আপনার সংস্থার কী চাই VC না PE?

2
মেট্রিক্স। ছদ্ম আধ্যাত্মিক সেই হলিউড মুভি নয়। আপনার সংস্থার পারফরমেন্স চার্ট নিয়েই কথা বলছি। কারণ অনেক কিছুই ওই মেট্রিক্সের ওপর নির্ভর করে। সব থেকে বেশি নির্ভর করে আপনার সংস্থা বিনিয়োগ পাবে কি পাবে না, সেটা।

স্টার্ট আপ ইকোসিস্টেমে দু'তিনটে শব্দ আছে যেগুলো কোহিনুর হীরের মত জ্বল জ্বল করে। সকলেই তাকিয়ে থাকেন ওইসব হীরের দিকে। কার কপালে সে সব শিকে ছিঁড়বে! দেবা ন জানন্তি। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এরকমই একটি মনোগ্রাহী শব্দ। এই শব্দটি উচ্চারিত হলে শামসুর রহমানের উপমার মতো ‘নিকনো উঠোনে ঝরে রোদ’। স্টার্টআপদের অ্যাড্রেনালিন নিঃসরণ হয়। অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে স্টার্টআপদের ইন্দ্রিয়।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থাগুলি আপনার ভেঞ্চারে টাকা ঢালে। আর আপনি সেই টাকায় বাড়িয়ে নেন আপনার স্বপ্নের ব্যান্ডউইথ। ফলে স্টার্টআপের জীবনে ভীষণ দরকারি বিন্দুর নাম ফান্ড, ইনভেস্টমেন্ট, তাই ভীষণ জরুরি ব্যক্তির নাম ইনভেস্টর, ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট।

জানবেন ইনভেস্টরেরও কিন্তু আপনাকে দরকার। কারণ তাঁর ব্যবসা, সস্তায় কেনা আর বেশি দামে বিক্রি করে দেওয়া। তাই তাঁর দরকার আপনাকে। আপনি যখন স্টার্টআপ তখন আপনার সংস্থার ভ্যালুয়েশন কম। শেয়ারের দাম সস্তা। কিন্তু আপনার যদি দম থাকে, আইডিয়া যদি ফুল প্রুফ হয়, টিম যদি ঝিমনো মুরগিদের নিয়ে তৈরি না করে থাকেন আর বাজার যদি আপনার পরিষেবা পাওয়ার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকে তবে আপনি দৌড়বেন। বিনিয়োগ যিনি করেন তিনি খুব ভালো জানেন যে আপনি দৌড়লে কতদূর পৌঁছতে পারবেন, আপনার অ্যাটিটিউডই বলে দেবে আপনি কে, এবং কেন এই ট্র্যাকে নেমেছেন। আপনার প্রতিভা যদি থাকে তবে আপনি পাবেন ইনভেস্টমেন্ট। কারণ আপনার সংস্থার ভ্যালুয়েশন বাড়বে। আর সেটা হলেই বেশি দামে তার সস্তায় কেনা স্টেক বেচে দেওয়ার সুযোগ পাবেন আপনার ইনভেস্টর।

ফলে মনে রাখবেন আপনার স্টার্টআপ অগণিত অদৃশ্য সুতোয় ঝুলছে। আপনাকে সেই অদৃশ্য সুতোগুলো উপলব্ধি করতে হবে। তবেই শিকে ছিঁড়বে।

এবার আসি বিনিয়োগের দুনিয়ার দুটি পরিভাষা প্রসঙ্গে। VC এবং PE দুটো শব্দ গায়ে গা লাগিয়ে এমনভাবে বসে আছে যে অনেক সময়ই দুটো বিষয় নিয়ে গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থেকে যায়। যেমনটা বলেছিলাম ঠিক তেমনটাই দুটোই সস্তায় কিনে বেশি দামে বেচার সঙ্গে যুক্ত। দেখতে শুনতে প্রায় এক রমক কিন্তু বিস্তর পার্থক্য আছে এই দুটি Fund-এ। আজ আমরা দুটোকে আলাদা করার চেষ্টা করব।

কারণ প্রাইভেট ইক্যুইটি এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আদতে একে অপরের বিপরীত। প্রাইভেট ইক্যুইটি পরিমাণটা নিয়েই ভাবে। অঙ্কই সেক্ষেত্রে আসল। কিন্তু ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ক্ষেত্রে আগে ব্যক্তি তারপর সংখ্যা। অঙ্ক মাথার ভিতর ঘুরপাক খায় পরে। দুটো তো এক হতে পারে না।

অন্যভাবে বলতে গেলে সচরাচর চালু প্রোডাক্টটি চালু ক্যাশ ফ্লো সমেত কোনও একটি সংস্থায় টাকা ঢালে প্রাইভেট ইক্যুইটি। এবং সেই সংস্থার খোল নলচে বদলে সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ধুকতে থাকা সংস্থাকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতেও পারে পি ই ফান্ড। এরকম উদাহরণ প্রচুর আছে।

আর ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। অ্যাপলের উদাহরণটাই বরং ধরুন। ১৯৭৭ সালে স্টিভ জোবস এবং স্টিভ ওজনিয়াকের ওপর ভরসা করতে পারছিলেন না কেউই। সামথিং ভেঞ্চার্ড তথ্যচিত্রে দেখে থাকবেন, ভি সি ডন ভ্যালেন্টাইন বলছেন তিনি টাকা ঢালতে পারেন তবে শর্ত একজন অভিজ্ঞ একজিকিউটিভকে নিয়োগ করতে হবে। মাইক মারককুলাকে সিইও নেওয়া হল। মারককুলা বলছেন, গোটা দুনিয়ার ভিসিরা জোবস বা ওজনিয়াককে পছন্দ করছিলেন না, কারণ দেখতে ভালো লাগত না, মুখ ভর্তি দাড়ি, গায়ে উৎকট গন্ধ, ভুলভাল হাস্যকর জামাকাপড় পরতেন ওরা দুজন, বয়স কম ছিল আর কথাবার্তা যেভাবে বলতেন তাতে কেউ ওদের ঘাগু ব্যবসায়ী বলবে না। তা সত্ত্বেও ভ্যালেন্টাইনের টাকা কিন্তু পেয়েছিল অ্যাপল।

ফলে দেখাই যাচ্ছে একদিকে পিই ফান্ড যখন চালু সংস্থা খোঁজে, ক্যাশ ফ্লো খোঁজে এবং বাজারে উপস্থিত এমন প্রোডাক্ট খোঁজে যার মেট্রিক্স অ্যানালাইজ করে ভবিষ্যতের লাভ দেখা যায়। আর ভিসিরা আপাত উদ্ভট জোবস ওজনিয়াককেও টাকা দেয়। ভবিষ্যতের আন্দাজ করে।

যদিও এটা ভয়ঙ্কর সরলীকৃত ব্যাখ্যা হল। তবু দুটোকে আলাদা করার চেষ্টা করলাম। আসলে দুটোই বিনিয়োগ। টাকার গায়ের গন্ধ দুটো ক্ষেত্রেই এক। আইনি প্রক্রিয়াও প্রায় এক। বিনিয়োগের চরিত্রও দৃশ্যত এক। কিন্তু দুটো বিনিয়োগের মানসিকতা দুরকম। দর্শন দুরকম। তবু মনে রাখবেন আপনার সংস্থার পারফরমেন্স মেট্রিক্স, অঙ্ক, সংখ্যা, পরিসংখ্যান দু ক্ষেত্রেই ভীষণ ভাবে জরুরি। ফলে শিকে ছিঁড়তে মন দিন মেট্রিক্সে।