বিদেশের মাটিতে দেশের ছোঁয়া দিচ্ছে ‘এথনিসিটি’

0

দেশের কথা বিদেশে থাকলেই বেশি করে মনে পড়ে। দেশীয় জিনিসের ওপর টানটাও বিদেশে থাকলে যেন একটু বেশিই বেড়ে যায়। দেশের মাটিতে যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা নিয়ে কোনও আবেগই কাজ করে না। তাই বিদেশে হলে উন্মাদনা চরমে ওঠে। শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই নয়, ভারতীয় সিনেমা বা খাবারের রোস্তোরাঁ নিয়ে একটা অদ্ভুত ঘরোয়া অনুভূতিতে ভোগেন বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়রা। এটা ভারতীয়দের উদাহরণ দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করলেও আসলে এই একই আবেগে ভোগেন সব দেশের মানুষই। বিদেশের মাটিতে দেশের সব কিছুই তাঁদের কাছে আকর্ষণের ও আবেগের। সবাই চান দেশের মাটিকে অনুভব করতে, ছুঁয়ে দেখতে, তার গন্ধ পেতে।

পড়ার জন্য বা রুজির খোঁজে বিদেশে বসবাসকারী মানুষের দেশীয় জিনিসের ওপর এই টানই এথনিসিটির ব্যবসার মূলকথা। কারণ তাঁদের এই অভাবকে পূরণ করারই চেষ্টা করে এই মোবাইল অ্যাপ। কী করে এই এথনিসিটি? যে দেশেই থাকুন না কেন, আপনি সে দেশের যেখানে রয়েছেন তার অবস্থান অ্যাপের মাধ্যমে জানালেই এথনিসিটি আপনাকে জানিয়ে দেবে আপনার দেশের কোন রেস্তোরাঁ, কোন সিনেমা বা আর কিছু আশপাশের মধ্যে রয়েছে কিনা। আর থাকলে তা ঠিক কতদূরে গেলে পাবেন তাও জানিয়ে দেবে এই অ্যাপ। সারা বিশ্বের ক্ষেত্রেই এই অ্যাপ প্রযোজ্য।

সাজি থমাস ও সোমকান্থন সোমালিঙ্গম। মার্কিন ‌যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই দুই তরুণের হাত ধরেই জন্ম নেয় এথনিসিটি। সাজি কাজ করতেন নোকিয়ায়। শেষ ১৫ বছর তিনি নোকিয়ার হয়ে মার্কিন মুলুক ও জার্মানিতে কাজ করেছেন। ফেসবুক, গুগুল, বিবিসি, হোয়াটস অ্যাপের মত সংস্থার সঙ্গে পার্টনারশিপ তৈরি করাই ছিল ডালাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ সাজির প্রধান কাজ। অন্যদিকে সোমকান্থন ছিলেন জার্মানির ডামসট্যাড টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্সের প্রাক্তন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট। নোকিয়ায় তাঁর কাজ ছিল ডিসপ্লে ও টাচ প্রযুক্তির উন্নয়নে গবেষণা চালান। এছাড়া বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের লেখক সোমকান্থন ফিজিক্সে পিএইচডি।

এথনিসিটি তৈরির পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল তা হল তথ্যের অভাব। বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে কথা বলেও তাঁরা তথ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁরা যেভাবে বিদেশ বিভুঁইয়ে বসবাস করা বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য তাঁর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা স্বদেশীয় তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তা দেওয়ার জন্য ‌প্রয়োজনীয় তথ্যের উৎস সন্ধান একটা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইন্টারনেটেও এমন তথ্যের ভাণ্ডার বিশেষ সমৃদ্ধ নয়। তবু বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা দেশীয় ব্যবসাগুলির ‌যে তথ্য ইন্টারনেটে পাওয়া সম্ভব সেগুলিকে এক ছাদের তলায় এনে এথনিসিটিকে গড়ে তোলার চেষ্টায় ত্রুটি রাখেন নি তাঁরা।

