বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে নয়া দিশা

আমাদের দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার নিরিখে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট এখন অন্যতম বড় একটা সমস্যা। এই মুহূর্তে প্রতিদিন একজন নাগরিক ০.২ থেকে ০.৬ কিলোগ্রাম পর্যন্ত আবর্জনা ফেলেন। একদিকে যখন স্বচ্ছ ভারত অভিযান আবর্জনা নষ্ট করার জন্য কাজ করছে, তখন ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত খোলার চেষ্টা করছে নেক্সাস-নোভাস। যদিও সমাধানের পথ এখনও অনেক দূর।

0
টিম এক্সট্রা কার্বন এর সদস্যরা
টিম এক্সট্রা কার্বন এর সদস্যরা

আবর্জনা সংগ্রহ ও সেগুলিকে একটি জায়গায় স্তূপাকারে জমা করা, আর সেই জায়গা ভর্তি হয়ে গেলে অন্য জায়গা খুঁজে সেখানে নতুন করে জঞ্জাল জমা করাই আমাদের দেশে বর্জ্য নষ্ট করার একমাত্র পদ্ধতি। ফলে স্থানাভাব তৈরি হয়েছে। এনার্জি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৪৭ সালের মধ্যে আবর্জনা ফেলার জন্য ১৪০০ বর্গ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি জায়গা প্রয়োজন। ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের এই অব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে কয়েক বছর ধরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন গৌরব যোশী ও তাঁর দলবল। বর্জ্যবস্তুকে পুনর্ব্যবহার, দ্বিতীয়বার বিক্রি ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে প্রতিটি মানুষককে সাহায্য করার কাজ করে এই সংস্থা।

ভারত বনাম বাকি বিশ্ব


শুধু ছোট সংস্থাগুলিই নয়, সারা দুনিয়ায় এখন বড় বড় সংস্থাগুলিও বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার কাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এখন ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে তৈরি হওয়া সামগ্রী দিয়ে জঙ্গলের ফেন্সিং করা হয়। নেদারল্যান্ডে বর্জ্যর ৬৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে নেওয়া হয়। আবার থাইল্যান্ডে ২২ শতাংশ বর্জ্যকে আরও একবার ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ব্রিটেনে পড়াশোনার সময় এই পার্থক্যটাই নজরে আসে গৌরবের। তিনি দেখেন, পশ্চিম দুনিয়া যে শুধু ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টটা ভালভাবে করে তাই নয়, শক্তির উৎস হিসাবেও ব্যবহার করে। গৌরবের কথায়, "২০১১ সালে ভারতে ফিরে আসি। তখন আমার চিন্তাভাবনার শরিক কেউই হতে চাইত না। সেই সময় আমার এক বন্ধু অনন্ত, আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ও তার আগেই আধুনিক শহর ও স্বচ্ছ ভারত নির্মাণের জন্য মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।"

শুরুর সময়


গৌরব যোশী এবং তাঁর সহযোগী
গৌরব যোশী এবং তাঁর সহযোগী

শুরুতেই দু’জনে জানতেন তাঁদের অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। কারণ, সেই সময় আমাদের দেশে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট শেখানোর কোনও প্রতিষ্ঠানই ছিল না। সেই কারণেই বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিজেদের দলে নিয়ে নেন তাঁরা। ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী এমন ছেলেমেয়েদেরই দলে নেওয়া হয়েছিল বলে জানালেন গৌরব। তারপরও প্রতি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে গৌরবদের। এমনকী রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনও তাঁদের এই পদক্ষেপকে ভালভাবে মেনে নেয়নি। গৌরব বললেন, "ওরা আমাদের সাধারণ ঝাড়ুদার মনে করেছিল। এই ধরনের ধ্যানধারণা বদলাতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। তারপর ধীরে ধীরে মানুষ আমাদের পরিষেবা নেওয়ার জন্য অনলাইনে বুকিং করতে শুরু করল। তখন থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে আরম্ভ হল। কিন্তু প্রথম দিকে কেউই আমাদের সংস্থায় বিনিয়োগ করতে রাজি হয়নি। নিজেদের গ্যাঁটের কড়ি খরচ করেই কাজ চালাতে হত। ভাল্প্রো আসার পর খরচের কথা না ভেবেই এখন আমরা কাজ করতে পারি।"

এক্সট্রা কার্বনের বৈশিষ্ট্য


টিম এক্সট্রা কার্বন এর সদস্যরা
টিম এক্সট্রা কার্বন এর সদস্যরা

প্রাথমিক বাধা কাটিয়ে এখন অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে এক্সট্রা কার্বন। তাদের কাছ থেকে এখন ১৬ হাজার মানুষ পরিষেবা নেন। শুধু তাই নয়, তাদের পরিষেবা নেওয়ার জন্য এখন রোজ ১০০ জন এক্সট্রা কার্বনের ওয়েব সাইটে রেজিস্ট্রেশন করান। দিল্লি, গাজিয়াবাদ, গুরগাওঁ, নয়ডা ও লুধিয়ানায় এখন এক্সট্রা কার্বনের পরিষেবা পাওয়া যায়। এবছরের মধ্যে তারা দেশের ২০টি শহরে ছড়িয়ে পড়বে। এক্সট্রা কার্বন যদিও ব্যবহৃত সামগ্রী বিক্রি করে, তা সত্ত্বেও এটা সেকেন্ড হ্যান্ড সামগ্রী বিক্রির জায়গা নয়। তারা প্রথমে একটি নির্দিষ্ট দরে গ্রাহকদের কাছ থেকে জিনিস কেনে। তারপর সেগুলিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হিসাবে তৈরি করে। তারপর বিক্রি করে। এক্সট্রা কার্বন শহরে কাগজকুড়ানিদের দল তৈরি করে তাঁদের গ্রিন সুপার হিরো প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের দাবি, স্বচ্ছতা আনতে তারা বৈদ্যুতিন ওজনমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে। দামে যাতে কোনও কারচুপি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে কোনও মিডলম্যান রাখা হয় না। পাশাপাশি পরিষেবা সংক্রান্ত সমীক্ষা করার কাজও তারা সম্প্রতি শুরু করেছে। গৌরবের কথায়, "পরিষেবার মান উন্নত করতে আমরা কল সেন্টার চালু করেছি। তাছাড়া ব্যবহৃত সামগ্রী বিক্রির জন্য হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস, ফোন কল, ইমেল ও ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করা যায়।"

আগামীর লক্ষ্য

যেখানে আবর্জনা শক্তি উৎপাদন ও সবুজায়নের কাজে লাগবে, এমন আধুনিক শহর গড়ে তোলাই লক্ষ্য এক্সট্রা কার্বনের। বিভিন্ন এলাকায়, কর্পোরেট সেক্টরে, মলগুলিতে কম্পোজিট প্ল্যান্ট তৈরি করতে চায় তারা। এছাড়াও শহরের মধ্যে বড় জায়গা তৈরি করে আবর্জনা রিসাইক্লিংয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে। গৌরব জানালেন, তাঁদের গ্রিন সুপার হিরোরা প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছে যাবে। তাঁরা মোবাইল অ্যাপ তৈরি করবেন। তার মাধ্যমে এলাকার গ্রিন সুপার হিরোদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন সাধারণ মানুষ। এর ফলে আবর্জনা ফেলার জন্য পুরসভাগুলিরও খরচ কমবে।

Related Stories