সংসদীয় ভাষা চায় রাজনৈতিক স্টার্টআপ AAP

0
দিন কয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল psychopath বলায় দারুণ চটেছে বিজেপি। সংসদীয় ভাষার অবক্ষয় নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে আলোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তাঁর সেই আলোচনার সূত্র ধরেই ভারতীয় রাজনীতিতে ভাষার অধঃপাতে যাওয়ার কারণ বিশ্লষণ করলেন AAP নেতা আশুতোষ। তাঁর ব্যাখ্যায় এই অধঃপতনে বিজেপি-র দায়ও অনস্বীকার্য –

মিস্টার জেটলি (অরুণ জেটলি) সম্প্রতি ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছেন। GST প্রসঙ্গে সংসদে অচলাবস্থার বিষয়ে উল্লেখ করেই লেখাটি শুরু হয়েছে। লেখাটির মূল বিষয়বস্তু অব্শ্য অন্য। রাজনীতিকদের ভাষার ব্যবহারে কীভাবে অধঃপতন হয়েছে, লেখাটিতে তারই ব্যখ্যা সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সকলেরই এই ব্যখ্যার সঙ্গে সহমত হওয়া উচিত। সাম্প্রতিক অতীতে যুক্তি-তক্কের বদলে পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করাটাই রাজনীতির ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবিষয়ে অস্বীকারের কোনও জায়গাই নেই। অসংসদীয় কথাবার্তা এখন এতটাই নিত্তনৈমিত্তিক ব্যপার যে কোনটা সংসদীয় আর কোনটা অসংসদীয়, তার মধ্যে ফারাক করা কঠিন। অবশ্য রাজনীতি ও আইনসভাগুলিতে যেভাবে সমাজবিরোধীদের আনাগোনা বেড়েছে তাতে এটা হওয়ারই ছিল। একটু মার্জিতভাবে বললে এটাকে ভারতীয় রাজনীতির অবক্ষয়ের বাইপ্রোডাক্ট বলা যেতে পারে। একে জাতীয় রাজনীতিতে প্রাদেশিকতার প্রভাব বিস্তারের ফলও বলা চলে।

তবে বিষয়টি বেশ গম্ভীর এবং সেইকারণেই একটু তলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা সময়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সকলেই ছিলেন সমাজের সম্ভ্রান্ত শ্রেণির সদস্য, বিলেতের সেরা কলেজ, ইউনিভার্সিটির প্রাক্তনী। ঠাঁটবাট, আদবকায়দা, কথাবার্তা সবেতেই তাঁরা ছিলেন ইংরেজদের সমতুল। ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে না মিললেও এই কায়দাকানুন তখন দেশীয় রাজনীতিকদের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশ্য খাদি পরিহিত মহাত্মা গান্ধীই প্রথম এই প্রথায় ভিন্ন মতবাদের আমদানি করেন। উইন্সটন চার্চিল মোটেও বিষয়টিকে ভালভাবে নেননি। এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলেন চার্চিল যে তিনি গান্ধীজিকে ‘হাফ নেকেড ফকির’ বলে ব্যঙ্গ করতে পর্যন্ত ছাড়েননি। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হলেও ইংরেজদের সম্ভ্রান্ত আদবকায়দাই ছিল চার্চলের স্বকীয়তা। গান্ধীজি ছিলেন এই ঠিক উল্টোটা। আম আদমির লোক হয়ে উঠতে গেলে সাহেব-সুবোদের চলনবলনে যে কাজ হবে না তা তিনি বুঝেছিলেন। জওহরলাল নেহরু আবার সাহেবি কায়দাতেই বেশি সচ্ছন্দ ছিলেন। ইংরেজিতে দখলও ছিল ভাল। সমগোত্রীয় সফিসটিকেটেড লোকজনকেই পছন্দ করতেন নেহরু। তাঁর অনুগামীদের মধ্যে বোধহয় একমাত্র লালবাহাদুর সাস্ত্রীই নিম্নবিত্ত ঘরানায় বেড়ে উঠে সামনে সারিতে এসেছিলেন। 

