অন্তত আমি জানি, যে আমি জানি না

লিখছেন শ্রদ্ধা শর্মা, চিফ এডিটর YourStory

0
I am the wisest man alive, for I know one thing, and that is that I know nothing. -Socrates

কিছুদিন আগে আমি বেঙ্গালুরুর Shangri-La হোটেলে CXO-র একটি সেমিকন্ডাক্টর মিটিং এ গিয়েছিলাম। ছোট্ট হলঘরটি ভিড়ে ঠাসা। আমার দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যায়। আপনি ভাগ্যবান হলে দেরি করে পৌঁছালেও শেষের সারিতে আসন পেলেও পেতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে সংগঠকরা মঞ্চের একেবারে কাছে প্রথম সারিতে আমার জন্য জায়গা রেখেছিল। আমি প্যানেলের আলোচনায় মন দিলাম। বিষয় ছিল সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি এবং সেই নিয়ে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি। বিশেষজ্ঞ, IIT প্রোফেসর, NRI শিল্পপতি এবং কর্পোরেট বিনিয়োগকারিদের ব্যাখ্যা শুনে নিজেকে সমৃদ্ধ করার আশায় আমি একটু হেসে নিজেকে প্রস্তুত করলাম।

এরপর যা ঘটল...

আমি গভীর মনোনিবেশ করলাম। কিন্তু বিশদে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বক্তার কথা বলার বিষয়টি নিয়ে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। সোজা কথায় বলতে গেলে এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছিল। আমার চারিদিকে সবাই গভীর ভাবে শুনছিলেন,মাথা নাড়াচ্ছিলেন,প্রশ্ন করছিলেন,হাসছিলেন। তাই আর কারও দিকে না তাকিয়ে আমি মঞ্চের বক্তাদের দিকে সোজা তাকিয়ে রইলাম। ওই ছোট্ট ঘরটায় এছাড়া আমার আর কিছু করারও ছিল না। সবই আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কোনও একটা পয়েন্ট বোঝাতে গিয়ে প্যানেলিস্ট হয়ত সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। আমি এই বিষয়টির গুরুত্ব বুঝি যেহেতু মঞ্চের উপর বসে থাকা বক্তা হিসেবে আমিও এমনটাই করি। মনোযোগী শ্রোতার ভান করে মাথা নাড়া আর হাসা ছাড়া আমার কিচ্ছু করার ছিল না। নিজেকে ভীষণই বোকা মনে হচ্ছিল। যতই বক্তারা আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন,ততই আমি হাসছি এবং আরও বেশি করে নিজেকে নির্বোধ লাগছিল। ঈশ্বর!কেন আমি একটুও কিছু বুঝতে পারছি না। বক্তারা নিশ্চয়ই ভাবছেন,আমি কি আদৌ কিছু বুঝতে পারছি,কেন আমি এই ধরনের সেমিনারে এলাম,হয়ত এরকম আরও কত কি। আমি মেনে নিচ্ছি এগুলো সবই আমার মনের ভ্রান্ত ধারণা। কিন্তু বিশ্বাস করুন এমন কোনও ইভেন্টে যদি আপনি যান যেখানকার লোকজন এবং বিষয় সম্বন্ধে আপনার সামান্যতম ধারণাও নেই, এই ধরনের ভ্রম আপনাকে ছেঁকে ধরবেই।

আমায় স্বস্তি দিয়ে আলোচনাচক্র শেষ হল। শ্রোতারা করতালি এবং অভিবাদন দেওয়া শুরু করলেন। আমিও একটু সতর্কভাবে বাকিদের অনুসরণ করলাম। সাধারণত এই ধরনের অনুষ্ঠানে আপনারা আমাকে দেখতে পাবেন হলঘরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াতে। কিন্তু সেদিনের দৃশ্যটি একটু আলাদা ছিল। হঠাৎ আমার দুজন পরিচিত মানুষ আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁরা অন্যান্য অ্যান্ত্রেপ্রেনিওরদের সঙ্গে আমায় পরিচিত করে দিতে চাইলেন। শেষ পর্যন্ত যে কাজটি আমি ভালো পারি তা করার সুযোগ এল। আমার সামনে তখন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট নয়, কিছু অ্যান্ত্রেপ্রেনিওর দাঁড়িয়ে। এবং আপনারা বিশ্বাস করুন যত আমি এই ভদ্র বিনীত মানুষগুলির সঙ্গে কথা বলতে লাগলাম,ধীরে ধীরে আমার হারানো আত্মবিশ্বাস ফেরত এল। এঁরা আমাদের B2C শিল্পপতি কিংবা ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের তুলনায় অনেক শান্ত,সহজ। আমায় বললেন আমি কেন তাঁদের গল্প বলি না! তাঁরা চান তাঁদের কথাও লোকে জানুন। সেইসব কথা আমি আমার আরেকটি গল্পের জন্য তুলে রেখে তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে এবং বুঝতে শুরু করলাম। আমি জানি আমি ভালো শ্রোতা,আমি শুনতে পারি এবং মানুষের কথা বুঝতেও পারি। ইভেন্ট থেকে ফেরার পথে এই ঘটনার কথা আমি ভাবতে লাগলাম। মনে পড়ল Women’s Day-র একটি ইভেন্টের কথা এবং এরকম আরও কত কত ইভেন্টের কথা যেখানে আমি প্রতিদিন অংশ নিই।

