Google নয়, জীবন ম্যাপের হদিস দেয় Couplink

6
বাতাসে কি এখন একটু প্রেম প্রেম গন্ধ পাচ্ছেন! মাঘ সংক্রান্তির আগে পড়ে বাতাসে ফুলের যে গন্ধ রটে যায় তার নাম বিয়ের ফুল। যা অনেক আহ্লাদে ফোটে আবার ঝরেও যায় অতি অযত্নে, তীব্র অভিমানে।

বিয়ে এমনই এক জটিল যন্ত্র, যা না থাকলে গভীর যন্ত্রণা, আর থাকলে তো বটেই। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই এই দিল্লি কা লাড্ডু নিয়ে একমত। যারা এখনও স্বাদ পাননি, তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুর ভ্যালেন্টাইনের দিকে জুলুজুলু তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু জেনে রাখবেন বিয়ে টেকানো সোজা কাজ নয়। “তুমি যতই ঠাট্টা করো, ভাঙতে পারে তোমার ঘাড়ও।” এই কথাটা মনে রেখে জেনে নিন কে বা কারা আপনার এই ঘাড় মটকানো থেকে রেহাই দিতে পারে। না বিয়ে ভেঙে নয়। আপনাকে একটি সুখী দাম্পত্য উপহার দিয়ে। এবং এর জন্যেও রয়েছে কলকাতার একটি স্টার্টআপ সংস্থা Couplink.in।

অনেক ভাবনাচিন্তার ফসল কাপলিঙ্কের উদ্যোগটি। সারা দেশে বহু সংখ্যক বিয়েই সফল হচ্ছে না। ফলস্বরূপ ঘটছে ব্যাপকহারে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা। এই প্রবণতা রুখতে এবং নব্য বিবাহিত দম্পতির দাম্পত্যজীবন চিরসুখী করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করাই কাপলিঙ্কের মুখ্য উদ্দেশ্য। বিয়ের পরে বিবাহবিচ্ছেদের মতো দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়টিকে যাতে বিদায় করা যেতে পারে তাই কাজে নেমেছে কাপলিঙ্ক।

কাপলিঙ্কের কাজের উদ্দেশ্য মহান। এবং কোনও হুজুগে পড়ে এই কাজে নামেননি এই সংস্থার দুই প্রতিষ্ঠাতা তুহিন মাহাতো এবং সুস্মিতা মজুমদার। ওরা দম্পতি।

তাই দাম্পত্যের অন্দরমহলটা ওরা জানেন। পাশাপাশি বাইরের সমাজটাও জলের মত পরিষ্কার। কেননা পেশায় কনজিউমার রিসার্চর। ফলে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার মতো পূর্ব যোগ্যতা ওঁদের ছিলই। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে চালিয়েছিলেন সমীক্ষা। ২০১৫ সাল নাগাদ ভাঙা বিয়েগুলি নিয়ে ওঁরা পরিচিতজনেদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। একটা ধারণা তৈরি হয় তাতে। ওই সমীক্ষার ফলাফল দেখে এরপরে একটি সর্বভারতীয় স্তরে সমীক্ষা করানোর পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেই কাজটা করানো সহজ ছিল না। প্রয়োজন ছিল অনেক টাকার।

তবে নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে কাপলিঙ্কের উদ্যোগীরা সেই কাজেও হাত দেন। প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির। সমীক্ষার কাজ চালাতে প্রশ্নোত্তর তৈরি করা হয়। মুম্বাইয়ের একটি সংস্থাকে দিয়ে করানো হয় সর্বভারতীয় স্তরের ওই সমীক্ষার কাজ। সমীক্ষকরা বিবাহিত ও বিবাহ-বিচ্ছিন্ন দু'তরফের সঙ্গেই কথাবার্তা বলেন। ২০১৬ সালে ওই সমীক্ষাটির ফলাফল কাপলিঙ্কের হাতে এসে পৌঁছয়। এরপরেই ব্যাঙ্গালুরুর একটি সংস্থাকে দিয়ে সংস্থার ওয়েবসাইট করানো হয়। ওয়েব সাইটটির ঠিকানা - www.couplink.in।

