আপনার বর্জ্য-ই হয়তো রাহুলের সম্পদ

0

ইতিহাস পড়ে জেনেছি গৌতম বুদ্ধের ছেলের নাম রাহুল। ব্যস ওটুকুই। আর খুব বেশি উল্লেখ নেই তাঁর। অনেক হিন্দী ফিল্মে শাহরুখ,সলমনের রাহুল নামটা খুব পপুলার। তবে আমার আজকের গল্পের নায়ক রাহুল একজন ডিজাইনার। রাহুল খাদালিয়া। ফেলে দেওয়া আবর্জনা দিয়ে নানান ধরণের অ্যাক্সেসরি ডিজাইন করেন।

সময়টা ২০০৭ এর শেষ। বেঙ্গালুরুর NIFT-এ পড়ছেন রাহুল। একদিন সকালের একটি ঘটনা তাঁর গোটা জীবনের ভাবনাচিন্তা, দুনিয়া দেখার আঙ্গিক সবটা তছনছ করে দিল। Avenue রোডের পুরোনো বাজার এলাকা। রাহুল দোকানে গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। ফুটপাতে ছেঁড়া কাঁথা মোড়ানো একটি শিশু। দোকানের অন্যদিক থেকে নোংরা শাড়ি পরা আলুথালু চুলের এক মহিলা বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে এল। হাতে দুটো প্লাস্টিকের কাপ। একটা আঙুল দুধের কাপে আরেকটি আঙুল জলের কাপে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বাচ্চাটাকে খাওয়াচ্ছেন। ক্যাম্পাসে ফেরার পথে রাহুল কফিশপে ঢুকলেন। একজন মা তাঁর বাচ্চার সঙ্গে স্ন্যাক্স খাচ্ছেন। তাঁরা চলে গেলে রাহুল লক্ষ্য করলেন তাঁদের টেবিলে যে পরিমাণ ফেলে যাওয়া খাবার আছে তাতে ওই মা-বাচ্চার দুদিন ভালোমতো খাওয়া হয়ে যাবে।

প্রায় একই রকমের ঘটনার দুটো রূপ রাহুলকে বিচলিত করল। এযেন সাদা কালো।তিনি চাইলেন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। কিন্তু কী করা। সমাজ বদলের abcd জানতেন না রাহুল। তিনি শিল্পী। জুতসই আইডিয়া মাথায় আসছিল না। সেই বছরেই শুরু করলেন "sustainability and sustainable development" নিয়ে পড়াশুনো। উপায় বেরতে খুব বেশি সময় লাগল না।

২০১১ নাগাদ একটি ডিজাইনিং কনসালটেন্সি ফার্মে কাজ করতে করতেই বানিয়ে ফেললেন নিজের ABCD (A Basic Concept Design)। ৩৪ বছরের রাহুল সেসময় অনেক ওঠানামা দেখেছেন। ABCD-র আসল উদ্দেশ্য ছিল নানান উপায়ে টিকে থাকা। সামাজিক,আর্থিক,সাংস্কৃতিক এবং মানসিকভাবে প্রত্যেকের কাছে এই সংস্থার আলাদা আলাদা মানে ছিল। প্রতি পদক্ষেপে স্থায়ী লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চেয়েছিল রাহুলের ABCD।

রাহুলের মতে, এখন ভারতের বাজার অর্থনীতি শুধু আর্থিক লাভের দিকেই ঝুঁকে নেই, স্থায়ী উদ্ভাবনের দিকে ক্রমশ মন ঘুরছে বাজারের। তাঁর সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। রাহুল এমন ব্র্যান্ড তৈরি করতে চান যা শুধু CSR( corporate social responsibility ) এর মারফৎ দিশা দেখবে না বরং ব্যবসার মূল স্ট্র্যাটেজি হিসেবেও জবরদস্ত প্রমাণিত হবে।

ABCD-র দুটো ভাগ। ডিজাইনিং এবং 'প্রোডাক্ট আন্ডার সেকেন্ড লাইফ'। 'প্রোডাক্ট আন্ডার সেকেন্ড লাইফ' এমন এক উদ্যোগ যা ডিজাইন সার্ভিসের লাভের অর্থে চলে। রাহুল ডিজাইনিং আর প্রোডাক্টের মাধ্যমে সাস্টেনেবিলিটির সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্য নিয়ে 'দ্য সেকেন্ড লাইফ' শুরু করেন। তাঁর আশা ছোটমাপের এই প্রচেষ্টা একদিন স্বচ্ছ এবং স্বনির্ভরভাবে দীর্ঘমেয়াদি বড় ব্যবসার চেহারা নেবে। রাহুলের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দেন বেঙ্গালুরুর আবর্জনা সংগ্রহকারীরা। তাঁরা জানেন ওঁর কি লাগবে। এর মধ্যে আছে ফেলে দেওয়া ফিল্ম পোস্টার, সাদা কাগজ, জঞ্জাল এসব।

রাহুল ওয়েস্ট ভেন্ডরের সঙ্গে দেখা করেন। অনেক সময় ওঁদের কাছে রিসাইক্লিং এ পাঠানোর বর্জ্য থাকে। রাহুল সেসব সংগ্রহ করেন। যেমন, মালয়শিয়া থেকে একরকম ডকুমেন্ট বক্স আসে যা মাত্র একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। তাঁরা ওগুলো চিহ্নিত করে রিসাইক্লিং থেকে বাঁচান। তবে রাহুল বলছেন এমন বর্জ্য সীমিত। রাহুল আরও বলছেন এসব কাজে মানুষের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর নতুন কিছু শেখার মানসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করে। এই সিস্টেমের সঙ্গে জড়িত অনেক ঘটনা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সামাজিক প্রতিকূলতা আর আর্থিক বাধা এই সবকিছুকে অতিক্রম করে মানবিক গুণই সব সিস্টেমকে গতিশীল রাখে। সমাজ প্রগতির মুখ দেখে।

বৈদেশিক বাজারের দিকে লক্ষ্য রেখে সেকেন্ড লাইফে নিত্য নতুন সামগ্রী দিয়ে প্রোডাক্ট বানানো হচ্ছে। আপসাইকেলড দ্রব্য দিয়েও হাতে তৈরি নানান প্রোডাক্ট আনছেন রাহুলরা। বাড়ছে কর্মসংস্থান। বিনিয়োগ খোঁজা চলছে। জোর কদমে চলছে ফান্ড সংগ্রহও। তাঁর সংস্থা এখনও পর্যন্ত প্রায় এক কোটি টাকা আয় করেছে।

রাহুলের মতোই কিছু সংস্থা যেমন, Arora Fibres, Green Power, Liquid Gold, Cleaning E-Wasteland, এমন অনেকেই রিসাইকেলড প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে উদ্যোগ দেখাচ্ছে। সরকার থেকেও সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ দেখা গেছে। Recycle Trade India-র একটি সমীক্ষা বলছে গুজরাটের ১০% এর বেশি প্লাস্টিক প্রোডাক্ট রিসাইকেল করা হয়। দেশে বার্ষিক ৪.৪ বিলিয়ন পাউন্ড প্লাস্টিক রিসাইকেলড হয়। তবে দেশের মূল বাজারে এখনও রিসাইকেলড প্রোডাক্ট এসে পৌঁছায়নি। তবে বাজার তৈরি হচ্ছে ABCD-র আপসাইকেলড প্রোডাক্টের জন্য। কিছু নামজাদা গ্লোবাল খেলোয়াড় আছে যেমন, Hipcycle, TerraCycle এবং Playback Clothing। ভারতে 'Haathi Chaap' দ্রব্য বেশ পরিচিত। আর রাহুল এঁদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।

Related Stories