চেতনের চৈতন্য, জেলের ডায়েরি যেন 'হট কেক'

0

যেন বলিউডি সিনেমার আদর্শ প্লট। কেলগ স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট থেকে এমবিএ। সাফল্য তাঁর পদচুম্বন করে। ভীষণ স্মার্ট এবং ব্যক্তিপূর্ণ চেহারা। আমেরিকা ফেরত। মোটা বেতন। বিশাল বাড়ি। সুন্দরী স্ত্রী। দুটি মিষ্টি বাচ্চা। পোষা কুকুর। দুটো গাড়ি। এ পর্যন্ত তো সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু ইন্টারভালের আগে হঠাৎ চমক। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৪, ৪০৬, ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন কর্পোরেট বস চেতন মহাজন।

তবে কথায় আছে না যার শেষ ভালো তার সব ভালো। হ্যাপি এন্ডিং। বর্তমানে চেতন এইচসিএল লারনিং-এর সিইও।

২০১২ সালে মধ্য প্রাচ্যের জেমস গ্রুপের তরফে ‘এভেরন’-এর বিভাগীয় প্রধান হওয়ার জন্য চেতনকে নির্বাচিত করা হয়। ঝাড়খণ্ডের বোকারোতে ‘এভেরন’ হল আইআইটির প্রবেশ পরীক্ষার কোচিং-এর একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। চেতনের এভেরন-এ যোগ দেওয়ার তিন মাস পর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। ওখানকার কয়েকজন শিক্ষক পরীক্ষা সংক্রান্ত বেশ কিছু অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন। যার ফলে ছাত্র এবং অভিভাবকদের মধ্যে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। টাকা ফেরত চেয়ে অশান্তি হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে থাকে। পুলিশ উপস্থিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নেয়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়। দায়ের হয় এফআইআর। ২৪ ডিসেম্বর আর পাঁচটা কয়েদির মতই বোকারো জেলে স্থান পান চেতন মহাজন।

ভেবেছিলেন তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবেন, কিন্তু ভাগ্য তাকে অন্য দিকেই নিয়ে গিয়েছিল। ছাড়া পাননি। কারণ লম্বা ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল ইতিমধ্য়েই। সেই সময় জেলে বসে এক মাসের দীর্ঘ দিনপঞ্জি লিপিবদ্ধ করে ফেললেন চেতন। 

সাগ্রহে সেটি ছাপল ‘পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া’ প্রকাশনা সংস্থা। নাম ‘দ্য ব্যাড বয়েজ অফ বোকারো জেল’। প্রকাশিত হতেই যেন হট কেক।


সেই একমাসের স্মৃতি ছিল একটু অন্যরকম। চেতনের প্রতিবেশিরা কেউ ছিল খুনি, কেউ জালিয়াত, কেউ বা ধর্ষক। কিন্তু এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে জীবনের মূল উপজীব্য বিষয়টি নিয়েই চেতন মুখোমুখি হলেন আমাদের।

জেলের অভিজ্ঞতার পর ফের কর্পোরেট দুনিয়া। নিজেকে কতখানি আলাদা লাগে?

দুটো জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা। একদিকে আমি মানুষকে সার্বিকভাবে বিচার করেই কাজে নেওয়ার চেষ্টা করি। নির্দিষ্ট একটা দিক দেখে তাঁকে বাতিল করা মানে তাঁর কর্মদক্ষতার ওপর অবিচার করা। কিন্তু আরেকদিকে আমাকে যথেষ্ট কঠোর হাতেই কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কাউকে অত্যন্ত নির্দয় ভাবেই বলতে হয়েছে চাকরি ছেড়ে দিতে। কিন্তু একটা কথা, পৃথিবীতে চাকরি চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে খারাপ দিন নয়, এর চেয়েও খারাপ দিনের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা উচিত।

