শিল্পিত নির্ভীক নারীবাদ, পথ দেখাল গুলাবি গ্যাঙ

0

নৈতিকতা, আদর্শ এবং মনুষ্যত্ব-গুণগুলি বয়ে বেড়াবার একমাত্র দায় এবং দায়িত্ব মহিলাদের কাঁধেই চাপানো ছিল। এ এক অসম বৈপরিত্য। নারীবাদের ভুল ব্যাখ্যার কারণে পুরুষকে ঘৃণা করা বা মহিলাদের বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলি গুরুত্ব পেত। দ্য ফিয়ারলেস কালেকটিভ পথ দেখিয়েছিল কীভাবে ভিসুয়াল আর্ট বা দৃশ্য শিল্পের মাধ্যমে নারীবাদকে মানবিক এবং সবার জন্য বোধগম্য করে তোলা যায়।

বেঙ্গালুরুর শিল্পী শিলো শিব সুলেমানের মস্তিষ্ক প্রসূত সৃষ্টি এই ফেয়ারলেস কালেকটিভ। শুরু হয়েছিল প্রতিদিনের নারীবাদ নিয়ে কাগজের ক্যানভ্যাসে রঙ তুলিতে নিজের মনের কথা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। যেখানে বড় বড় কথা, চিৎকার, প্রতিবাদও আঁচড় ফেলতে পারেনি, কয়েক শতক ধরে চিত্র সেখানেই শিল্পের ভাষায় কঠোরভাবে পরিস্থিতি বুঝিয়েছে। ফিয়ারলেস কালেকটিভ কথাবার্তাকে কড়া সমালোচনা কিংবা বইয়ের চকচকে পাতায় ফরাসি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আমূল সংস্কারকামী মতবাদের দুর্বোধ্য বৃত্তে আটকে রাখে না। সর্বস্তরের মহিলা-পুরুষ, সর্বোপরি মানুষের কাছে নিয়ে যায় ফিয়ারলেস কালেকটিভ। আরথির রাইট অফ দ্য ব্যাট, আমাদের বুঝিয়েছিল দিল্লির গণধর্ষণের মতো ঘটনা সামাজিক ব্যধি উসকে দেয়। ‘শিলো তখন যে পোস্টারগুলি বানাত, সেগুলি নিজের অবস্থার প্রতিচ্ছবি ছিল। সেই সময় আমরা নিজেরাই নিজেদের বলতাম, বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না, বা বাড়িতে ছেড়ে দেব, অথবা এখানেই থেকে যাও টাইপের কথাবার্তা। পোস্টারগুলিতে সেই পরিস্থিতিই ফুটে উঠত। তখনও ধারণা ছিল না বিষয়টা এইরকম দাঁড়াবে’, বলেন আরথি। তাঁদের নতুন ভেঞ্চার দ্য গুলাবি গ্যাঙ আর্ট প্রজেক্ট। মুম্বইয়ের একটি সংস্থা রিসাইকেলওয়ালা ল্যাবের সঙ্গে গাঁটছড়া রয়েছে গুলাবি গ্যাঙের। রিসাইকেলওয়ালা ল্যাব, যারা মূলত যুগচেতনার যুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে আর্ট এবং সিনেমাকে মিশিয়ে ব্যবহার করে। আমরা কথা বলেছিলাম রিসাইকেলওয়ালা ল্যাবের রুচি ভিমানি এবং দ্য ফিয়ারল্যস কালেকটিভের আরথি পার্থসারথির সঙ্গে। জানালাম তাঁদের নানা অভিজ্ঞতার কথা।

২০১২ সালে যখন নিশথা জৈনের গুলাবি গ্যাঙ রিলিজ হয়, সিনেমার মাধ্যমে তার সামাজিক প্রভাব নজরে পড়েছিল রিসাইকেলওয়ালা ল্যাবের। রুচি জানান, ‘সেই সময় আমরা অফ-বিট বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল গুলাবি গ্যাঙ শুধু বিষয়বস্তুর জন্য নয়, গল্প বলার ধরনের জন্যও দেখা উচিত। বিষয়বস্তু অনেক ছবিরই বেশ গভীর, কিন্তু গুলাবি গ্যাঙে রয়েছে সাসপেন্স, ড্রামা, খুন, যা ফিকশনে সব দর্শকই দেখতে চান। আমাদের মনে হয়েছিল, এই সিনেমার পাশে থাকার অর্থ, মানুষের ছবি দেখার নজরে পরিবর্তন আনা। এক বছর পর মুম্বইতে ওই সিনেমা দেখার সুয়োগ হয় আমার। বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। গুলাবি গ্যাঙের একটা অংশ হতে পেরে, সমর্থন এবং প্রচার করে এমন একটা মঞ্চ দিতে চেয়েছিলাম, যাতে মনে হয় এটা সিনেমার চাইতেও বেশি কিছু’।

