ছোটো রানির দৌলতে চাপড়া এখন রোজ ভ্যালি

0

পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরকে অনেকটা পিছনে ফেলে বেশ কয়েক বছর আগেই রাজ্যে ফুল উৎপাদনে প্রথম জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে নদিয়া। জেলার চাকদহ, রানাঘাট, শান্তিপুরের মতো ব্লকগুলি এখন ফুলে ফুলে ভরা। প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে গোলাপ চাষের জমি। নদিয়ায় সব থেকে ভাল মানের গোলাপ পাওয়া যায় রানাঘাটের চাপড়ায়। এই গোলাপ ‘মিনি কুইন’ নামে পরিচিত। ছোটো রানি। কারণ এই ফুলের আকৃতি কিছুটা ছোটো কিন্তু ফুটে পড়ছে লাল রঙ। আভিজাত্যে ভিনরাজ্যের গোলাপকে টেক্কা দেয় এই মিনি কুইন। অন্য গোলাপের থেকে এর দামও কিছুটা কম। 

এই যে‌মন শুকদেব মণ্ডল। কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ধান চাষের বাইরে বের হতে পারেননি। নিজের এক বিঘে আট কাঠা জমিতে ধান চাষ করলেও দাম তেমন পাচ্ছিলেন না। এলাকার একজনের পরামর্শে ওই জমিতে শুরু করেন গোলাপ চাষ। একটা গোলাপ চারাকে ঠিকঠাক যত্ন নিতে পারলে দু মাস পর থেকেই তার ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। ৬-৭ বছর পর্যন্ত সমানে ফুল দিয়ে যায় গাছ। প্রতিদিন বিকেলে ফুল তুলে তা জলে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখেন শুকদেববাবু। সকালে নিয়ে যান স্থানীয় ধানতলা বাজারে। শুকদেবদের তরতাজা গোলাপের জন্য সেখানে অপেক্ষায় থাকেন ভিন রাজ্য থেকে আসা ফুল ব্যবসায়ীরা। শুকদেব মণ্ডল, মহাদেব বিশ্বাস, নব বিশ্বাস, জয়দেব বিশ্বাসদের মতো ফুলচাষিদের থেকে সরাসরি তারা গোলাপ কিন নেন।

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় এবার ভালই ভুগেছেন এই ফুলচাষিরা। কারণ ঠাণ্ডা জমিয়ে না পড়ায় ফুলের আকৃতি প্রত্যাশিত হয়নি। ওরা বলছিলেন, প্রকৃতির জন্য কিছুটা সমস্যা হলেও ফুলের বাজার বেশ চাঙ্গা। বিয়ের মরসুমে ভালই অর্ডার পেয়েছেন। প্রেমের মরসুমেও দারুণ কাটতি। তাদের বাগানের ফুল কিনতে দিল্লি, মুম্বই এর ব্যবসায়ীরা ভিড় করেন। চাপড়ার বলমাঠ এলাকায় সম্পন্ন ফুলচাষি জয়দেব বিশ্বাস বলছিলেন তাঁর পাঁচ বিঘে জমিতে গোলাপ চাষ হয়। ফুলের বাজার ওঠানামা করলেও এই মাসে একশো গোলাপ তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। সচরাচর এই চাষিরা দিনে অন্তত কয়েক হাজার টাকার ফুল বেচেন। 

গোলাপ চাষে কাঁটাও আছে। সংরক্ষণ বড় মাথাব্যাথা। তাদের বক্তব্য, এখন বাজার তেজি বলে ভাল বিকোচ্ছে। কিন্তু চৈত্র মাসে মন্দা যাবে। তখন গাছে ফুল এলেও কম‌ দামে বেচতে হয়। ফুল সংরক্ষণের ব্যবস্থা হলে এই চিন্তা তাদের অনেকটাই কমবে। খোঁজ নিয়ে ফুলচাষিরা জানতে পেরেছেন মেদিনীপুরে ‘ম্যাটগোট’ প্রজাতির গোলাপ চাষ হয়। যা আকারেও বড়। এই নতুন ধরনের গোলাপের চাষ শিখতে চাপড়ার চাষিরা যেতে চান মেদিনীপুর। ধান, সর্ষে ছেড়ে ফুল চাষে এসে তারা বুঝেছেন গোলাপে সময় দিলে সৌভাগ্যের সৌরভ পাওয়া যাবে।

একসঙ্গে দুই প্রেমের উৎসব অর্থাৎ সরস্বতীপুজো আর ভ্যালেন্টাইনস ডে পড়ে যাওয়ায় কিছুটা আক্ষেপও আছে চাষিদের। তাদের বক্তব্য দুটি দিনের মধ্যে একটু ফাঁক থাকলে ব্যবসা আরও ভাল হত। তবু সবাই একবাক্যে বলছেন মাঘ মাস ওদের 'পৌষমাস'। কারণ প্রত্যেকেই কম করে কুড়ি হাজার টাকা রোজগার করেছেন। গোলাপ চাষ করে এভাবেই একটি ব্লকের প্রায় হাজার খানেক ফুলচাষির মুখে হাসি ফুটেছে। ভাল দামতো পেয়েইছেন, তার সঙ্গে এসেছে আগামী বছরের জন্য প্রচুর অর্ডার। এক কথায় ছোটো রানির দৌলতে দুধে ভাতে আছে চাপড়া।