গরিব বিদর্ভে দুই বন্ধুর অনলাইন মুদিখানা

0

বিদর্ভ, নামটা শুনলেই মনে আসে একের পর এক কৃষক আত্মহত্যার কথা। আজ এক অন্য আশার গল্প শোনাচ্ছেন সেই বিদর্ভেরই বছর ২৩ এর দুই যুবক, প্রশান্থ মাহাল্লে ও পুষ্পক দেশমুখ। ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র প্রশান্থ ও পুষ্পক তৈরি করছেন MarketWarket, অনলাইন মুদিখানা।

দুজনেরই জন্ম গ্রামের কৃষক পরিবারে, আলাপ কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ার সময়। চাকরি নয় দুজনেরই পছন্দ ব্যবসা, আর সেই থেকেই ঘনিষ্ঠতা। কলেজে পড়ার সময়ই মুদির দোকানে জিনিস কিনতে যাওয়া খুবই বিরক্তিকর ঠেকত পুষ্পকের, সময়ও নষ্ট হয় অনেক, এদিকে মুদির জিনিস না কিনলেই নয়। সেখান থেকেই মাথায় আসে ভাবনাটা। এমন ব্যবস্থা যদি করা যায় যাতে ঘরে বসেই পেয়ে যাওয়া যাবে যাবতীয় মুদির জিনিস, এবং কম সময়!


MarketWarket টিম
MarketWarket টিম

পরিকল্পনা ও রূপায়ণ

পুষ্পকদের কলেজের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম। বক্তব্য রাখার সময় ব্যবসার উদ্যোগে গুরুত্ব দেন তিনি, আর সেই বক্তব্য অনুপ্রাণিত করে দুই বন্ধুকে। সেই সময় থেকেই পুষ্পক HouseJoy-এর মত একটি ই-কমার্স সাইট তৈরির পরিকল্পনা শুরু করেন, যেখানে মিলবে গৃহ পরিষেবার যাবতীয় উপকরণ। এরপর পুষ্পক টাই-নাগপুরে যান। টাই নতুন ব্যবসার উদ্যোগে উত্সাহ ও পরামর্শদাতা একটি সংস্থা। কিন্তু টাই থেকে পুষ্পককে বলা হয় তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং এরকম ধরণের কোনও ব্যবসা হতেই পারেনা।

এরপর প্রশান্থের সঙ্গে আলোচনা করেন পুষ্পক, জানান তাঁর পরিকল্পনা, সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিতে রাজি হয়ে যান প্রশান্থ। “সেটা ২০১১ সাল, ভারতে জনপ্রিয় হচ্ছে অনলাইন শপিং ও ই-কমার্স। তখনই আমরা ভাবলাম মুদির জিনিসই বা কেন ঘরে পৌঁছে দেওয়া যাবে না? সেই থেকেই জন্ম MarketWarket এর”, বললেন পুষ্পক।

MarketWarket শুরুর সময় ওই এলাকায় আর একটাও ই-কমার্স সাইট ছিল না। পানীয় জল, বিদ্যুৎ, কর্ম-সংস্থান ইত্যাদি নানা বিষয় সমস্যায় ছিলেন স্থানীয় মানুষ, ছিল একের পর এক কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা।

সেই সময় মারাঠি ভাষায় প্রচার শুরু করেন প্রশান্থরা। অটোরিকশায় ব্যানার লাগানো, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন দেওয়া, ফ্লায়ার বিলি, ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার এভাবেই ক্রমশ নিজেদের উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে দেন তাঁরা। পেতে থাকেন অর্ডারও।

প্রতিকূলতা

“অমরাবতীর মত জায়গায় ই-কমার্স সাইট চালানো সহজ ছিল না। মানুষ অবিশ্বাস করত, অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রশ্নের মুখে পড়তে হত আমাদের, কেউ বলতেন এগুলি চুরির মাল কি না কেউ আবার জানতে চাইতেন মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া জিনিস সরবরাহ করি কি না আমরা! আমরা যেহেতু ছাড় দিতাম এবং বিনামূল্যে সরবরাহ করতাম অনেকেই ভাবত আমরা কর ফাঁকি দিই,” হাসছিলেন প্রশান্থ।

