তারা শর্মা নিজেকে বলেন ‘মমপ্রেনিওর‍’

0

মাতৃত্ব। শুধু দায়িত্বই নয়, অদ্ভুত উপলব্ধি। সেই উপলব্ধিই আমূল বদলে দিয়েছে তারা শর্মা সালুজার জীবন। তিনি একাধারে মডেল, অভিনেত্রী এবং অন্ত্রপ্রেনিওর। তবে নিজেকে ‘মমপ্রেনিওর’ বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন তারা। তাঁর মতে, মায়েদের জীবনদর্শন অন্ত্রেপ্রেনিওরের থেকে আলাদা। পেশা আর পরিবারে ভারসাম্য রেখে চলার মধ্যে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আছে যা শুধুমাত্র মমপ্রেনিওররাই উপভোগ করতে পারেন।

কিন্তু সবসময় জীবনটা এত সহজও ছিল না তারার। কয়েক বছর আগেও সময়ে কোনও কাজ শেষ করার দায়িত্ব পেলেই অসম্ভব টেনশনে ভুগতেন। কিন্তু মা হওয়ার পর দশভূজা হওয়ার কৌশল আপনা হতেই রপ্ত করে ফেলেছেন। তাই আজকাল মাতৃত্ব এবং পেশাজীবন জমিয়ে উপভোগ করছেন তিনি। আপাতত সংসার করার পাশাপাশি একটি টিভি শো-এর পরিচালনা সামলাচ্ছেন বলিউডের এই অভিনেত্রী।

ছোটবেলা থেকে বইয়ে মুখ গুজেই সময় কেটেছে তাঁর। তখন এক ‘অসামাজিক জীব’ ছিলেন বলেই মনে করেন তারা। স্কুলে দুর্দান্ত ফল করার সুবাদে ইটালির অ্যাড্রিয়াটিকের ইউডব্লুসি-তে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যান। তখনই প্রথম খোলস ছেড়ে, গতে বাধা জীবন ছেড়ে বেরোনোর আনন্দ উপলব্ধি করেন। “অন্তত ৭৫টি দেশের প্রতিনিধিরা সেখানে ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে সংস্কৃতির আদানপ্রদান ছিল এক অভিনব অভিজ্ঞতা।” সেই স্মৃতি এখনও তাজা তারার মনে। এরপরের গন্তব্য ছিল লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স। সেখানে ম্যানেজমেন্টে স্নাতক হন তিনি।

পড়াশোনা শেষে সিটি ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপ। এরপর অ্যাকসেনচিওরে চাকরি। নিজেকে স্যুট-বুট পড়া কর্পোরেট হিসেবেই কল্পনা করতেন বরাবর। কিন্তু সিটি ব্যাঙ্কে ইন্টার্নশিপ করার পরই প্রথম ডানা মেলার কথা মাথায় আসে তাঁর।

তারার বাবা প্রতাপ শর্মা ছিলেন একজন লেখক এবং নাট্যকার। সেই সুবাদে মডেলিংয়ের দুনিয়ায় প্রবেশ করেন তিনি। সৃজনশীলতারও প্রথম প্রকাশ ঘটে সেখানেই। “পড়াশোনা করে কর্পোরেট জগতের সদস্য হওয়ার পিছনে আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, পেশার নিরাপত্তা ।” বললেন তিনি।

কিন্তু তারার বাবা ছিলেন ফ্রিলান্সার। বাবার বৈচিত্রময় কাজও আকর্ষণ করত তারাকে। ২ বছর অ্যাকসেনচিওরে চাকরি করার পর মডেলিং আর অভিনয় জগতকে একবার চেখে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। মডেলিং অ্যাসাইনমেন্টের সুবাদে সিনেমার অফার পেতে শুরু করলেন। কর্পোরেট দুনিয়ার সঙ্গে সেই জীবনের আকাশ পাতাল তফাত ছিল। কোনও নির্দিষ্ট কাজের সময় ছিল না। কেরিয়ার গ্রাফের ওঠাপড়া হত পলকের নিমেষে। ‘অন্যরকম’ এই পেশাও চুটিয়ে উপভোগ করতেন তিনি।

“বাবা সবসময় বলতেন, তুমি যেটা চাও সেটা পাওয়া সম্ভব না হলে তার পথ প্রশস্ত করে নাও। আত্মমূল্যায়ণ অত্যন্ত জরুরি।” প্রথম সন্তানের জন্মের পর মডেলিংয়ের অফার পাওয়া বন্ধ হতে প্রথম বাবার এই কথাই মনে এসেছিল তারার। “তখনই ভাবলাম আমি নিজের শো করব।” বললেন তারা। শুরু হল জীবনের আরেক অধ্যায়।

বিভিন্ন টক শো, রান্নার শো করেছেন একাধিক। কিন্তু কখনও মাতৃত্ব বা অভিভাবকত্ব নিয়ে শো সঞ্চালনা করা হয়নি তাঁর। কিন্তু কেন? তারা ভেবে দেখলেন, এমন কোনও শো-ই নেই বাজারে। কারণ মা হওয়ার পর নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন মহিলারা। নিজের শো-এর জন্য এবার বিজ্ঞাপনের খোঁজ শুরু করে দিলেন তিনি।

প্রথম প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন ফিশারপ্রাইজকে। বিজ্ঞাপনও পকেটে পুড়েছিলেন। স্বামী রূপক সালুজার পরামর্শে টিভি ছাড়া ব্লগেও ছাড়া হল শো-এর স্ক্রিপ্ট। বাড়তে থাকল তারার টিম। সঙ্গী পেলেন শিল্পা শেট্টিকে।

“সিজন টু-তে আমরা জনসনের বিজ্ঞাপন পেলাম। কালার্সে নিয়মিত সম্প্রচারিত হচ্ছিল আমার শো। সিজন থ্রি-তে ইংরাজি ভাষায় সম্প্রচার শুরু হল অনুষ্ঠানটির। এখন সেলিব্রিটি, নন সেলিব্রিটি এবং ফিচার এই তিন বিভাগে সম্প্রচারিত হয় অনুষ্ঠানটি। শিশুদের ‌যত্ন, তাদের চাওয়া-পাওয়াই শো-এর মূল বিষয়বস্তু।”বললেন তারা।

“প্রথমে যখন সেলিব্রিটিদের শো-য় আমন্ত্রণ জানাতাম, তাঁরা ইতস্তত করতেন। এখন কাজল, মেরি কম, শিল্পা শেট্টি—তালিকা বেড়েই চলেছে। মা হওয়া আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। মাতৃত্বই আমার পেশা জীবনের মূল সোপান।”স্মিত হেসে বললেন তারা।

অভিনেত্রী কঙ্কনা সেনশর্মার কথার জের টেনে তারা বললেন, একসময় যেই নিরাপত্তার খোঁজে কর্পোরেট দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন, আজ মাতৃত্বের পরশে তিনি সেই নিরাপত্তাই শুধু পাননি, পেয়েছেন বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যও। বিকাশ ঘটেছে ব্যক্তিত্বের।

(লেখক সিন্ধু কাশ্যপ, অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী)