বিপ্লবীদের দানে ডক্টর রণবীরের EyeCare

0

বয়স ৮৮ বছর। কিন্তু তেজি যুবকের মতো এখনও তিনি প্রাণচঞ্চল। কর্মচঞ্চলও। ভবিষ্যৎ জাতীয় কোনও শব্দে বিশ্বাস করেন না রণবীর মুখার্জি। পেশায় বিশিষ্ট এই ডাক্তারবাবু চোখের অসুখের অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার জন্যে গত ৩২ বছর লাগাতার কাজ করছেন। তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।

রণবীরবাবু প্রচারবিমুখ, তবে স্পষ্টবক্তা। যদিও রাজনীতি পছন্দ করে‌ন না। রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে এড়িয়েই মানুষকে ভালবাসতে পারেন বলে তাঁর সংগঠন একটু ভিন্ন পথে চলেছে। আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার এপর্যন্ত কোনও সরকারের কাছ থেকে কখনও অনুদান নেয়নি। ব্যক্তিগত দানের ওপর নির্ভর করে কলকাতায় আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাজকর্ম চালাচ্ছেন ওঁরা।

স্বাধীনতার পর সংগ্রামী বিপ্লবীরা যখন দেশব্রতী কাজের জন্যে সরকারের কাছ থেকে জমি পেয়েছিলেন সেই জমিতেই গড়ে উঠেছে এই হাসপাতাল। আদতে বয়সের কারণে এবং শরীর অশক্ত হওয়ায় তাঁরা ওই জমি  দেশের কাজে দান করে দেন। সেই সময় চক্ষু চিকিৎসাকে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন তরুণ চিকিৎসক রণবীরবাবু ও তাঁর সতীর্থরা। তাঁদের উদ্যোগেই তিলে তিলে গড়ে ওঠে এই হাসপাতাল। 

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে। আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ডক্টর রণবীর মুখার্জি বললেন, চোখের জটিল অস্ত্রোপচার করার জন্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনে আমরা তা ব্যবহার করছি। আগে লোকে চোখের চিকিৎসায় শঙ্কর নেত্রালয় ছুটতেন। এখন কলকাতাতেও ভালো কাজ করছি। তিনি জানালেন, আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার স্বল্প খরচে অস্ত্রোপচার করে থাকে। এমনকি, দরিদ্র রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার বা অস্ত্রোপচারের খরচ সংগঠনের তরফ থেকে জুগিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। জানা গেল, গত ৩২ বছরে অন্ততপক্ষে ১০ মানুষের চোখের চিকিৎসা করেছে আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।

১৭০৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি অখণ্ড ভারতের মধ্যে কলকাতায় প্রথম অ্যালোপ্যাথিক হাসপাতাল চালু করেছিল। 
তার আগে ‌এ দেশের মানুষ অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। সাহেবসুবোদের চিকিৎসার জন্যে কলকাতার সাহেবপাড়ায় প্রথমে একটি হাসপাতাল হয়। সেটি পরে মেয়ো হাসপাতাল নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। অন্য একটি হাসপাতাল তৈরি করা হয় বৈঠকখানা বাজারের বিপরীতে। সেটির নাম ছিল ক্যাম্বেল হাসপাতাল। যা আজকের নীলরতন সরকার হাসপাতাল। সেদিন কলকাতা আক্ষরিকভাবেই ছিল ডাক্তারদের শহর।

সারা ভারতবর্ষের মানুষ কলকাতায় চিকিৎসা করাতে আসতেন। কিন্তু, গত ৩০ বছরে ছবিটা যেন আমূল পাল্টে গিয়েছে। ডক্টর রণবীর মুখার্জির মতো সমাজসেবী চিকিৎসকরা মনে করেন, এর কারণ চিকিৎসা নিয়ে ব্যবসায়িক মনোভাব। কলকাতা শহর চিকিৎসা ক্ষেত্রে একদিন পথিকৃত ছিল। সেদিন কিন্তু চিকিৎসা পণ্য ছিল না বলে মনে পড়িয়ে দেন রণবীরবাবু।

বিপ্লবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘে পার্কসার্কাসে আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিটের তিনতলা বাড়িটির একটি তলে আছে বিপ্লবী নিকেতন মেডিক্যাল কমপ্লেক্স। এখানকার ভক্তি ঘোষ ক্লিনিকে শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।

১৯৮৫ সালে পার্কসার্কাসের এই ভবনের উদ্বোধন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। 

রণবীরবাবু জানালেন, এপর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়েনি আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের কাজকর্ম। রাজনীতিকে বাদ রেখে কাজ করাই ভাল বলে মনে করেন পরিচালকমণ্ডলী। বঙ্গদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকেই চোখের চিকিৎসার জন্যে ওঁদের কাছে এসেছেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে নামোল্লেখ করাটা বারণ।

এই সময় বহু বিশিষ্ট চিকিৎসক আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের হয়ে কাজ করছেন। অবশ্যই বিনা পারিশ্রমিকে। এখানে স্বল্পখরচে শিশুদের চোখের অসুখের আধুনিক ও উন্নত মানের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

আর একটা কথা, কলকাতা শহরকে ঐতিহ্যশালী করেছেন যে মহাপুরুষগণ, ওঁদের ভিতর বিদেশি সাহেবসুবোরাও ছিলেন। আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে তেমনিভাবে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষক ফাদার বেকারের অবদান স্মরণীয়।

সমাজসেবক হিসাবে শ্রদ্ধেয় ফাদার ২০০৬ সালে মারা গিয়েছেন। রণবীরবাবু বললেন, ফাদারের মতো মেধাবী মানুষ প্রকৃতপক্ষে বিরল। সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করতেন। বলা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দান বিফলে যায়নি। আই কেয়ার অ্যান্ড রিসার্ট সেন্টারও ক্রমে একটি আদর্শ হয়ে উঠেছে।