মাস্টারমশাইদের পড়াতে শেখায় ‘গুরুজি’

0

‘গত দুদশক ধরে বিশ্বজুড়ে শিক্ষকতার মান নিয়ে অনেক অনুযোগ হয়েছে’, বলেন শিবানন্দ সালগামে, 'গুরুজি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। ‘তবুও’,তাঁর মতে, ‘আমাদের মনে হয় শিক্ষকদের এর জন্য দোষ দেওয়ার কোনও মানে হয় না। বরং ভাবা যাক কীভাবে তাঁদের আরও সমৃদ্ধ করা যায়’। ‘আনরিজনএবল অ্যাট সি’, এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিবানন্দের দল সারা বিশ্ব ঘুরে ঘুরে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে। ফলে শিক্ষায় আন্তর্জাতিক ধারার একটা পরিষ্কার ছবি তাঁদের পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয়। ‘বিশ্বজুড়ে বিতর্কের মূল নির্যাস হচ্ছে বিষয়বস্তু নয় বরং পড়ানোর পদ্ধতিটাই পালটে দেওয়া হোক’।

স্কুল শিক্ষকদের মান এবং কাজের প্রভাবের উন্নতির জন্য মুশকিল আসান ‘গুরুজি’। যে সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষকদের পড়াতে হবে ‘গুরুজি’ তাকে অনুসরণ করে শিক্ষা পদ্ধতি বাতলে দেয়। ‘এটা এটকা এনরয়েড এবং ট্যাবলেট নির্ভর সমাধান যেখানে শিক্ষক নিজেই বিষয় বেছে নিলে কীভাবে পড়াতে হবে তার একটা প্ল্যান চলে আসে। প্ল্যানের মধ্যে যা যা থাকবে পরিস্থিতি(ছবি, ভিডিও, অডিও) এবং পড়ুয়াদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিজে সেখান থেকে বেছে নিতে পারেন’, ব্যাখ্যা দেন শিবানন্দ। ‘গুরুজি’ মূলত দারিদ্রসীমার নিচে থাকা পড়ুয়াদের স্কুল গুলিকে টার্গেট করেছে। ‘আমরা টেকনোলজিটা এমন জায়গায় লঞ্চ করতে চেয়েছিলাম যেখানে প্রযুক্তি কখনও ব্যবহার হয়নি আগে এবং যেখানে ইংরেজি বলা হয় না। যদি এই জায়গাগুলিতে এই পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারি তবে যে কোনও জায়গায় আরও ভালো ফলের সম্ভাবনা থাকবে’। আরও বেশি দুসাহসিক হয়ে টিম ‘গুরুজি’ ২০১২সালে পাইলট প্রজেক্টটি করে বন্যপ্রাণ সংরক্ষিত এলাকা তামিলনাড়ুর বান্দিপুর, কামাটাকা এবং মধুমালাইয়ের ৫০ টি স্কুলে। ‘যারা অল্প আধটু প্রযুক্তি বুঝতেন তেমন শিক্ষকদের নিয়ে কর্মশালা করি। শুধু তাই নয়, গোটা বিষয়টা কান্নাডা এবং তামিলে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তার জন্য অবশ্য ধন্যবাদ প্রাপ্তি রয়েছে আমাদের সহযোগী এনজিও,স্থানীয় শিক্ষক এবং প্রশাসনের’, বলেন শিবানন্দ। তিনি বলে চলেন, ‘প্রজেক্টটা দারুণভাবে সফল হয়েছিল আমাদেরই দুটি বিষয় ক্লিক করে গিয়েছিল বলে। প্রথমটি হল, আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছিলাম শিক্ষকরা সেটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন এবং দ্বিতীয়ত, তাঁরা খুব দ্রুত নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন’।

