মানবিক ব্যাঙ্কের মালিক জলপাইগুড়ির দরিদ্র ড্রাইভার

0

এই যে ভদ্রলোকের ছবিটি দেখছেন, জেনে রাখুন এই ভদ্রলোক একটি ব্যাঙ্ক চালান। আস্ত ব্যাঙ্ক। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে এর কোনও লেনাদেনা নেই। মানুষের ব্যাঙ্কের মালিক। খানিকটা কাবুলিওয়ালার মতো, দুচাকায় ভর করে গ্রামের আনাচ,কানাচ,গলি, ঘুপচিতে থাকা তাঁর গ্রাহকদের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করেন। সঙ্গে থাকে বড় বড় পুঁটলি। ওই পুঁটলিতে অবশ্য এক নয়া পয়সা থাকে না। থাকে শুধু বুকভরা আত্মবিশ্বাস, দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর এক আকাশ ইচ্ছে। বিরসা মুণ্ডা বস্ত্র ব্যাঙ্কের মালিক, সাজু তালুকদারকে জলপাইগুড়ির মাদারিহাটে সব লোকে এক ডাকে চেনে।

লড়াই সেই ছোটবেলা থেকে। খাওয়া জুটত না নিয়মিত। পরনের পোশাক তো দূর। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় যে কষ্ট সয়েছেন, আর তা মনে করতে চান না। মনে করতে চান না বলেই বোধহয় এমন অদ্ভুতুড়ে ব্যাঙ্ক কাঁধে বয়ে বেড়ান সাজু। সময় পেলেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দু চাকার যানটিও চেহারায় সাধারণের চেয়ে একটু অন্য রকম। সামনে, পেছনে, সাইডে ঝোলানো একাধিক নানা সাইজের কাপড়ের পুঁটলি।

গত দশ বছর ধরে জলপাইগুড়ি জুড়ে পেশায় গাড়ি চালক সাজুকে বিরসা মুন্ডা বস্ত্র ব্যাঙ্কের মালিক হিসেবে চেনে লোকে। জলপাইগুড়ির গ্রাম থেকে গ্রামে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো, বাড়তি পোশাক সংগ্রহ করেন। তারপর পুঁটলি বেঁধে পৌঁছে যান সেই সব ঘরে যেখানে রোজ উনুন জ্বলে না, কনকনে ঠান্ডায় গায়ে চড়ে না এক টুকরো কাপড়। সাজুকে দেখে হাসি ফোটে ওদের মুখে। দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেন পুঁটলিতে বাঁধা কাপড়।

বলছিলেন ‘ছোটবেলায় খুব কষ্ট পেয়েছি। বাবা মায়ের সামর্থ ছিল না পরনের কাপড় জোগাড় করার। বড় কষ্ট হত। আমি চাই না আমার মতো আর কেউ কষ্ট পাক। তাইতো মানুষের দোরে দোরে ঘুরে বেড়াই কাপড় সংগ্রহের জন্য। বন্ধ চা বাগান, বনবস্তিতে কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে পৌঁছে যাই আমি। কষ্ট সামান্য লাঘব করতে পেরেছি দেখলেও তৃপ্তি পাই, আনন্দ হয়’, বলতে বলতে পরম তৃপ্তির রেখা নজরে পড়ে সাজু তালুকদারের মুখে।

ছেলের কাজে সবসময় পাশে ছিলেন, আছেন,থাকবেন মা লায়লা তালুকদার। ‘অসহায় দরিদ্র মানুষ, বন্ধ চা বাগানগুলির শ্রমিকদের সাহায্যের জন্য যে ভাবে কাজ করছে আমার চল্লিশ পার হওয়া ছেলে তাতে আমি গর্বিত। সারা জীবন বিলিয়ে দিক ওদের জন্য। কেউ না থাকুক পাশে, আমি তো আছি ’, বলছিলেন গর্বিত মা।

প্রথমে একা লড়াই শুরু করতে হয়েছিল। পরে পাশে দাড়িয়েছেন ,সাহায্যর করেছেন অনেকে। তাঁদেরই মধ্যে একজন জয়প্রকাশ টাপ্পো। জানালেন, ‘এমন মহৎ কাজে এলাকার সবাই সাধ্য মত সাহায্য করার চেষ্টা করি’।

নিজের কষ্ট, কঠিন পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠাকেই সম্পদ করছেন সাজুবাবু। সুখ খুঁজে নিয়েছেন অন্যভাবে। হত দরিদ্র মানুষগুলোর পরনের কাপড় জুগিয়ে সে যে কী পরম শান্তি, জানেন শুধু তিনিই। আশা, ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষকে পাশে পাবেন বস্ত্র ব্যাঙ্কের কর্মযজ্ঞে। জলপাইগুড়ি জেলা ছাড়িয়ে অন্য জেলায় এমন আরও অনেক বস্ত্রব্যাঙ্কের শাখা খুলতে চান দিন আনা দিন খাওয়া মালিকটি।