গুলাবি গ্যাঙের গল্প বলার ধরন এবং সৃজনশীলতা মুগ্ধ করেছিল ফিয়ারলেস কালেকটিভ এবং রিসাইকেলওয়ালা ল্যাবকে। যেভাবে শিল্প, সিনেমা এবং প্রতিবাদের মিশেল ঘটেছিল, সেটাই দুই সংস্থার মন কাড়ে। ফলে দুটি সংস্থার একসঙ্গে কাজ করতে অসুবিধাও হয়নি। ‘শিলো যেভাবে, যে উৎসাহ নিয়ে এই প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলেছিল,সেটাই আমাদের ভালো লেগেছিল। গুলাবি গ্যাঙ আর্ট প্রজেক্ট লঞ্চ করার সিদ্ধান্ত নিই। যাতে অনেক বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তার জন্য সামাজিক সম্পৃক্ততা আরও বেশি করে চাইছিলাম’, বলেন রুচি। ‘একটা ডিভিডি খুব বেশি কী হতে পারত? ডাউনলোড করলেই হয়। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম ডিভিডিটা সংগ্রহে রাখার মতো হোক। পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ফিয়ারলেস কালেকটিভকেই ঠিক সঙ্গী মনে হয়েছিল’, যুক্তি দেন রুচি। দ্য গুলাবি গ্যাঙ আর্ট প্রজেক্ট হল এমন একটি মঞ্চ, যেখানে ডকুমেন্টারি থেকে যারা আর্টে উদ্বুদ্ধ হন তাঁদের জন্য সব সময় উন্মুক্ত দ্বার। এখানে সবাই মত প্রকাশ করতে পারেন এবং শিল্পকে মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে আওয়াজ তুলতে পারেন। এটা হতে পারে কোনও আঁকা ছবি, পেন্টিং, ফটোগ্রাফ বা হিন্দিতে ছোট কবিতা। ‘শিল্পের মাধ্যমে মনের ভাবের প্রকাশ আমরা অনলাইন ব্লক, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে ছড়িয়ে দিতে চাই। কারণ আমাদের মনে হয়েছে, এইসব মঞ্চে ভাবের আদান প্রদান এবং প্রতিনিয়ত আলোচনা হবে। ভারচুয়াল ওয়ালের বাইরে বাস্তবের দেওয়ালেও মেসেজগুলি পৌঁছে দিতে চাই। নানা শহরের দেওয়ালে, পিলারে ওয়ালআর্ট কতটা সম্ভব সেটাও বোঝার চেষ্টা করছি। গুলাবি গ্যাঙের ডিভিডি কভারটা ছিল এই আর্ট ব্যবহারের এমনই একটা প্ল্যাটফর্ম। প্যকেজিংটা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যেখানে নানা কলার সমন্বয় ঘটেছিল’, বলেন রুচি।

আরথি এই আন্দোলনের প্রভাব বুঝতে পারেন। সারা দেশের মহিলা-পুরুষদের কাছ থেকেই এই আইডিয়াগুলি এসেছে। শিল্পের এই মাধ্যমকে নানা শহরের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিয়ে তার গুরুত্ব এবং দীর্ঘকালীন প্রভাবকে আরও দৃঢ় করে। ‘ফিয়ারলেস কালেকটিভ পোস্টার দিয়ে শুরু করছিল। এই পোস্টারগুলিই ভয়হীন বলতে যাকে বোঝায় ঠিক তাই দেখাতো। শিলো মানুষের মধ্যে ঘুরে ঘুরে দেখেছে, অনেকটা মানুষের সমন্বিত রাগের বহিপ্রকাশ যেন। এইভাবে দেখতে গেলে নারীবাদ এবং পাবলিক আর্টের মধ্যে মিল রয়েছে। কারণ দুই ক্ষেত্রে লক্ষ্য এক। গ্রাফিটি, পারফরমেন্স এবং ইন্সটলেশন-এগুলি হল মাধ্যম, যার সাহায্যে আমরা নানাভাবে মানুষের মধ্যে মিশে যাই। বেঙ্গালুরু, আমদাবাদ এবং মুম্বইয়ে আমরা ওয়ালআর্ট করেছি। নানা স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ভিসুয়াল আর্টের একটা তাৎক্ষণিক প্রভাব রয়েছে। মানুষের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে শিল্পর এই মাধ্যমও ব্যবহার করেছি’, বলেন আরথি।