পরে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং পন্ডিচেরিতে অনেকগুলি স্কুলের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এক হাজারের বেশি শিক্ষকের সঙ্গে আলাপচারিতা চালিয়ে যায় ‘গুরুজি’। ৬টি ক্ষেত্র বিচার করে বিষয়বস্তু ঠিক করা হয়েছে। সেগুলি হল-কাঠামো ভাবনা, যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণ, সমস্যা মেটানো, যোগাযোগ, পাস্পরিক সহযোগিতা এবং সৃজনশীলতা। শিবানন্দ বলেন, ‘কী পড়তে হবে পাঠ্যবই আপনাকে শিখিয়ে দেবে, কিন্তু কীভাবে পড়তে হবে তা শেখাবে না। এই ৬টি বিষয় মূলত বিষয়বস্তুকে উপস্থাপনের জন্য শিক্ষকের দক্ষতার দিকে নজর দেয়’। এইভাবে ‘গুরুজি’ সরাসরি প্রশ্ন তুলে দেয়, কেন আমাদের শিক্ষকের প্রয়োজন। শিবানন্দ যুক্তি দেন, শিক্ষকরাই মূল। প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বশিক্ষার যে পদ্ধতি ‘গুরুজি’ নিয়ে এসেছে তার জন্য ‘স্কুল ইন দ্য ক্লাউড’-এর মতো প্রজেক্ট ইতিমধ্যে ‘টেড প্রাইজ অ্যাওয়ার্ড-২০১৩’ জিতে নিয়েছে। শিবানন্দ বলেন, ‘শিক্ষক হোন বা যেই হোন ‘গুরুজি’ আসলে শেখার মধ্যে ধন্দকে দূর করে। আমার মনে হয় না ‘স্কুল ইন দ্য ক্লাউড’ সহজে সফল হবে। কারণ সবটাই স্বশিক্ষার ওপর নির্ভরশীল, যার জন্য বাড়তি মেধা প্রয়োজন’। তিনি বলে চলেন, শিক্ষকরা গঠনমূলক বিতর্কে উৎসাহ দিতে ভয় পান, কারণ যেসব প্রশ্ন উঠে আসবে তার উত্তর তাঁদের কাছে নাও থাকতে পারে। ফলে অস্বস্তিতে পড়তে হতে পারে। ‘ক্লাসঘরকে কঠিন করে তুলতে আমরা জোর খাটাই না। কিন্তু ধীরে ধীরে ‘গুরুজি’ সেদিকেই নিয়ে যায়। কারণ একটা পদ্ধতি মেনে চলতেই হয় যার মধ্যে তর্ক-বিতর্কের জায়গা করাই রয়েছে’।

এই পর্যন্ত টিম ‘গুরুজি’র সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল যেসব স্কুলে তারা কাজ করেছে সেখানে উপস্থিতির হার এবং পড়ুয়াদের মনোসংযোগ বাড়াতে পেরেছে। পরের বছরের মধ্যে ‘গুরুজি’র লক্ষ্য এক হাজার স্কুলে পৌঁছে যাওয়া। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ করে আফ্রিকায় ‘গুরুজি’কে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি কারণ, অর্থ যোগানের জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় বিভন্ন সংস্থা বা এনজিওর দানের ওপর। শিবানন্দ জানান, ‘এই বছর আমরা বণিজ্যিকভাবে স্কুলগুলির সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে চাই। তাছাড়া সারা বিশ্বের পাবলিশাররাও আমাদের কাজের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁরা বিশ্বের ভালো ভালো স্কুলগুলিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেখিয়েছেন’।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে ডিভাইসের স্বায়িত্ব এবং নিরাপত্তাজনিত। ‘গুরুজি’ সফটওয়ার ইমপ্লিমেন্টের (ব্যবহার) ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে জরুরি। শিবানন্দ জানান, ‘সফটওয়ার সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি ‘গুরুজি’র দেখার কথা নয়’। তিনি উল্লেখ করেন, কোনও ক্লাসে ট্যাবলেট ভেঙে গেলে সেখান থেকেই টাকা তুলে আরেকটা ট্যাবলেট কেনা যেতে পারে। যদিও ‘গুরুজি’ প্রোগ্রাম চালানোর ডিভাইগুলি যেমন, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট অথবা প্রোজেক্টর ভেঙে গেলেও কিছু কিছু স্কুলের সামর্থ নেই বা রিটেলারের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা নেই।

চ্যালেঞ্জটুকু বাদ দিলে গুরুজির যা প্রভাব স্কুলগুলিতে পড়েছে সেই গল্প বলতে গিয়ে গোটা টিমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গল্প করতে করতে বলছিলেন তাঁরা, আমাদেরই এক টিম মেম্বার একটা স্কুলে গিয়েছিলেন গুরুজি প্রজেক্ট কতটা প্রভাব ফেলল দেখার জন্য। গিয়েই তিনি ঘোষণা করেন, ‘গুরুজি’ প্রোগ্রাম চালানোর জন্য যে ট্যাবলেটটি দেওয়া হয়েছিল সেটি তিনি নিতে এসেছেন। শিক্ষকের কাছ থেক ট্যাবলেটটি নিয়ে হাঁটা লাগান। গোটা ক্লাসের সব পড়ুয়ারা এবার ছুট লাগাল তাঁর পেছন পেছন। একটাই অনুরোধ, ট্যাবলেটটি যেন তিনি রেখে যান’, সবাই একসঙ্গে হেসে ওঠেন। এটাই তো চেয়েছিল গুরুজি। এই ছোটছোট ঘটনাগুলিই ভরসার জায়গা তৈরি করে, পরিষেবার বৈধতা দেয়।