‘স্কুলগুরু’র পাঠশালায় অনলাইনে পড়াশোনা

0

ইন্টারনেট, অ্যাপস, স্মার্ট ফোনের যুগে পড়াশোনাও স্মার্ট হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। শুধু পাঠ্যবই আর ক্লাসরুম নির্ভর পঠন-পাঠন ক্রমশ অতীত হওয়ার দিকে। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ই-লার্নিং অর্থাৎ অনলাইন এডুকেশন-ইন্টারনেটে পড়শোনা। Docebo র একটা রিপের্ট বলছে, গত পাঁচ বছরে সারা বিশ্বে ই-লার্নিংয়ে বিনিয়োগ হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে, TechNavio এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে চক্র বৃদ্ধি হারে অনলাইন এডুকেশন বাজারে বৃদ্ধি ১৭.৫০ শতাংশ যা সম্ভবত বিশ্বে সবচেয়ে বেশি।

স্কুলগুরু সহ প্রতিষ্ঠাতা শান্তনু রুজ ও অনিল ভাট, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অমিতাভ তিওয়ারি
স্কুলগুরু সহ প্রতিষ্ঠাতা শান্তনু রুজ ও অনিল ভাট, এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অমিতাভ তিওয়ারি

বর্তমানে ভারতে উচ্চশিক্ষার হার প্রায় ৫০ শতাংশ। ‘স্কুলগুরু’র শুরুতে ২০১২ সালে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতারা এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলেন। স্কুল শিক্ষায় সরকার চাপ দিলেও তাঁরা জানতেন, প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষার জন্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা যায়নি। সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে ডিসটেন্স এডুকেশন বা দূরশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে ‘স্কুলগুরু’ সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে চেয়েছিল।

টিম স্কুলগুরু
টিম স্কুলগুরু

‘স্কুলগুরু’র সহ প্রতিষ্ঠাতা শান্তনু রুজের কাছে বিষটি নতুন কিছু ছিল না। গত ১৮ বছর ধরে উদ্যোক্তা শান্তুনু, তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন ‘প্যারাডাইন’এর সঙ্গে, তার পরে ‘ব্রডলিন’, যারা বিভিন্ন কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং সলিউশন (উদ্যোগের পরিকল্পনা) দিয়ে থাকে। শান্তনু তাঁর দুটি ভেঞ্চারই গোল্ডিন টেকনোসারভারের কাছে বিক্রি করে দেন। সেখানেই তাঁর আলাপ হয় স্কুলগুরুর আরও এক প্রতিষ্ঠাতা রবি রঙ্গনের সঙ্গে। রবিও ২০ বছর ধরে উদ্যোক্তা। তিনিও তাঁর সংস্থা কোমেট টেকনোলজি বিক্রি করেছেন গোল্ডিনের কাছে। শিক্ষাগত প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা-এই দুই প্রেক্ষাপটের ভিত শক্ত হওয়ায় ‘স্কুলগুরু’ আবির্ভাবেই হইচই ফেলে দেয়। আরও এক চূড়ান্ত পেশাদার এবং শান্তনুর ঘনিষ্ট বন্ধুও বটে, অনিল ভাটকে দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। যদিও প্রথম এক দেড় বছর পুঁজির টানাটানি ছিল, ২০১৪ সালে ‘স্কুলগুরু’ এঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট থেকে ২০ লক্ষ টাকা তোলে।

‘স্কুলগুরু’ প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত একটা মঞ্চ তৈরি করে দেয় ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজির মাধ্যমে। আর সেখান থেকে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাক্রমকে সহায়তা দেয় কোনও বাড়তি খরচ ছাড়াই। এই পরিষেবা শুধু অ্যাডমিশন, ফি, অনুসন্ধানই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের একটা শিক্ষা পরিচালন পদ্ধতি দিয়ে দেয়, যারা শিক্ষাক্রমের পদ্ধতিটা পরিচালনা করবেন। ‘স্কুলগুরু’র দাবি, ডিসটেন্স এডুকেশনে তারাই একমাত্র যারা নিয়মিত ডিগ্রি (যেমন-বিএ, এমসিএ, বিসিএ) দেয়। তাছাড়া এই সংস্থা নিয়মিত কোর্সের পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাও চালু করছে।

রবি রঙ্গন, সহ প্রতিষ্ঠাতা,স্কুলগুরু
রবি রঙ্গন, সহ প্রতিষ্ঠাতা,স্কুলগুরু

ছাপা স্টাডি মেটেরিয়াল ছাড়াও পড়ুয়াদের একটা মেমোরি কার্ড হোল্ডিং অ্যাপ দিয়ে দেওয়া হয়। অ্যাপে কিছু কনটেন্ট থাকে যেগুলি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। কোনও কিছু নিয়ে দ্বিধা তৈরি হলে অ্যাপের ইনিবল্ট মেসেজিং পোর্টালের মাধ্যমে পড়ুয়াদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তার উপর অ্যাপটি এতটাই সুবিধাজনক যে নিজেই দেখে নেয় পড়ুয়ার মোবাইলে ইন্টারনেট কানেকশন আছে কিনা। যদি না থাকে ইউজারের অনুমতি নিয়ে এসএমএস ইঞ্জিনের মাধ্যমে মেসেজ পাঠিয়ে দেয় এবং অ্যাপ-এ এসএমএসের মাধ্যমেই উত্তর আসে গ্রাফিক্যাল ফরমেটে। ফলে ইন্টারনেট কানেকশন না থাকলেও ছাত্রছাত্রীদের জন্য তা কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

