ডিজাইনে বিদেশ জয় গৃহবধূ শ্বেতার

আর পাঁচটা গৃহবধূর মতই তাঁর জীবনটা ছিল। লেখাপড়াতেও খুব একটা ভালো ছিলেন না। কিন্তু একটা রাতের ঝড়ে যেন সব কিছু বদলে গেল শ্বেতা সোনির।

0

চ্যালেঞ্জ এমন ভাবে তাঁর জীবনে এসেছিল, যাঁর জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিলেন না শ্বেতা। স্বামীর হার্ট অ্যাটাকের পর জীবনটাই যেন বদলে গিয়েছে তাঁর।নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে আজ একজন সফল ব্যবসায়ী সে। ২০১৩ সালে শ্বেতা তৈরি করেছিলেন 'আম্বের জয়পুর'। বাচ্চাদের জামাকাপড়ের ডিজাইনে ভীষণ ভাবে একঘেয়েমি লক্ষ্য করেছিলেন শ্বেতা। সেই শূন্যস্থানটিই পূরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির আশ্চর্য মেলবন্ধন তিনি ঘটিয়েছেন তাঁর ডিজাইনে।


প্রথমে এক বন্ধুর কাছ থেকে সেলাই মেশিন কিনে নিজেই কাজ করতেন শ্বেতা। আর আজ দেড় বছর বাদে তাঁর আটজন কর্মী রয়েছে, সঙ্গে আটটি সেলাইয়ের মেশিন। পরবর্তী দুবছরে এই সংখ্যাটাই ৫০-এ নিয়ে যেতে চান তিনি। প্রথম কাজ শ্বেতা পেয়েছিলেন ফেসবুকের দৌলতে। ফেসবুকের ছোট একটি গ্রুপ তাঁকে প্রথম অর্ডার দেন। তার দুমাসের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া থেকে শ্বেতার কাজের প্রশংসা করে কাজের অর্ডার আসে। সেই প্রথম আন্তর্জাতিক স্তরের কাজ পেয়েছিলেন শ্বেতা।

উত্তরপ্রদেশের ছোট্ট একটা শহরে বড় হয়ে ওঠা। নিজের মধ্যে নতুন কিছু করার ইচ্ছে বরাবরই ছিল । ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা আইএএস হয়তো হতে চাইতো সে। কিন্তু দ্বাদশ শ্রেণীর পর হঠাৎ করে রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করে তাঁর। নিজের মনের জোরও ভেঙে যেতে থাকে। অবশেষে জয়পুর থেকে ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে শ্বেতা। তারপর আর পাঁচটা মেয়ের মত বিয়েও হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। দুটি সন্তানও হয় । তার সাথে সাথে সংসারের মধ্যে ঢুকে যাবতীয় স্বপ্নও ধামাচাপা পড়ে যায়।


কিন্তু সেদিন রাতটা যেন এখনও ত্রাস শ্বেতার কাছে।এ যেন সিনেমার ক্লাইম্যাক্স ।যেদিন রাতে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক হয় শ্বেতার স্বামীর। তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি গাড়ি চালাতে পারতেন না। শ্বেতা জানতেন অল্প-স্বল্প। কোনও রকমে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান স্বামীকে।পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন শ্বেতার স্বামী। কিন্তু ওই পাঁচ-ছ'দিনের মধ্যে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, তা নেওয়া হয়ে গিয়েছিল শ্বেতার। বুঝতে পারেন, যে ভাবেই হোক, তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। নিজের ওপর যে বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল, সেই বিশ্বাস তাঁকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। তাঁর স্বামীও তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। নিজে নিজেই আবার ডিজাইনের কাজ শুরু করেন শ্বেতা। নিজের তৈরি ডিজাইন দেখে সেই আত্মবিশ্বাস যেন ফিরে আসতে থাকে তাঁর।


সমস্ত মহিলাদের উদ্দেশ্যে শ্বেতার পরামর্শ প্রত্যেকের একবার করে অন্তত চেষ্টা করা উচিত। চেষ্টা না করলে মহিলারা জানতে পারবেন কী করে, কী শক্তি আছে তাঁদের মধ্যে? নিজের গাফিলতির কথা নিজেই স্বীকার করেন শ্বেতা। নিজের ট্যালেন্টকে বুঝতে না পেরে দীর্ঘ সময় তিনি অপচয় করেছেন। তাঁর মতে, পিতা বা স্বামীর নামের চেয়ে নিজের নামে পরিচিতি পাওয়া একজন মহিলার অত্যন্ত জরুরী। সেই সঙ্গে স্বামী বা বাবা মা পরিবারের অন্য কারোকে সর্মথন ও পাশে থাকাটাও দরকার। আরও অনেক দূর যেতে হবে তাঁকে, এটা জানেন শ্বেতা। কিন্তু কীভাবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু একদিন যে তিনি সাফল্যের চূড়োয় পৌছবেন, সে ব্যাপারে বিশ্বাস তাঁর রয়েছে। নিজের সন্তানদের তাঁর সৃষ্টি ডিজাইন পড়তে দেখলে খুব ভালো লাগে তাঁর। শ্বেতা চান, তাঁর তৈরি ডিজাইন সাড়া পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক। তাঁর ব্র্যান্ড যেন গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পায় একদিন।


লেখক-তনভি দূবে

অনুলেখক-চন্দ্রশেখর চ্যাটার্জী