সেবার স্বপ্নে বিভোর নাইটিঙ্গেল ডলি মান্না

1

ছোট বেলায় বাবা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বিবেকান্দর কথাগুলি, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’। তখন থেকে ‘সেবাই ব্রত’, আত্মস্থ করে নেন ছোট্ট ডলি। বড় হয়ে নার্সিংকেই পেশা করেন। শুধু পেশা নয়, নার্সিং ডলির ধ্যানজ্ঞান। স্বীকৃতিও মিলেছে। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নিয়ে এলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল অ্যাওয়ার্ড, ২০১৭।

সারা দেশে ৩৫ জন নার্সকে দেওয়া হল ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, প্রাপকদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
সারা দেশে ৩৫ জন নার্সকে দেওয়া হল ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, প্রাপকদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

মেয়েটা নার্সিং পড়তে যাবে কোনও দিনই চাননি মা। বাবা, হাইস্কুলের ক্যামেস্ট্রির শিক্ষক। মেয়ের ইচ্ছের কথা জেনে আপত্তি দূরে থাক বরং উৎসাহ যোগাতেন। বিএসসি পড়ার সময় আর আটকে রাখা গেল না। নার্সিং পড়ার সুযোগ পেয়ে যান পিজিতে। ট্রেনিং শেষে পাঁশকুড়ার অজ গ্রামের মেয়ে ডলি মান্নার পোস্টিং হয় কোচবিহারে। বছর ২২-২৩ বয়স তখন। অসুস্থতার কারণে মা ভর্তি হাসপাতালে। তবু যেতে হয়েছিল ডলিকে। কয়েক বছর পর সেখান থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ট্রান্সফার। যেখানেই যান, ডলি কিন্তু কর্তব্যে অবিচল। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে নিজের জাত চিনিয়ে দেন। রোগীর সেবা থেকে নানা ধরনের ক্যাম্প প্রোগ্রাম, বিশেষ করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রচার, প্রসূতিদের সচেতন করার মতো নানা কাজের দায়িত্ব বর্তায়। আর কাজ পেলে তো কথাই নেই। নাওয়া নেই খাওয়া নেই, পাঁশকুড়ার মেয়েটি কাজ শেষ করে তবে ক্ষান্ত হন। রাতে ফিরতে দেরি হয়, মা চিন্তা করেন,বকুনি দেন। কিন্তু ডলির কাছে কাজই শেষ কথা।

২০১০ এর জুলাই থেকে তমলুকের মাতঙ্গিনী ব্লকের সিনিয়ার পাবলিক হেলথের নার্সিং পদে আছেন। গত সাত বছরে টিকাকরণ, গ্রামে ঘুরে ঘুরে টিকাকরণের তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলি নথিবদ্ধকরণের কাজটাই মূলত করে আসছিলেন ডলি। এইসব কাজের পাশাপাশি নতুন কর্মী এবং সহকর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দেন। হু-র প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি হাসপাতাল পর্যবেক্ষণে এলে ডলির কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান তাঁরা। খুব প্রশংসিত হয়। ‘প্রশংসা করলে ভালো লাগে। কিন্তু কাজটাই তো আসল। আমার সেবায় যদি কারও জীবন বাঁচে সেটাই পরম পাওয়া’, মাটির মানুষ ডলি বলে যান নির্লিপ্তভাবে।

যদিও সুখবরটা আসার পর আনন্দ চেপে রাখতে পারেনি পাঁশকুড়ার জেদী মেয়েটি। ‘রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের চিঠি হাতে পেয়ে আনন্দে চোখ ভিজে গিয়েছিল। এতবড় পুরস্কারের কথা কোনওদিন ভাবিনি। চিঠিটা যখন হাতে আসে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সহকর্মীরা, সিনিয়ররা সবাই এসে অভিনন্দন জানাতে মালুম হল,দারুণ কিছু একটা করেছি যার স্বীকৃতি পেলাম আমি’, হাসতে হাসতে বলছিলেন ডলি। ১২ মে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ‘রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছতেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। গমগম করে মাইক্রোফোনে নাম অ্যানাউন্স হল, আর আমি দাঁড়িয়ে আমার দেশের রাষ্ট্রপতির সামনে। ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছিল মুহূর্তগুলি। ওই কিছুক্ষণ জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত মনে রাখব’, দিল্লি থেকে ফোনে অনর্গল বলে যাচ্ছিলেন বিজয়িনী।

শংসাপত্র,মেডেল আর ৫০ হাজার টাকা। এই হল ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল পুরস্কার। আর্থিক পুরস্কারটুকু দিয়ে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু করতে চান। ডলি জানেন, এই সামান্য টাকায় খুব বেশি কিছু করা যাবে না। তবু শুরু তো হোক, ঠিক স্বপ্ন নিয়ে পৌঁছে যাবেন একটা জায়গায়। বিশ্বাস করেন অজ গাঁয়ের মেয়েটি।