দিল্লিতে এবছর আমাদের Women’s Day-র কনফারেন্সে বহু উজ্জ্বল আর মেধাবী মহিলা অ্যান্ত্রেপ্রেনিওর আর স্টার্টআপরা এসেছিলেন। জানতে চাইছিলেন ব্যবসা চালানোর নানান কায়দা এবং মারপ্যাঁচ। বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন ব্যবসায় বিনিয়োগ,ভ্যালুয়েশন,আর্থিক পরিকাঠামো এবং আরও বহু ব্যবসায়িক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে। তাঁদের কাছে এইসব বিষয় জলভাত হলেও আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম উপস্থিত শ্রোতারা অনেকেই কিছু বুঝতে পারছিলেন না। অনেকেই হাত তুলছিলেন,জানতে চাইছিলেন তিনি ফিন্যান্স কিংবা প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ নন, তিনি কি ধরনের ব্যবসা করতে পারেন,কিংবা মূলধন জোগাঢ় করবেন কিভাবে,এমন আরও অনেক প্রশ্ন।

আমি বললাম,ফান্ডিং বিষয়ক অনেক লেখা আমি লিখেছি, কিন্তু গত আগষ্টে ইওর স্টোরির জন্য প্রথম রাউন্ডের ফান্ড জোগাঢ় করার আগে অবধি এ বিষয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা ছিল না। মানুষের লড়াইয়ের গল্প,আর সেই গল্পের জগতে আমার অবাধ বিচরণ। অনেক বৌদ্ধিক তত্ত্ব নিয়ে আমি নাড়াঘাটা করি। এভাবে আমি ভালো আছি। ভালোই কাজ করছি। বাস্তব জীবনে চলার জন্য,স্টার্টআপ করব বলে টার্মসিট, ক্লজেজ, SHA, ফাইন প্রিন্ট এবং প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় আরও অনেক কিছু বাধ্য ছাত্রীর মতো শিখে নিয়েছি। যখন কাজ করতে হবে তখন শেখা ছাড়া আপনার আর কোনও উপায় নেই। যেটা বুঝবার সেটুকু বুঝে নিতেই হবে। এবং বাকিটা আপনার উকিল আর অ্যাকাউন্টেন্টের উপর ছেড়ে দিন। আমি প্রয়োজনীয় বিষয়টুকু বুঝে নিয়েছি। তারপর তো আমার উকিলরা রয়েইছেন। তাঁরা বোঝাপড়া করার জন্য প্রচুর মিটিং আর ফোন কল করেন। আমার কি সবটা জানার প্রয়োজন আছে? একদমই না। আমার সংস্থায় দক্ষ ব্যক্তিরা আছেন। তাঁদের আমি আমার সাধ্যমত বেতন দিই। তাঁদের যোগ্যতার উপর একটু ভরসা কেন করব না আমি? উত্তর হল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

পৃথিবীতে বহু জ্ঞানী ব্যক্তি রয়েছেন। একজন সফল অ্যান্ত্রেপ্রেনিওর হবার জন্য আমাদের কি সবটা জানা প্রয়োজন? আমার তা মনে হয় না। আসল বিষয় হল আপনি জানেন যে আপনি কতটা জানেন না। আমরা তখনি হোঁচট খাই যখন আমরা সবজান্তা ভাব দেখিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। "আমি জানি না,আপনি বুঝিয়ে বলুন",এই কথাটা বলতে পারা আপনার উদারতার পরিচয়। একবার করে দেখুন। ভীষণ আরাম লাগবে। আমরা অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যে বাস করে "আমি জানি না" বলতে পেরে হয়ত একটু আলাদা হতে পারব।