আহ্লাদী পানের খানদানি ব্যবসা...

0

বৃষ্টি হলে বিপদ, চড়া রোদেও শান্তি নেই। পোকামাকড়ের দৌরাত্ম্য সামলাতে হয়। এত যত্ন নেওয়া হয় বলেই পানপাতার স্বাদে কত বৈচিত্র্য। পানের গুনেই পূর্ব মেদিনীপুরের বড় অংশের মানুষ সমৃ্দ্ধির খোঁজ পেয়েছেন। এ রাজ্যের প্রায় পুরো চাহিদা মিটিয়ে এই জেলার পান পৌঁছে যাচ্ছে বেনারস, পটনা, মুম্বই। হোলি এগিয়ে আসায় ভিনরাজ্যে পানের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে।

দু দিকে বাঁশের দণ্ড। ওপরের খড়, ঘাস বা নারকেলের পাতা দিয়ে ছাউনি। আর এই চালার নিচে চারাগাছ বসানো। এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকে পানের চারা বসানো হয়। কাঠামোর দৌলতে লতাপাতায় বাড়তে থাকে গাছ। এই বৃদ্ধি নির্ভর করে যত্নের ওপর। বৃষ্টির জল এক ফোঁটা পড়লে পাতার বারোটা বেজে যাবে। রোদ আসবে, তবে সরাসরি নয়। চড়া রোদ পড়লে পাতার রং হলদে হয়ে গেলে কেউ নেবে না। গরমের সময় দিনে কম করে চারবার জল দিতে হবে। একেবারে গ্রিন হাউসের মতো আস্তানা বানানোর পরও নিশ্চিন্ত হওয়া‌ যায় না। সময় এবং পরিমাণ মতো ওষুধ, কীটনাশক বা সার না দিলে গাছের আয়ু বাড়বে না। গাছ লাগানোর ৬ মাস পর থেক পাতা সংগ্রহ করা যায়। ঠিকঠাক পরিচর্যা হলে একটা গাছ থেকে বছর তিনেক পাতা পাওয়া যায়। পান নিয়ে এমন উপক্রমণিকা করার কারণ এই অর্থকরী ফসলের পিছনে এতটাই লেগে থাকতে হয় চাষিদের। আমাদের রাজ্যের পূর্ব মেদিনীপুর পান উৎপাদনে সবার আগে। জেলার খেজুড়ি, পটাশপুর, ভগবানপুর, তমলুক, রামনগরের মতো ব্লকগুলিতে চাষিদের প্রধান পেশা পান।

২০০৯ এ আয়লার দাপটে এই জেলার পান চাষের কার্যত দফারফা হয়ে গিয়েছিল। ঝড়ের ধাক্কায় আশি শতাংশ পান বাগান নষ্ট হয়ে যায়। তারপর থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেন চাষিরা। আগে জৈব পদ্ধতিতে চাষের রমরমা হলেও এখন খরচ বাঁচাতে রাসয়নিক সারের ব্যবহার হয়। তাতে ফলন বাড়লেও সংরক্ষণ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। উদ্যান পালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে জেলার প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। ১৫ থেকে ২০ রকম প্রজাতির পান হয়। যার মধ্যে অন্যতম, ছাঁচি পাতা, কালো পাতা, হলুদ পাতা, বালি পাতা, চন্দ্রকোণা পাতা। আমরা যাকে মিঠা পাতা পান বলে অভ্যস্ত তাকে পূর্ব মেদিনীপুরে ছাঁচি পাতা বলা হয়। তবে হলুদ পাতা ও কালো পাতার পানের বেশি চাহিদা বলে জানালেন রামনগরের পানচাষি দেবব্রত জানা। বছরের তেইশের এই যুবার কথায়, শীত পড়লেই পানের চাহিদা বাড়ে। তবে দোল, হোলির মতো পরবে সবথেকে বেশি বাজারে টান থাকে। কারণ সেই সময় পান চলে যায় বিহার, বেনারস, মুম্বই, দিল্লিতে। সব মিলিয়ে জেলায় মাসে ২০ কোটি টাকার পানের ব্যবসা হয়। দেবব্রতর মতো শ্রীহরি জানা, রাজেশ চৌরাসিয়ারাও পানের গুনে নিজেদের আর্থিক অবস্থা অনেকটা পাল্টাতে পেরেছেন।

মজুরি, সার, পরিকাঠামো ধরে বিঘে প্রতি পান চাষে খরচ পড়ে ১৫-২০ হাজার টাকা। চাষ ঠিকঠাক হলে মাস ৫-৮ হাজার টাকা রোজগার হয় চাষিদের। চাষের সময় যেমন যত্ন, তেমন কলকাতা ও বাইরে পাঠানোর সময়ও পানপাতার যত্ন নিতে হয়। ঝুড়ির ভিতর পানের গোছ করে, তার ওপর খড় ও কাপড় দিয়ে পান থাক থাক করে সাজাতে হয়। তার ওপর ঢাকনা দেওয়ার পর প্যাকেজিং সম্পূর্ণ। আর এই পানের মোড়কে ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে উপকূলবর্তী জেলার চালচিত্র।