পুরুলিয়ার মাটি জানে লক্ষ্মী মাণ্ডির স্ট্রাইড

0

পুরুলিয়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম তুইনা । পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার পথ । বাসে, রিকশায় তারপর ঠেলা গাড়িতে । এ যেন সাত সমুদ্র তের নদী পেরনোর মহাযাত্রা । সেই গ্রামের একটি ছেলে, এখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯। সাড়ে চার বছর আগে, মাত্র সাড়ে চোদ্দ বছর বয়সে সেই সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ ও অসম্ভব ক্লান্তিকর পথ পেরিয়ে ছেলেটিকে আসতে হত পুরুলিয়া শহরে তার দাদার সাথে। দাদারই বা কত আর বয়স তখন। তবু দু'মুঠ ভাতের জন্য ছেলেটির দাদাকে শহরে আসতে হত পাথর ভাঙ্গার কাজ করতে। আর ছোট্ট ভাইটারও একটা কাজ থাকত তখন, পাথর ভাঙ্গা হয়ে গেলে ঝুড়িতে পাথরের টুকরো ভরে নিয়ে গিয়ে মালিকের গুদামে ফেলে আসা। একসঙ্গে অনেক লোক পাথরের টুকরো ভরতি ঝুরি নিয়ে ছুটছে মালিকের গুদামের দিকে। অলিখিত ভাবে যেন একটা দৌড় প্রতিযোগিতা। প্রত্যেক দিন। সেই সাড়ে চোদ্দ বছরের ছেলেটার কাছে সেই দৌড়টাই যেন ভীষণ আনন্দের। প্রত্যেকদিন সে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে সকলের আগে পৌঁছে যেত মালিকের গুদামে । লম্বা লম্বা দূরত্বে পা ফেলে সে চেষ্টা করত তার দৌড়ে গতি আনার, সহজাত ভাবে । তখন থেকেই তার দৌড়ে এসে গিয়েছিল স্ট্রাইড।

বাংলার জার্সি পরে মান্ডি
বাংলার জার্সি পরে মান্ডি

আজ ১৯ বছর বয়সে এসে লক্ষ্মীকান্ত মাণ্ডির কি মনে পড়ে অপরিসীম দারিদ্র্যর সাথে প্রত্যেকদিনের সেই লড়াইয়ের কথা?

সিনিয়র জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, জার নাম সন্তোষ ট্রফি, সেখানে সে খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলার জার্সি পরে। মাণ্ডি কিছুই ভোলেননি। তার অকপট স্বীকারোক্তি ,"বাবা তো সামান্য একজন ভাগচাষী। পান্তা ভাতও মাঝে মাঝে আমাদের দুবেলা জুটত না। বর্ষায় বেড়ার ঘরের ফুটো হয়ে যাওয়া চাল দিয়ে জল ঢুকলে মেরামত করার উপায় থাকত না। তাই দাদার সাথে পুরুলিয়ায় পাথর ভাঙ্গার কাজে আসতে হত।" এখনও কি মাণ্ডিদের বাড়ির অবস্থা বদলেছে? মাণ্ডি বলছে, "বিরাট কিছু বদলায়নি। তবে এখন প্রত্যেক বছর বর্ষার আগে ঘর সারান হয়। নতুন বেড়া আর মাটি দিয়ে।"

কিন্তু অ্যাথলেটিক্সের সম্ভাবনাময় সেই স্ট্রাইড গুলো কীভাবে বদলে গেল সম্ভাবনাময় ফুটবলারে?