তবে ভারতীয় রাজনীতিদের ভাষার বিপ্লব যিনি ঘটিয়েছিলেন, তিনি রামমনোহর লোহিয়া। সম্ভ্রান্ত শ্রেণির ঘেরাটোপ ভেঙ্গে রাজনীতিকে নিচুতলার মানুষের অংশগ্রহণের পথ খুলে দিয়েছিলেন তিনিই। তার আগে পর্যন্ত ব্রাহ্মণরাই ছিলেন ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্তা। লোহিয়ার মতবাদ ছিল ‌স্পষ্ট, ‘যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাদের হাতেই সমাজের শাসন ক্ষমতা থাকা উচিত’। লোহিয়া অবশ্য তাঁর এই মতবাদের সফল রূপয়াণ দেখে যেতে পারেননি। নয়ের দশকের গোড়ায় মণ্ডল কমিশনের আগমনের সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন নেতৃত্বের আগমন ঘটে। নিজেদের সম্ভ্রান্ত পূর্বসূরীদের থেকে যাঁরা ছিলেন একেবারে আলাদা।

লালু, মুলায়ম, মায়াবতী, কাঁশীরাম, কল্যাণ সিং, উমা ভারতীরা কেউই মুখে রুপোর চামচ নিয়ে জন্মাননি, পলিটিক্যাল এলিট হওয়ার ইচ্ছেও তাদের কোনওদিনই ছিল না। সমাজের একেবারে নিচুতলা থেকে উঠে আসা এই নেতানেত্রীরাই ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ভাষার আমদানি ঘটান। ভারতীয় রাজনীতির আঙ্গিনায় এতদিন যারা প্রভুত্ব করে এসেছিলেন তারা যে এই নতুন শ্রেণির নেতাদের আগমন মোটেই ভালভাবে নেননি তা বলাই বাহুল্য। আর সেইকারণেই লালু, মুলায়মরা হয়ে উঠেছিলেন এই এলিট ক্লাসের বিদ্রুপের পাত্র। তাদের ইংরেজি বলার কায়দা, উচ্চারণ, সমস্তটা নিয়েই ব্যঙ্গ করা হত। জাতপাত সংক্রান্ত ছুতমার্গও কাজ করত এলিট ক্লাসদের মধ্যে। মায়া, মুলায়মদের নিয়ে দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধারচণের একটা সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু এই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না পলিটিক্যাল এলিটদের। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় এই জননেতাদের উপস্থিতি মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের কাছে আর উপায়ই বা কী ছিল। শিক্ষাদিক্ষা ভোটাধিকার প্রয়োগের অন্যতম মাপকাঠি হওয়া উচিত বলে দেশের সংবিধান তৈরির সময় আলোচনা হয়েছিল। এই মতবাদের উল্টো স্বরই ধরা পড়ত এই নব্য নেতানেত্রীদের আচারআচরণে।

উচ্চবর্গীয় নেতাদের সরিয়ে এই নতুন শ্রেণির উঠে আসা যে রাজনীতির ভাষার অধঃপাতে যাওয়ার একমাত্র কারণ তা আমি বলছি না। কিন্তু এই নয়া নেতৃত্বের আগমনে যে রাজনীতিতে এক নতুন ভাষার আমদানি হয়েছিল, তা অনস্বীকার্য। এর ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে ইংরেজিকে সরিয়ে আঞ্চলিক ভাষার আধিপত্য বিস্তার হতে বেশি সময় লাগেনি। এই নতুন ভাষার আমদানি সেই এলিট ক্লাসের কাছে অবশ্যই ছিল একটা বড় ধাক্কা। ভাষার এই সংঘাত ভারতীয় রাজনীতিকদের মধ্যে মজুত চিড়গুলিকে ফাটলে পরিণত করে। দুই শ্রেণির মতপার্থক্য আরও সুস্পষ্টভাবে ধরা তো পড়লই, তিক্ততাও বাড়তে থাকল দুই শিবিরে। কেউই নতি স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু সংখ্যাতত্ত্ব এই জননেতাদের পক্ষে ছিল। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমকে এই রাজনীতিক মেরুকরণের বলি হতে হল। রাজৈতিক মতপার্থক্যের জায়গা নিল রাজনৈতিক বিদ্বেষ, যুক্তিতক্কের জায়গায় এল কাদা ছোড়াছুড়ি।