বর্তমানে কাপলিঙ্ক বিয়ের আগে নারী‌-পুরুষকে এক বিশেষ ধরনের কাউন্সেলিং করিয়ে থাকে। এর ফলাফল থেকেই বিশেষজ্ঞরা জানিয়ে দেন, এক্ষেত্রে ওই বিয়েটি কেমন হবে। সফল হবে, নাকি ভেস্তে যাবে। অর্থ নষ্ট মনের কষ্ট যাতে না হয় তাই কাপলিঙ্ক কাউন্সেলিং এর পরিষেবা এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও সুস্মিতা এবং তুহিনের বক্তব্য, ভারতে যে পদ্ধতিতে বিয়ে হয়ে থাকে তাতে প্রি-ম্যারেজ কাউন্সেলিংয়ের সংস্কৃতি নেই বললেই চলে।

এদেশে বাবাজীদের টিয়ে পাখিরা বিয়ে নিয়ে বেশি কথা বলে। জ্যোতিষ সম্রাটেরা কোষ্ঠী বিচার করেই বলে দেন রাজযোটক না মাঙ্গলিক। ঝাড়ফুঁক তুকতাকের দেশে বিয়ে নিয়ে আরও অনেক কথা হওয়া উচিত।

একজন পুরুষের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাওয়া মেয়েটির মন, মানসিকতা, শিক্ষা, রুচি, মূল্যবোধ, বেড়ে ওঠা, নাক ডাকা, ঝাল-তেতো, ঝোল-অম্বল, বইপড়া, সিনেমা দেখা, যাত্রা ছোটা, কোথাও কোনও ঝিরঝিরে কমিউনিকেশন গ্যাপ আছে কিনা তা আগে ভাগে জানার পূর্ণ স্বাধীনতা দুজনেরই সমানভাবে থাকা উচিত। এবং সেই বিচারে কোনও বিয়ে টিকবে কিংবা টিকবে না, কিংবা একগাদা তেতো সম্পর্ক তৈরি করে কোনও মতে দিনগত পাপক্ষয় হবে সেটা আগে ভাগে জেনে বুঝে নেওয়া দরকার। আর এই কাজটাই বিজ্ঞানসম্মত ভাবে করে কাপলিঙ্ক।

কাপলিঙ্ক মনে করে, নারী-পুরুষ সম্পর্কে সুস্থতা বজায় রাখতে প্রধানত সহায়ক ওঁদের ব্যক্তিত্বের মধ্যেকার সাদৃশ্য। ব্যক্তিত্বের মিলেই সংসার সুখের হয় বলে পরীক্ষিত।

তাছাড়া, ভারতীয় বিয়ে মানে দুটি পরিবারের মধ্যেও সম্পর্ক তৈরি হওয়া। দুটি পরিবারের নিজস্ব সংস্কৃতির মিল-অমিলের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে বিবাহিত ওই দম্পতি সুখী হতে পারবেন কিনা। কাপলিঙ্ক এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলির দিকে লক্ষ্য রাখে, তার ভিতর রয়েছে বিবাহযোগ্য ওই নারী-পুরুষের বেড়ে ওঠা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিবারের সংস্কৃতি, পাত্রপাত্রীর পেশা, আচরণ সমস্তই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে বিচার করে তুহিনদের সংস্থা। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে কোন কোন ক্ষেত্রে পাত্রপাত্রীর মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা আছে, সেটিও চিহ্নিত করে কাপলিঙ্ক। সমস্যা এড়াতে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় পরামর্শও।

ব্যবসা হিসেবে এই বাজারটা বেশ বড়, ওরা বলছিলেন, বছরে এক কোটি বিয়ে হয়। কম করে এক লক্ষ কোটি টাকার বাজার। অনলাইন মেট্রিমোনির বাজারটাও বাড়ছে হুহু করে। অ্যাসোচেমের হিসেব বলছে ২০১৭ সালে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হবে অনলাইনে।

এই বাজারে কাপলিঙ্ক-এর কাজটা ইউনিক। কলকাতার এই সংস্থাকে আরও বড় আকৃতিতে কাজ করতে গেলে প্রয়োজন বিনিয়োগের। সেটার ব্যবস্থা হলেই জাতীয় স্তরে দারুণ ব্যবসা করবে এই সংস্থা। ফলে এই ভেলেন্টাইনস ডে তে প্রপোজ করার আগে পরে একবার কাপলিঙ্কের কাউন্সেলিং নিতে পারেন। কারণ আপনার জীবনের মানচিত্রটা গুগলের ম্যাপে নেই। কাপলিঙ্কের কাছে আছে।

Related Stories