রাসায়নিক বিষহীন ফসলের ঠিকানা 'বি-ক্রিয়েশন'

0

বছরভর পাড়ার দোকান থেকে চাল,ডাল, সবজি সব কিছুই কিনতে হয় আমাদের।কিন্তু সেই ফসল কোথায় কিভাবে চাষ হয় তা নিয়ে বিশেষ মাথা আমরা কেউই ঘামাই না। দোকানের ব্যাগ থেকে সব কিছুই চটজলদি চালান হয় রান্নাঘরে। আর তৃপ্তি করে সেই খাবার খাওয়ার সময় আমরা ভাবিওনা ওই খাবারের সঙ্গে কোন কোন রাসায়ানিক বিষ বাসা বাঁধছে শরীরে। নষ্ট করে দিচ্ছে অরগান। আমরা খবরের কাগজে পত্র পত্রিকায় অনেক পড়েছি অরগ্যানিক সবজি বা ফসল সম্পর্কে। কিন্তু ক'জন আমরা সেসব ব্যবহার করি বলুন তো। 

মধ্যবিত্ত বাঙালির চৌকাঠ পেরয় না সেই সব স্বাস্থ্যকর ফসল। এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই লড়াই চালাচ্ছেন দক্ষিণেশ্বরের এক যুবক। রামকৃষ্ণ সিনহা। রামকৃষ্ণ ও তার স্ত্রী পুলমার এই কাজ করতে তৈরি করে ফেলেছেন তাঁদের প্রতিষ্ঠান বি-ক্রিয়েশন। জৈব সারে তৈরি ফসল যাতে বাঙালির রান্নাঘরে ঠাঁই পায় তাই গত দুবছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ওরা।

দীর্ঘদিন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন রামকৃষ্ণ। গ্ল্যামার দেখেছেন। খ্যাতির শীর্ষ ছুঁয়েছেন। বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। আবার পেশাগত অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন দীর্ঘদিন। ২০১৩ থেকে অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে রামকৃষ্ণের জীবন। কর্মসূত্রে গত দশ বারো বছরে রাজ্যের হেন জায়গা নেই যেখানে যেতে হয়নি। তাই যখন বছর দুয়েক আগে চাকরি ছেড়ে নিজেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন কিমকর্ত্যব্যমের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিল এই সামাজিক দায়বদ্ধতা। ঠিক করলেন এমন কিছু করবেন যাতে মাটির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। সামান্য পরিকল্পনার পর ২০১৪ সালে স্বামী স্ত্রী তৈরি করলেন নিজেদের প্রতিষ্ঠান বি- ক্রিয়েশন।

রামকৃষ্ণের নিজের কথায়,"প্রতিদিন বাড়িতে যে চাল খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি। তা কোন কৃষক ঘাম রক্ত ঝরিয়ে বানিয়েছেন তা কোনওদিন জানতেও পারি না। বা যে ডাল রান্না হয় তাতে বিষ আছে কিনা ভেবেও দেখি না। তাই ঠিক করলাম কিছু করলে মানুষের কথা ভেবে এটাই করব।" 

কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। যাতে চাষিরা জৈব সারে চাল, ডাল চাষ করতে উৎসাহ পান তাই মাঠে ঘাটে ঘুরতে হয়েছে অনেক। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে দফায় দফায়। সেসব মসৃণ ছিল না। বাধা এসেছে। প্রত্যাখ্যান শুনতে হয়েছে। কিন্তু থেমে যাননি রামকৃষ্ণ। কৃষকদের বুঝিয়েছেন চাষ করলেই হবে না চাষির কাছ থেকে নায্য মূল্যে সেই ফসল কিনেও নেবেন ওঁরা। তারপর তা পৌঁছবে সাধারণ ক্রেতার ঘরে। 