এথনিসিটি অ্যাপ থাকলে সেখানে একজনকে তাঁর পছন্দের বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। সঙ্গে দিতে হবে তাঁর অবস্থান। অর্থাৎ কোন দেশের ঠিক কোন জায়গায় তিনি রয়েছেন তা এই অ্যাপে দেওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে জানাতে হবে। দিতে হবে কোথায় যেতে চান। অর্থাৎ দোকান, রেস্তোরাঁ, অনুষ্ঠান, সিনেমা বা অন্যকিছু। এগুলো দেওয়ার পর এথনিসিটি দ্রুত জানাবে তাঁর আশপাশে কোথায় তিনি তাঁর কাঙ্খিত বস্তু পাবেন। উদাহরণ স্বরূপ, ধরা যাক কেউ লন্ডনের কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চাইছেন তাঁর আশপাশে কোনও ভারতীয় খাবার দোকান আছে কিনা। এথনিসিটি মুহুর্তে তাঁকে জানিয়ে দেবে তিনি যেখানে রয়েছেন তার সবচেয়ে কাছে কোন ভারতীয় দোকান রয়েছে। অথবা কোনও ফরাসি নাগরিক কলকাতার ধর্মতলায় রয়েছেন। তিনি খুঁজলে পাবেন ধর্মতলার কোথায় কোথায় ফরাসি খাবারের দোকান তিনি পেতে পারেন। এথনিসিটির এই দুরন্ত সুযোগ ক্রমশ তাদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করেছে। ভারতের তিরুবনন্তপুরম ও জার্মানি, এই দুই জায়গায় চলছে এথনিসিটিকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রযুক্তিগত কাজকর্ম।

তবে অনেক সময় ভারতীয় মুদিখানার দোকানও বিদেশের মাটিতে খোঁজ করেন অনেকে। সব জায়গায় এসব দোকানের তথ্য দেওয়া এখনও এথনিসিটির কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব দোকান অনলাইনে নিজেদের সম্বন্ধে জানাতে স্বচ্ছন্দ নয়। ফলে তাদের খোঁজ পাওয়া মুশকিল হয়। তবে এসব তথ্যের জন্য স্থানীয় সূত্রগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে এথনিসিটি। কাজে লাগাচ্ছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলও। ‘অ্যাড ইয়োর বিজনেস এণ্ড ইভেন্ট’ নাম দিয়ে একটি সু‌যোগ খুলেছে এথনিসিটি। তাদের অ্যাপে গিয়ে যে কোনও সংস্থা নিজেদের সম্বন্ধে এর মাধ্যমে সকলকে জানানোর সু‌যোগ পাচ্ছেন। যা আদপে এথনিসিটির তথ্যভাণ্ডারকেই সমৃদ্ধ করছে।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান, মেলা, কর্মশালা, আলোচনাসভা সহ নানা ইভেন্ট, রেস্তোরাঁ ও দোকানের খবর দিতে সদা প্রস্তুত এথনিসিটি। ভারত তো রয়েছেই, সেইসঙ্গে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার তথ্য ভাণ্ডারকে সামনে রেখেই আপাতত কাজ করতে চাইছে এথনিসিটি। আস্তে আস্তে নিজেদের বিস্তৃতি বিশ্বের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিতে চাইছে তারা। ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান ও ইটালিয়দের জন্য ভারতের কোণা কোণার তথ্য সরবরাহ করছে এই আজব অ্যাপ।

দক্ষিণ এশিয় মানুষের জন্য উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রিলয়ার ১২ হাজার ব্যবসার তথ্য সরবরাহ করছে এথনিসিটি। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস সিস্টেমে ২০১৫-র সেপ্টেম্বর থেকে এখনও প‌র্যন্ত দেড় হাজার ডাউনলোড পেয়েছে এই অ্যাপ। বিভিন্ন সংগঠনকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের অন্যতম সূত্র হিসাবে বেছে নিয়েছেন এথনিসিটির দুই জন্মদাতা।

নিজেদের আরও বড় জায়গায় তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান পেতে ইউরোপ ও এশিয়ার ভেঞ্চার ক্যাপিটালগুলিই এখন এথনিসিটির প্রধান ভরসা। এছাড়া অ্যাপে বিজ্ঞাপন তো রয়েছেই। আগামী দিনে স্থানীয় দোকান বা অন্যান্য সংস্থাকে অর্থের বিনিময়ে তাদের অ্যাপে জায়গা দেওয়ার ভাবনা চিন্তা রয়েছে সাজি-সোমকান্থন জুটির।

Related Stories