ ফেলুদার 'বৈঠক' খানা

3

রজনী সেন রোড। চট করে বলে ফেলুন তো কে থাকেন এখানে? উত্তরটা দিয়েই দি, প্রাইভেট ডিটেকটিভ প্রদোষ চন্দ্র মিত্তির ওরফে ফেলুদা। সত্যজিৎ রায়ের দৌলতে বাঙালির বইয়ের তাকে সগর্ব উপস্থিতি ফেলুদা সিরিজের। কিন্তু ফেলুদা থিমে ক্যাফে?একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে তো? কীভাবে রজনী সেন রোড থেকে ফেলুদা, ফেলুদা থেকে ক্যাফে এই সব জুড়ে গেল চলুন শোনা যাক সেই গল্প।

সৌম বন্দ্যোপাধ্যায় আর স্বরলিপি চট্টোপাধ্যায়। টিভি সিরিয়ালের দৌলতে একসময় সন্ধেয় বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতেন দুজনে। টেলিভিশনের পর্দায় চেনা মুখ। রুপোলি পর্দার হাতছানিও ছিল। সেদিকে অবশ্য পা বাড়লেন না কেউ। গতে বাঁধা লাইট,ক্যামেরা অ্যাকশনের একঘেয়ে দুনিয়ায় হাঁপিয়ে উঠছিলেন। দুজনেই খাদ্যরসিক। আর দেরি না করে সৌম আর স্বরলিপি ২০১২ সালে ফেলুদার পাড়ায় অর্থাৎ রজনী সেন রোডে খুলে ফেললেন বৈঠক কফি শপ। ২০১২ সালের কথা বলছি। ক্যাফের থিম ছিল ফেলুদা। কীভাবে? লন্ডনের 22 (1B) বেকার স্ট্রিটে আরেক ভূবন বিখ্যাত গোযেন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের নামে ক্যাফে থেকে অনুপ্রেরণা পান সৌমরা। ‘লন্ডনে যদি শার্লক হোমসের নামে ক্যাফে থাকতে পারে, এখানেও ফেলুদা থিমে ক্যাফে হতে বাধা কোথায়? বিশেষ করে বইয়ে পড়া সেই রজনী সেন রোড যখন ফেলুদার সৌজন্যেই লোকজনের চেনা’,বলছিলেন অভিনেতা থুড়ি কফি শপ মালিক সৌম বন্দ্যোপাধ্যায়। কফি শপের ইন্টিরিয়রের সবটা জুড়ে ফেলুদার ছাপ। তোপসে, ফেলুদা,লালমোহনবাবুর আড্ডার ছবি নানা দিকে ছড়িয়ে। ক্যাফেতে ঢুকলেই মনে হবে আপনি প্রদোষ মিত্তিরের বৈঠকখানায় বসে।কিছুদিনের মধ্যে বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে ক্যাফে। কিন্তু সেই যাত্রায় সফল হননি। বৈঠক কিছুদিনের মধ্যে মুখ খুবড়ে পড়ে। বন্ধ করে দিতে হয়। যদিও হাল ছাড়েননি সৌম,স্বরলিপি। কয়েক বছর পর কলেবরে আরও বেড়ে যোধপুরপার্কে নতুন ঠিকানায় ফিরে আসে আবার বৈঠক নামে,থিম সেই ফেলুদা।

‘আদতে কফি শপ। তার মধ্যে ফেলুদার বাড়ি বানানোর চেষ্টা। নানা কেসে ব্যবহার করা ফেলুদার পিস্তল, সিধু জ্যাঠার ম্যাগনিফাইং গ্লাস,কাঠের চিঠির বাক্স, ট্রানজিস্টার, লালমোহনবাবুর এভাররেডির টর্চ-খুঁটিয়ে বই পড়ে যত কিছু ফেলুদার ঘরে ছিল বলে মনে হয়েছে প্রায় সব দিয়ে সাজানো হয়েছে ক্যাফে। থিমটা এমন, যেন ফেলুদা কেসের কাজে বাইরে গিয়েছেন, তোপসে তাঁর আসার অপেক্ষায় বসে’, জমে ওঠে সৌমর সঙ্গে ক্যাফের ইন্টিরিয়র নিয়ে আড্ডা। বাবুকাকা মানে সন্দীপ রায়, যার সাহায্য ছাড়া এই ক্যাফে সাজানো একেবারেই সম্ভব ছিল না। বলছিলেন সৌম। কুশন কভারে ছড়িয়ে ফেলুদা,তোপসে আর লালমোহন গাঙ্গুলি। ছবি আঁকার অভ্যেস ছিল তোপসের। তেমনি একটা খাতা রাখা রয়েছে, যেখানে সবাই যে যার ইচ্ছে মতো আঁকতে পারবেন। গোটা ক্যাফে জুড়ে আরও কত কী-লালমোহনবাবুর সবুজ রঙা গাড়ি যেন ফেলুদার আসার অপেক্ষায়, ফেলুদা নাকি একশো রকম ইন্ডোর গেমস খেলতে পারতেন।সেই মতো রাখা হরেক ইন্ডোর গেমস। মগনলালের কাশীর বাড়িতে সেই বিখ্যাত গদ্দাই আর ক্যাশ বাক্স। মগনলালকে আর পুলিশ ধরতে পারে না। পুলিশের কাছে রেখে শান্তিও পান না ফেলুদা। তাই হাউস অ্যারেস্ট, নিজের বাড়িতেই রেখে দিয়েছেন সত্যজিতের গোয়েন্দা’, ব্যাখ্যা দেন ফেলুদার অন্ধভক্ত সৌম।

এতো গেল থিমের কথা। আরও চমক আছে। শুধু খানাপিনা নয়, আবার বৈঠকে লেগেই থাকে বৈঠক। প্রতি রবিবার ছোট ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গল্প বলার আসরের আয়োজনে দেখা মেলে এই শহরের সেলিব্রিটিদের। বইয়ের স্টল রয়েছে এক ধারে। বই পড়া এবং কেনা সবের ব্যবস্থা রেখেছেন সৌম এবং স্বরলিপি।ক্যফের একদিকে আবার প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন ছবি সাজানো রয়েছে।

খাবারের মান এবং পরিমান এইসবের দিকে নজর রাখেন সৌম। বাকিটা স্বরলিপির দায়িত্বে। টেলি সিরিয়ালে ফিরে যাওয়ার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেন না। ‘আমদানি এবং মনের খোরাক দুই যখন মিটে যাচ্ছে আর পুরনো কথা ভাবব কেন’? হেসে বোঝালেন স্বরলিপি। সুস্বাদু খাবার, ব্যাকগ্রাউন্ডে ফেলুদার সেই বিখ্যাত সিগনেচার টিউন, বই, আড্ডা আর উপরি পাওনা শহরের দুই সেলিব্রিটির আন্তরিকতা, আবার বৈঠকে এক ঢিলে অনেক পাখি কব্জায় চলে এলে মন্দ কী?

Related Stories