বয়নশিল্পে বিশ্বজয় নেতাজী পরিবারের গৃহবধূর

সুরাইয়া হাসান বসু ভারতের বয়ন শিল্পের এক অতি উল্লেখযোগ্য নাম। বিয়ে করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর ভাইপো অরবিন্দ বসুকে। বয়স ৮৪ পেরিয়ে গেলেও কাজের উদ্দ্যম রয়েছে যথেষ্ট।

0

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সঙ্গে নানা ভাবে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। তিনি বিয়ে করেছিলেন অরবিন্দ বসুকে। এই অরবিন্দ বসু ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর ভাইপো। কিন্তু নেতাজিকে কোনোদিনই দেখতে পাননি। তা নিয়ে আক্ষেপ তাঁর কম নেই। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধুমাত্র বসু পরিবারের মধ্যে আবদ্ধ রাখা বোধহয় ঠিক হবে না। তিনি সুরাইয়া হাসান বসু। বয়স ৮৪। কিন্তু তাঁর কথায় কিংবা কাজেকর্মে বয়সের ছাপ পড়েনি এতটুকুও। সুরাইয়া ভারতের বয়ন শিল্পের এক অতি উল্লেখযোগ্য নাম। ঔরঙ্গাবাদে তাঁর এই বয়নশিল্পের রাজত্বে নিত্যনতুন ছোঁয়া লাগে নানা ডিজাইনের।বয়ন শিল্পের বাজারে তাই ওনাকে বলা হয় টেক্সটটাইল গুরু।


সুরাইয়ার পথ চলা শুরু হয়েছিল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেই। ভর্তি হয়েছিলেন সরকারের প্রতিষ্ঠান কটেজ ইন্ডাস্ট্রিস এম্পোরিয়ামে। সেখানে সুরাইয়া শিখেছিলেন সেলসম্যানশিপ, বিভিন্ন হাতে তৈরি জিনিস এবং বয়নশিল্পের উৎপাদনের কৌশল। সুরাইয়া জানিয়েছেন, চার বছরের এই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারন। একবার লন্ডন থেকে একজন অধ্যাপক আসেন তাঁদের এম্পোরিয়ামে। সেই অধ্যাপকই তাঁকে দেখা করান পুপুল জয়কারের সঙ্গে। যাঁর হাত ধরেই সব শেখা সুরাইয়ার। পুপুল জয়কার দিল্লির হ্যান্ডলুম হ্যান্ডিক্রাফট কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত। পুপুলের সঙ্গে দেখা হওয়া তাঁর জীবনের একটা বড় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন সুরাইয়া। যে সুযোগ তাঁর জীবনে এসেছিল, তাকে অবহেলা করার সাহস সুরাইয়ার ছিল না।


সুরাইয়ার এই প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন তাঁর চাচা আবিদ হাসান সাফ্রানি, যিনি থাকতেন দিল্লিতে। আবিদ 'মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্সের' সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, নেতাজির পার্সোনাল সেক্রেটারিও ছিলেন আবিদ। এরপর পরই সুরাইয়ার বিয়ে হয় অরবিন্দের সঙ্গে। অরবিন্দ তখন বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির ট্রেড ইউনিয়ন সেক্রেটারি ছিলেন। এর পর আবিদ ফিরে যান হায়দ্রাবাদে। সেখানে কিছু জমি কেনেন এবং ডেকে পাঠান সুরাইয়াকে। আবিদই তাঁকে পরামর্শ দেন সেখানে আলাদা একটি হ্যান্ডলুম প্রোডাকশন ইউনিট খোলার। আর সময় নষ্ট করেননি সুরাইয়া। ঔরঙ্গাবাদে চার ধরনের পার্সিয়ান ফেব্রিক নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। পৈথানি, জামেওয়ার, হিম্রু, মাশ্রু। শুরু হয় সুরাইয়ার ওয়েভিং স্টুডিও। এখানে কাজ শুরু করার পর সময় মত অরবিন্দ বসুও সেখানে আসতেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর বসু পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটাই কমে যায় সুরাইয়ার।


সুরাইয়ার এই স্বপ্নকে পূরণ করার জন্য উদয়াস্ত অনেক তাঁতী সেখানে কাজ করে। সুরাইয়া এমন কয়েকজন মানুষকে বেছে নিয়েছেন যাঁদের কাজের খুব দরকার, যেমন- কয়েকজন বিধবা, যাঁদের কোথাও যাওয়ার নেই, নিজের সন্তানকে খেতে দিতে পারেন না। দিনের পর দিন তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন সুরাইয়া। এক একজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করতে সময় নিত ৩-৪ মাস। পরের দিকে আর পেরেও উঠতেন না। তাই প্রফেশনাল একজনকে রেখেছিলেন প্রশিক্ষণের কাজের জন্য। তাঁতিদের ছেলেমেয়েরা যাতে বিনাপয়সায় পড়াশুনা করতে পারেন, তার জন্য একটি স্কুলও স্থাপন করেছেন সুরাইয়া। সাফ্রানি মেমোরিয়াল হাই স্কুল। নার্সারি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় সেখানে।


এই ৮৪ বছর বয়সেও তাঁর অনেক কিছু করা বাকি বলে মনে করেন সুরাইয়া। কিন্তু এখন আর তাঁতের কাজ দেখে উঠতে পারেন না। তাই স্কুলে যান, সেখানে গিয়ে পরান। ওই ছেলেমেয়েদের জন্য বেশ গর্ব অনুভব করেন সুরাইয়া। প্রত্যেকে খুব ভালো রেজাল্ট করে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরেও গিয়েছেন। লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসাটা তাঁর হঠাৎ হয়নি। সুরাইয়ার বাবা ছিলেন আব্দিস রোডের হায়দ্রাবাদ বুক ডিপো'র মালিক, যেটি হায়দ্রাবাদের প্রথম বুক স্টোর ছিল, যেটি বিদেশি প্রকাশনার বই রাখত।


লেখক-শাশ্বতী মুখার্জী

অনুলেখক-চন্দ্রশেখর চ্যাটার্জী

Related Stories