“এফএমজিসি কোম্পানিগুলির সঙ্গে চুক্তির সময় স্থানীয় সরবরাহকারীদের মাল দিতে রাজি করানোও ছিল মুশকিল, কারণ ২০১২ সালে ই-কমার্সের ধারণাটাই তাঁদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। পণ্যের গুণমান ও দামের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখাও ছিল একটা চ্যালেঞ্জ,” বললেন প্রশান্থ।

প্রতিযোগিতার বাজারে দাম ঠিক রেখে নানারকমের পণ্য সঠিক সময় সরবরাহ করা এক কঠিন কাজ। তাছাড়া মুদির জিনিসে লাভ থাকে খুবই কম, সেখানে খুব বেশি ছাড় দেওয়াও সম্ভব না। প্রশান্থ বললেন, “আমরা জানি অন্যান্য বড় কোম্পানির মত অত দ্রুত বাড়ছে না MarketWarket, আমাদের সময় লাগছে। তবে বিদর্ভের মত জায়গায় ই-কমার্স ক্ষেত্রে আমরা প্রভাব ফেলতে পেরেছি, আমাদের ৯৫ শতাংশ ক্রেতা দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন, আর সেটাই আমাদের জয়”।

যেহেতু এই এলাকায় কমবয়সীরাই মূলত ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তাই শুরু করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এখনও অনলাইন টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা অবিশ্বাসের জায়গা রয়েছে. বেশিরভাগই সরবরাহের পর টাকা দেয়।

তবুও এই এলাকায় ই-কমার্স শুরু করার অনেকগুলি সুবিধার দিকও রয়েছে, প্রশান্থের মতে, “এরমধ্যে রয়েছে কম খরচ, সস্তা শ্রম, ছোট শহর (সরবরাহ ও মার্কেটিং এর খরচ কম) এবং ক্রেতার ভরসা যোগ্যতা। সঠিক পরিকল্পনা ও বিক্রির লক্ষ্য রাখতে পারলে শুরুয়াতি ব্যবসা এখানে খুবই লাভজনক। এখন অবধি নথিভুক্ত ক্রেতার সংখ্যা ১৫০০, গড়ে প্রত্যেকে কিনেছেন ১৪৫০ টাকার জিনিস”।

বাজার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ব্যবসা বাড়ানোর জন্য আপাতত বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করছে MarketWarket। খুঁজছে পরিকল্পনা ও লক্ষ্য-পূরণের জন্য অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী। প্রশান্থের কথা অনুযায়ী অর্ডারের তিনঘণ্টার মধ্যে জিনিস সরবরাহ করে MarketWarket যা কি না বড় বড় কোম্পানিগুলোও করে না। “প্রতিটা জিনিস আমরা নিজেরা বাক্সে ভরি ফলে জিনিসের গুণমানের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে আমাদের,” বললেন প্রশান্থ। বর্তমানে কোম্পানিটি ওয়্যারহাউজ মডেলে কাজ করে।

পরবর্তী পরিকল্পনা একটি অ্যাপ তৈরি। প্রশান্থ জানালেন, “আমরা কৃষক পরিবার থেকে এসেছি, আমরা চাই কৃষকরা এটা থেকে লাভ করুক। এই অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি যুক্ত করা হবে কাঁচা খাদ্য ইত্যাদি সরবরাহে”।

ই-কমার্স ও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহর

এবছরের শেষে ভারতীয় ই-কমার্স বাজার ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলারে পৌঁছবে। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরগুলিও দ্রুত এই দৌড়ে সামিল হচ্ছে। ইন্টারনেট আর স্মার্ট-ফোন যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে মনে করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলেও ই-কমার্সের পরিধি ৫১ শতাংশ অবধি বাড়বে।