প্রথমে উত্তর ২৪ পরগনা আর কয়েকটি জেলায় চাষির সঙ্গে কথা হয়। বোঝানোর চেষ্টা হয় সমস্যাটা কোথায়। জৈব সারের উপযোগিতা কী। তারপর কো-অপারেটিভের মারফত ডাল ফলাতে উৎসাহ দেন ওঁরা। রামকৃষ্ণ ও পুলমার সংস্থা "বি-ক্রিয়েশন" সেই ফসল সরাসরি কিনে নেয়। ওদের নিজস্ব বুটিকের মাধ্যমে ২০১৪ এর মাঝামাঝি থেকে তা বিক্রিও শুরু করে। এভাবেই ওদের স্বপ্নের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু এটা নিরন্তর কাজ। তাই ওরা জনসচেতনতা তৈরি করার কাজটাও করতে থাকেন। লোকজনকে বোঝান রাসয়ানিক ব্যবহার না করে জৈব সারে তৈরি ফসলের উপযোগিতার কথা। আস্তে আস্তে সচেতনতা বাড়ে। 

আজ দুবছর পর একশরও বেশী পরিবার নিয়মিত ব্যাবহার করছেন "বি-ক্রয়েশন" এর জৈব সারে ফলানো, চাল, ডাল, আটা। বিভিন্ন রকমের চালের পাশাপাশি ৭ রকম ডাল পাবেন ওদের বুটিকে।কোনও ডালই পালিশ করা নয়। ফলে খাদ্যগুণও রয়েছে অনেক বেশী মাত্রায়। আর বাড়তি পাওনা প্রতেকটি চাল ও ডালের প্যাকেটে কোন জেলার কোন চাষী সেই ফসল ফলিয়েছেন তাঁর নাম ও পরিচয়।" 

দুবছর পার করে সিনহা দম্পতির " বি-ক্রিয়েশন" জৈব খাবারের জগতে আজ রীতিমত পরিচিত ব্রান্ড। তবে লড়াই কম করতে হয়নি। নিজের বুটিকে বসে আমাদের শোনাচ্ছিলেন সেই সংগ্রামের কথা। বললেন কিভাবে ব্যাবসা শুরুর মূলধণ জোগাড় করতে গিয়ে বিক্রি করতে হয়েছিল বিয়ের আংটি। কিন্তু সেই কথা বলতে গিয়ে রামকৃষ্ণের গলায় কোন আফসোস নেই, ঝরে পড়ছিল প্রত্যয়ের সুর।

শুরুর দিকে যখন কাউকে রাসয়ানিক মুক্ত ফসলের উপযোগিতা বোঝাতে যেতেন অনেকেই ভুল বুঝতেন। ভাবতেন চাষীদের কোঅপারেটিভের প্রচার করছেন রামকৃষ্ণ। তাই গাঁটছড়া বাঁধলেন জৈব খাবারের প্রচারের উপর কাজ করা একটি এন জি ও " ডি হার্ট ফাউন্ডেশন" এর সঙ্গে। এখন কলকাতার বেশ কিছু আবাসনে ডি হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রচারের দৌলতে নিয়মিত হয়েছে বি-ক্রিয়শনের পণ্য। কাজে লেগেছে এন জি ওর সঙ্গে গাঁটছড়া। এছাড়াও বি-ক্রিয়েশনের একটি মেম্বারশিপ এর ব্যাবস্থাও করেছেন তাঁরা। দুহাজার টাকায় মেম্বারশীপ নিলে তার সঙ্গে ফ্রিতে একহাজার টাকার পণ্য পান তাঁদের মেম্বাররা। এছারাও বিক্রয়েশনের বুটিকে পাওয়া যায় আকর্ষণীয় ছাড়ে পাটের শাড়ি ও বাংলার নানা হস্ত শিল্পসামগ্রী। 

সামনে এগোচ্ছেন রামকৃষ্ণ। শুরুর সংগ্রাম আজ কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু একসময়ের সফল মিডিয়া প্রফেশনাল আজ যখন নিজের বুটিকে চাল ডাল বিক্রি করেন কেমন লাগে? প্রশ্নটা শুনে হেসে ফেললেন রামকৃষ্ণ। বললেন,"দীর্ঘ বারো বছর মিডিয়ার জগতে কাটিয়েছি। আজও প্রফেসনটার ইনসাইড-আউট জানি। তবে কোনও কিছু মিস করি না। নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে যে তৃপ্তি পেয়েছি। তার কোনও তুলনা নেই।" এটা বোধহয় শুধু রামকৃষ্ণ নয় পৃথিবীর সব ব্যবসায়ীরই মনের কথা।