বহু দিন পর আম আদমি পার্টি ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। আপ-এর কর্মপদ্ধতি গতেবাঁধা রাজনীতির সামনে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একটা সময় পলিটিক্যাল এলিট ক্লাস লালু, মুলায়মদের মেনে নিতে অস্বস্তিতে পড়েছিল। এখন আপ-এর অস্তত্বি মেনে নেওয়াটাও ঠিক তেমনই কঠিন শাসকশ্রেণির কাছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে থেকেই তো আপ নেতাদের উদ্দেশে বাছা বাছা শব্দ উড়ে আসতে শুরু করে। আমাদের নর্দমার ইঁদুর পর্যন্ত বলা হয়েছিল। দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের সময় খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমাদের নক্শাল বলে বিদ্রুপ করেছিলেন। ‘বদনসিবওয়ালা’, মানে দুর্ভাগা বলেও আমাদের কটাক্ষ করেছিলেন তিনি। একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এরকম সম্ভাষণ পাওয়া আমাদের কল্পনাতিত। উদাহরণ আরও আছে। বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং আমাদের রাক্ষস বলেছিলেন। আরও এক কদম এগিয়ে বিজেপি নেত্রী সাধ্বী জ্যোতি নিরঞ্জন আমাদের ‘হারামজাদা’ পর্যন্ত বলেন। এই ধরণের মন্তব্য থামানো তো দূর, বিজেপি নেতৃত্ব এই বক্তাদের সতর্ক পর্যন্ত করার প্রয়োজন বোধ করেনি। কদর্য ভাযা প্রয়োগের এই তালিকা আরও লম্বা। আমার এখনও মনে আছে, ২০০৭ গুজরাট নির্বাচনের সময় নরেন্দ্র মোদী সনিয়া গান্ধী ও তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জে এম লিংডো সম্পর্কে কী মন্তব্য করেছিলেন। না, আমি সেই ভাষার পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন একবার বিজেপি নেতা যশোবন্ত সিনহা তাঁকে ‘শিখণ্ডী’ পর্যন্ত বলেছিলেন। সেই যশোবন্ত সিনহা যিনি বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল যে মন্তব্য করেছেন (প্রধানমন্ত্রীকে ভীতু ও মানসিক রোগী ব‌লেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী),এখন তা নিয়ে অরুণ জেটলি ও গোটা বিজেপি শিবিরের প্রবল আপত্তি। এক্ষেত্রে আমি বলব আত্মসমালোচনা না করে শুধু পরের দিকে আঙুল তোলা উচিত নয়। জেটলি সাহেব যে ভাযা প্রয়োগের অবনতির কথা বলছেন, তা শোধরানের দায় তাঁদের নিজেদের ওপরেও বর্তায়। সংসদীয় ভাষার অবক্ষয়ের বিষয়ে আপ সচেতন এবং এই পরিস্থিতি শোধরাতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্তর্বীক্ষণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মন করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, আপ-এর জন্মের আগে সংসদে একটি এথিক্স কমিটি গড়া হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল সাংসদরা কীভাবে আচারআচরণ সংক্রান্ত নিয়মাবলী তৈরি করা। এই এথিক্স কমিটিকে কখনওই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কেন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি তার ব্যখ্যা খুব সহজ। কারণ ভারতের রাজনীতি বদলে গেছে। প্রথাগত রাজনীতিকরা নবীনদের জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নন। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস ও বর্তমানে, এই দুইয়ের সঙ্গমে যে নতুন ভাষার আমদানি হয়েছে সেটাই এই অবক্ষয়ের উৎস। তবে বলে রাখি, সময় বদলাচ্ছে, এবং সেই বদল ভালর জন্যই হচ্ছে।

Disclaimer

(লেখক: আশুতোষ, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ, লেখার মতামত তাঁর ব্যক্তিগত, অনুবাদ: ঋত্বিক দাস)