আপাতত ‘স্কুলগুরু’ আটটি রাজ্যে (কর্নাটক, তেলেঙ্গনা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাডু, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং উত্তরাখন্ড) ১১টি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে। ভারতের ৯টি আঞ্চলিক ভাষায় ১০৭টি প্রোগ্রাম দেওয়া হচ্ছে। আরও চারটি রাজ্যের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা চলছে। আশা করা হচ্ছে, এই শিক্ষাবর্ষ থেকে সেখানেও স্কুলগুরু ঢুকে পরতে পারবে। ৫ জনের একটা টিম নিয়ে শুরু করে ভেঞ্চারের এখন ১৪৫ জন সদস্য ১১ টি জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছেন। বজার নীতি বরাবরই এক ছিল-সব রাজ্যে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা।

কোনও ছাত্র বা ছাত্রী অনলাইন কোর্সে ভর্তি হলে, তাদের দেওয়া ফি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলগুরুর মধ্যে ভাগাভাগি হয় ৩০ থেকে ৫০শতাংশ হারে। বছর বছর শিক্ষার্থী বাড়তে বাড়তে সংখ্যাটা ২০১৩ য় ১৫০০ থেকে বেড়ে ২০১৪য় ৬০০০ হয়েছে। ২০১৫য় ১.৫ লক্ষ শিক্ষার্থীকে স্কুলগুরুতে এনরোল করানোর লক্ষ্য রয়েছ। বছরের মাত্র চার মাসেই এই সংস্থা অর্ধেকের বেশি (১০০,০০০) টার্গেট পূরণ করে ফেলেছে। যশবন্তরাও চবন মহারাষ্ট্র ওপেন ইনিভার্সিটিতে তাদের সাম্প্রতিক সংযোজিত কোর্স একাই ওই লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

বাজার কীভাবে বাড়ছে? শান্তনু বলেন, এই ক্ষেত্রে বৃদ্ধি ব্যাখ্যামূলক। ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, ‘স্কুলগুরু’তে নয়। আমাদের সহযোগী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি প্রতি বছর ২০ লক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তি করায়। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থির করে থাকতে পারে, অনলাইন শিক্ষা সব পড়ুয়াদের জন্য বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অবশ্য অনলাইন মোডে অনেকগুলি কোর্স জুড়ে দিচ্ছে। প্রথম বছর কোনও বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন মোডে যদি দুটি বিষয় চালু করে থাকে, এখন ২০ টি বিষয় অনলাইন মোডে চালু করতে পারে। এভাবেই ‘স্কুলগুরু’তে পড়ুয়ার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবে এক সময় দেখা যাবে সবাই স্কুলগুরুর ছাত্রছাত্রী।

আগামী ২ বছরে স্কুলগুরু আরও ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যেতে চায়। এবং ১০ লক্ষ পড়ুয়াকে এই পদ্ধতিতে ভর্তি করাতে চায়। তাছাড়া সংস্থা এবার বিদেশেও পা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনলাইন পরীক্ষা মডিউল তৈরি করতে স্কুলগুরু Ivy League college এর সঙ্গে কাজ করছে। এই ব্যবস্থা চালু হলে পরীক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেই পরীক্ষা দিতে পারবে। যেটা হবে নিরাপদ এবং পরীক্ষিত। ডিসেম্বরের আগে এই পদ্ধতি নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘স্কুলগুরু’র দাবি, অনলাইন পরীক্ষা সংক্রান্ত সরকারের নীতি আসার আগেই তারা তৈরি হয়ে যাবে। সংস্থা ইতিমধ্যে সরকারের কমন সার্ভিস সেন্টারের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নিয়েছে যার মাধ্যমে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরেও পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়। আপাতত ‘স্কুলগুরু’ তাদের ৩ মিলিয়ন ডলারের সিরিজ-বি ফান্ডিং বন্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এডুকেশন টেকনোলজির স্টার্টআপগুলি ৪০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পুঁজি সংগ্রহ করেছে।যার থেক পরিস্কার এই সেক্টরের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল। সম্প্রতি সিগরিড, এডুকার্টের মত সংস্থাগুলির সংগ্রহের ঝুলি বেশ ভারি। সব মিলিয়ে অনলাইন এডুকেশন শিক্ষায় নয়া দিগন্তের দিশা দেখাচ্ছে।

Related Stories