এবার এভারেস্ট জয়ে যাচ্ছেন হাওড়ার কুন্তল কারার

2

প্রতি পদে ঘাপটি মেরে আছে বিপদ। অজানা নয়। তবুও মৃত্যুকে জাপটে ধরে শৃঙ্গ ছুঁয়ে আসার নেশাই অভিযাত্রীদের টানে। সে এক অমোঘ টান। এভারেস্টের বাঁকে বাঁকে অসাড়, অবিকৃত অসংখ্য দেহ নতুন অভিযাত্রীদের ল্যান্ডমার্ক। ভয় নয়, সাহস যোগায়। উসকে দেয় উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গে পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার ইচ্ছেকে।

একেবারে হালে এই রাজ্যের ছন্দা গায়েন, সুভাষ পাল, গৌতম ঘোষ। দেহের আশায় এখনও পথ চেয়ে রয়েছে পরিবার। ধৌলাগিরি অভিযানে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে রাজীব ভট্টাচার্যের। ২০১৫-র ২১ মে হিমালয়ের কোলে নিখোঁজ হয়ে যান এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ছন্দা গায়েন। তার ঠিক এক বছর পরে ২০ এবং ২১ মে দুদিনে আরও এগারজন বাঙালি এভারেস্টে পা রাখেন। ২০ মে চেতনা সাউ, প্রদীপ সাউ, দেবরাজ দত্তরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছান। পরের দিন পরেশ নাথ, শতরূপ সিদ্ধান্ত, রুদ্রপ্রসাদ হালদার, সুমিতা হাজরা, সুভাষ পাল, গৌতম ঘোষ, রমেশ রায় সূর্যোদয় দেখেন এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়া থেকে। সুভাষ পাল, গৌতম ঘোষের আর ফেরা হয়নি। এগুলি নিছক হিসেব। কয়েকটা সংখ্যা। শিখরের হাতছানির কাছে মৃত্যু অতি সরল একটি পতন। 

অভিযানের টানে হওড়ার আরেক বঙ্গ সন্তান তৈরি হচ্ছেন পৃথিবীর সব‍ থেকে উচুঁ স্থানে পা রাখবেন বলে। নাম কুন্তল কারার। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সেই তরুণ পর্বতারোহীর কথাই আজ শুনব।

দমবার পাত্র নন কুন্তল। ২০১৬র সেই স্মৃতিকে সরিয়ে রেখে আবার এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখছেন হাওড়ার এই সাহসী ছেলে। পঞ্চানন তলার ব্যবসায়ী। ছোট থেকেই পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তখন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন এভারেস্টের শীর্ষটা ছুঁয়ে দেখবেন একবার। তেনজিং নোরগে, বছেন্দ্রি পালদের কথা শুনে শুনে বড় হওয়া কুন্তল কারার ট্রেকিং দিয়েই যাত্রা শুরু করেন। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এবার এভারেস্ট। 

কুন্তল এর আগেও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ২০০৬ সালে। ফিরে আসতে হয়েছিল বেস ক্যাম্প থেকেই। তখন অনেকেই ফুট কেটেছিলেন। বিদ্রুপ করেছিলেন। ২০০৮ এ বসন্ত সিংহ রায়রা এভারেস্ট শৃঙ্গ ছুঁয়ে আসার পর সেই ভাঙা অত্মবিশ্বাস ফিরে পান কুন্তল। স্বপ্ন দেখেন নতুন করে। তারপর থেকে একটু একটু করে তৈরি হওয়া। মাঝে তিনটি সাত হাজার মিটারের বেশি শৃঙ্গ জয় করে এসেছেন। এবার সব থেকে বড় লক্ষ্যটার দিকে দৌড়চ্ছেন এই যুবক।

বলছিলেন, সদ্য এভারেস্ট জয় করে আসা মলয় মুখোপাধ্যায় তাঁর অনুপ্রেরণা। তাঁর কাছেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। টাকাটা একটা বড় সমস্যা ছিল। ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকার প্রয়োজন পড়ে। রাজ্য সরকার ৫ লাখ করে দিচ্ছে। কিন্তু বাকি তো আরও অনেক টাকা। যোগাড় করা বেশ মুশকিল। এতকিছুর মধ্যেও এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন হাল না ছাড়া ছেলেটা।

ছেলে যাচ্ছে এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্য নিয়ে। পরিবারের মুখে উদ্বেগ। তবু প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন বাবা চণ্ডীচরণ কারার। বলছিলেন‘উৎসাহই দিচ্ছি।কিন্তু বাবা তো, ভয় লাগেই। বারবার বলে দিচ্ছি ঝুঁকি যেন না নিয়ে ফেলে খুব বেশি’।

কুন্তলের প্রশিক্ষণের দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন এভারেস্ট জয়ী মলয় মুখোপাধ্যায়। বলছিলেন কুন্তল একদম ফিট। দারুণ প্র্যাকটিস হচ্ছে। তিনি ছাত্রের সাফল্যের ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী।

সব ঠিক থাকলে এপ্রিলের দশ তারিখ শুরু হবে কুন্তলের যাত্রা। বেস ক্যাম্পে গিয়ে একাধিকবার অনুশীলনের পর মে মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে এভারেস্ট জয়ের স্বাদ পেতে পারেন কুন্তল কারার। আর পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ছুঁয়ে আসার তালিকায় ঢুকে পড়বেন হাওড়ার কুন্তল। ইওরস্টোরির তরফ থেকে ওঁর জন্য রইল শুভেচ্ছা।