কেলগে স্কুল থেকে পাননি কিন্তু যা আপনি জেল থেকে পেয়েছেন এমন তিনটি শিক্ষা

  1. যদি কেউ তোমার ল্যাপটপ এবং মোবাইল চুরি করে নিয়ে তোমাকে জেলে পুরে দেয়, তাহলে তুমি যখন জেল থেকে বেরবে, তাহলে তোমার মানসিকতা যেন ভালোর দিকেই থাকে। যেমন-বই প্রকাশ করা!
  2. দুর্নীতির সঙ্গে লড়তে হলে ভারতীয় আইন যথাযথভাবে মেনে চলা।
  3. কোম্পানির কর্মকর্তাদের বোর্ডে না থাকলে তার আইনি কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার থাকে না। এই কথাটাই ঝাড়খণ্ড পুলিসকে বোঝানো এবং সংবাদমাধ্যমের চাপে কোনও নির্দোষ লোককে গ্রেফতার করা যায় না।

রোজকার জীবনে জেলের অভিজ্ঞতা কিভাবে কাজে লাগান?

এখন আমি সাধারণের মানসিকতা অনেক ভালভাবে বুঝতে পারি। সেই মতো বাজার দর বুঝে সিদ্ধান্ত নিই। এখন আমি আরও ভালো লিখতে পারি।

জেলের বন্দি, এই তকমাটা মুছতে কেরিয়ারে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল?

আসলে এইচসিএল আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। সেই অবস্থাতেই আমাকে অফার দেয়। কিন্তু একটাই শর্ত ছিল, সমস্ত রকম আইনি জটিলতা থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই কোনও কোম্পানিই আইনি ফাঁসে আটকে থাকা কাউকে চাকরি দিতে চাইবে না। ২০১৩-তে সব সমস্যা মিটে গেলে আমি এভেরন ছেড়ে এইচসিএল-এ যোগ দিই।

আমি জেলে যাওয়ার পর থেকে দেখতাম অনেকেই আমার দিকে কিভাবে যেন তাকাতো। কেউ বা বিরক্তি নিয়ে সোজাসুজি চোখে চোখ রেখে, কেউ বা আবার আড়চোখে। সকলে মনে করত, জেলে যখন এক মাস কাটিয়ে এসেছি, তার মানে নিশ্চয়ই কিছু করেছি।

জেলের অভিজ্ঞতা কী ভাবে নিজের জীবনটাকে বদলে দিয়েছে?

জীবনে অনেক কিছুর মূল্য আজ আমার কাছে অনেক বেশি। যেমন জেল থেকে ফেরার পর আমার বাচ্চারা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরল, সেই অনুভুতি কোনও মূল্য দিয়ে বিচার হয় না। কিংবা যখন কোনও রেস্তোরাঁয় ভাল-মন্দ খেলাম, তখন বুঝলাম খাওয়ার মর্ম কী। বিশেষ করে নিজের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দই আলাদা।

আরও একটা ব্যাপার বুঝেছি। ১০ বছর পর কী হবে চিন্তা না করে একটা মানুষের বর্তমান নিয়েই বেশি চিন্তা করা উচিত। কারণ ১০ বছর পর কী হবে কেউ জানে না। বর্তমানকেই আমি তাই বেশি গুরুত্ব দিই।

আপনার বই থেকে একজন পাঠক কী শিখবে?

দেখুন এটা একটা দিনলিপি। গল্পের মতো কোনও প্লট যেমন নেই, তেমনি কোনও ভুমিকা কিংবা উপসংহার নেই। তাই কাউকে আমার কোনও মতামত দেওয়ার নেই। তবে এই জেলের কদিন আমাকে মানবিকতা শিখিয়েছে। সব মানুষের সবটুকু কখনোই খারাপ নয়। ভাল-মন্দ সবার মধ্যে আছে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আলাদা আলাদা অনুভুতি আছে। আর প্রতেকেই তো একটা না একটা সময় জেলেই থাকে। মানুষ যখন শুধুমাত্র নিজের চিন্তা ভাবনাকে নিজস্ব একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলে, তখন সে তার চারপাশে পাঁচিল তুলে দেয়। আমরা যদি জীবন সম্পর্কে একটু অন্য রকম ভাবে ভাবি, তাহলেই নিজেদের এই স্বরচিত জেল থেকে মুক্ত হতে পারব।