লক্ষ্মীকান্ত মাণ্ডির খেলোয়াড় জীবন শুরু হয়েছিল লঙ জাম্প ও মাঝারি পাল্লার দৌড়ের ট্র্যাকে। তুইনার পাথুরে রুক্ষ জমিতেই সে আপনমনে দৌড়ে বেড়াত। একসময়ে, গ্রামের স্থানীয় স্কুলের খেলার শিক্ষক মাণ্ডির দাদাকে পরামর্শ দিলেন যে, ওকে কলকাতায় নিয়ে যাও। তারপরেই, পুরুলিয়ার রুইমা গ্রাম থেকে উত্তর ২৪ পরগনার বানীপুর বিদ্যালয়ে পা রাখা ১৮ বছরের মাণ্ডির। বানীপুর বিদ্যালয়ের খেলার শিক্ষক তখন সুখেন মণ্ডল। একদিন প্র্যাকটিসে মাণ্ডির চোখ তুলে, মাথা সোজা করে লম্বা স্ট্রাইডের দৌড় দেখে সুখেন তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন অ্যাথলেটিক্স নয় ফুটবল হতে পারে মাণ্ডির ভবিষ্যৎ। মাণ্ডি বলছে, "ভাগ্যিস সুখেন স্যার এক বছর আগে পরামর্শ টা দিয়েছিলেন। আজ বুঝতে পারি, অ্যাথলেটিক্স নিয়ে পড়ে থাকলে হয়তো বাংলার হয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপগুলোতে নেমে দুয়েকটা পদক আনতে পারতাম কিন্তু দারিদ্র ঘোচাতে পারতাম না। ফুটবল অন্তত সেই লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার মতো কিছুটা আর্থিক সঙ্গতি তৈরি করেছে।"

সুখেন মণ্ডলের উদ্যোগেই লক্ষ্মীকান্ত মাণ্ডির কলকাতায় প্রথম ফুটবল ক্লাব হয়েছিল স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চল শাখা। গত দুবছর ধরে যে দল কলকাতা প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ খেলছে। গত বছর প্রথম কলকাতা লিগে খেলতে নেমেই অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলো মাণ্ডি। বর্ষায় ভেজা ও কাদা মাঠে মাণ্ডি শরীরের দোলায় বিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারদের অসহায় করে দিয়ে প্রতিপক্ষের গোলের দিকে যখন এগিয়ে যান, কলকাতার ফুটবল বিশেষজ্ঞরাও বিস্মিতও হয়ে দেখেন আর ভাবেন যে মাত্র পাঁচ ফুট উচ্চতা ও ৪৮ কেজি ওজনের দুর্বল শরীরটা নিয়ে মাণ্ডি কীভাবে তার চেয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ডিফেন্ডার দের বোকা বানান।

চিমা ওকেরি বলেছেন, 'মাথা ঠিক রেখে পরিশ্রম করতে পারলে মাণ্ডি অনেকদূর যাবে।' চিমার মতো মহা-তারকার প্রশংসা শোনার পর মাণ্ডি বলছেন, "মাথা ঠিক রাখতেই হবে। ফুটবলই আমার জীবন। আমি তো আর কিছু শিখিনি। অন্য কোনও কাজ ও জানিনা।"

মাণ্ডির গ্রামের বাড়িটা এখনও পাকা হয় নি । মাতির ঘরের উপরে শুধু বেড়ার বদলে অ্যাসবেস্টস এর চাল লেগেছে । এখনও মাণ্ডির বাবাকে আগের মতো অন্যের জমিতে চাষ করতে যেতে হয়।

মাণ্ডি তাই আবার বলল, "আমাকে কলকাতার বড় ক্লাবে খেলতে হবে। টাকা রোজগার করতে হবে। এমন একটা দিন আমি দেখতে চাই যেদিন বাবা আর প্রত্যেকদিন ভোরে উঠে অন্যর জমিতে চাষ করতে না যায়।" বড় ক্লাব মানে ইস্টবেঙ্গল অথবা মোহনবাগানের জার্সি পরা। এবছর মাণ্ডি সই করেছেন পিয়ারলেস ফুটবল ক্লাবে। কিন্তু আর্থিকভাবে সুরক্ষিত হতে পারেননি তুইনা গ্রামের তারকা। সত্যিই তো তারকা। পিয়ারলেসে সই করার আগে মাণ্ডি গিয়েছিলেন তার গ্রামে। গিয়েই দেখা করেন গ্রামের স্থানীয় স্কুলের সেই শিক্ষকের সঙ্গে, যার প্রথম পরামর্শ ছিল জীবনে সফল হতে গেলে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হবে। মাণ্ডি গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন। এখন তাঁর ভাবনায় শুধু সফল হওয়ার প্রক্রিয়া খুঁজে যাওয়া। যেটা করতে গিয়ে মাণ্ডিও সুপারস্টার চিমার মতই বলছেন, "মাথাটা ঠিক রাখতে হবে ।"