‘নারীবাদ আসলে সম অধিকারের লড়াই। নারীবাদ মানে পুরুষদের ঘৃণা করা নয়। আমার এক বন্ধুর মতে, সব নারীবাদীরাই পুরুষদের ঘৃণা করে, পুরুষ দেখলেই রেগে যায়। যখন তাকে চেপে ধরি এমন নারীবাদী কারও একজনের নাম বলার জন্য, সে কিন্তু বলতে পারল না। তাহলে এইসব ধারণা আসছে কীভাবে’? প্রশ্ন আরথির। রুচি জানান, ‘মানুষ আমাদের কাজে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। সারা দেশ থেকে ৫০ জন ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছেন। ব্রিটেন, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকেও রয়েছেন কয়েকজন। সাড়া দেখে আপ্লুত হই, বিশেষ করে ভারতে, যেখানে মহিলাদের ক্ষমতায়ণ ইদানীং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমরা একটা ভেন্যুতে কাজ করে চলেছি, যার মাধ্যমে আমাদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাব এবং শিল্পের মাধ্যমে বার্তা দেব’। যাদের ইন্টারনেটের মতো পরিষেবা নেই, মূলত গ্রামের মানুষের কাছে এই শিল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়া নিয়ে রুচি বলেন, ‘এই প্রজেক্ট থেকে কেউ সুবিধা পাচ্ছেন ভাবতেই ভালো লাগে। ফিয়ারলেস কালেকটিভের মতো রিসাইকেলওয়ালা ল্যাবও আশা করে সামাজিক দায়দায়িত্বগুলি রাস্তায় নিয়ে আসতে চায়। তবে সেটা এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু বিষয়টি মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং খুলে রাখা যাতে যেই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেটা পৌঁছে যায়’। সুর মিলিয়ে আরথি বলেন, ‘মুম্বইয়ের কোলিওয়াডায় মাৎস্যজীবীদের সঙ্গে প্রজেক্ট করেছে শিলো। শ্রেণি, লিঙ্গ বৈষম্য আর জাতপাতের সীমা ভেঙে দিতে পারে শিল্প। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, এই বিপ্লব আর শুধু শিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক পোস্টার সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি, যারা নিজেদের শিল্পী হিসেবে ভাবতেই পারেন না। এটা হল আসলে মানুষের দৃঢ় বিশ্বাসের বহিপ্রকাশ। কলকাতা, দিল্লিতে প্রদর্শণী করেছি। ভবিষ্যতে আরও করার ইচ্ছে রয়েছে’।

‘আমাদের ফেসবুক অ্যালবাম দেখলে বুঝতে পারবেন ফিয়ারলেসনেস এবং নারীবাদ নিয়ে নানা লোকের নানা মত। মানুষের যা মনে হচ্ছে তাই করছেন,যা বুঝতে পারছেন না বোঝার চেষ্টা করছেন। এমন শিল্পীরা রয়েছেন যারা এই বিপ্লবে এসে পরস্পরকে চিনেছেন, তারা শিলোর সঙ্গে কাজ করতে মুখিয়ে আছেন এবং সারা শহরের দেওয়ালে প্রতিবাদী চরিত্রদের এঁকে দিতে চান’,বলেন আরথি।

‘একটা সিনেমা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে লোকে আঁকছেন, ভাবা যায় না। গুলাবি গ্যাঙ নিসন্দেহে ভালো সিনেমা এবং সমাজের কাছে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। আমি চাই লোক এই সিনেমার অংশ হোন, আমাদের মঞ্চ ব্যবহার করুন। আমি দেখতে চাই মানুষ এই বিপ্লবে অংশ নিয়েছেন’। রুচির সঙ্গে একমত আরথি বলেন, ‘আসলে এটা একধরনের ভাবের আদান প্রদান। বলা ভালো, শিল্পের মাধ্যমে নারীর অধিকার, নারীবাদের মতো ইস্যুগুলিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে আনা। আশাকরি, একদিন নকশা আর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হবে আটুট আত্মীক বন্ধন’।

(লেখা-এস আইজাজ, অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস)