ধানে-চন্দনে জঙ্গলমহলে অন্নলক্ষ্মীর আলপনা

0

জঙ্গলমহলের যা হাল তাতে এ তল্লাটে অনেকেরই দুবেলা অন্ন জোটে না। কিন্তু  এই পরিস্থিতিতেও জঙ্গলমহলেরই চন্দন রায় গোটা গ্রামকে শেখাচ্ছেন শুধু ধান দিয়ে কিভাবে ভাত-কাপড়ের অধিক উপার্জন করা যায়, তার শিল্প।

চাল, ভাত, তুষ আর ধেনো হাড়িয়ার বাইরে ধান যে আরও কিছু দিতে পারে জানতই না বাঁকুড়ায় মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকার সিমলাপাল ব্লকের মানুষ। চন্দনের শিল্প দেখালো গোটা গ্রামকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুুলুক। এখন তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ধানের কারুকাজে মুর্ত হয়ে উঠছে রবীন্দ্র, নজরুল, শেখ মুজিব আরও কত অবয়ব। দুর্গাপুজোয় নিজের জেলা তো বটেই আশেপাশের বেশ কয়েকটি জেলায় এমনকি কলকাতাতেও মণ্ডপ সজানো ডাক পেয়েছেন চন্দন। ধান দিয়ে তৈরি কারুকাজে সেজে উঠেছে মণ্ডপ আর মা লক্ষ্মীর দেখা পেয়ে খুশিতে ডগমগ সিমলাপাল।

কিন্তু শিল্পের এত মাধ্যম থাকতে ধান কেন? শিল্পী বলেন, ‘ছোট বেলা থেকে ধান দিয়ে সাজিয়ে নানা জিনিস তৈরি একরকম অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। ভাবলাম ধানই হোক আমার সৃষ্ট শিল্পের মাধ্যম’। বিশ্বভারতী থেকে ভাষ্কর্যে স্নাতকোত্তর। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে নিজের বাড়িতেই স্টুডিও খুলে ফেলেন। দিন রাত সেখানেই চলে শিল্প সাধনা। মোনালিসা আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট নামে একটা স্কুল করেছেন। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় শখানেক ছাত্রছাত্রীকে নিজের হাতে যত্ন করে কাজ শেখান চন্দন।

চন্দনের এই ধানশিল্পের কদর করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ২১ ফব্রুয়ারি ভাষা দিবসে বাংলাদেশ যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন চন্দনের হাতে ধানের তৈরি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও শেখ মুজিবুর রহমানের ধানের তৈরি মূর্তি। আর সেগুলিই মমতা উপহার হিসেবে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন। এখানেই শেষ নয়। এই বছরই ২৮জুলাই লন্ডন গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেও সঙ্গী হয়েছে চন্দনের হাতে তৈরি রবীন্দ্রনাথের দুটি মূর্তি। চন্দন জানান, ‘সুপার শংকর, পটনাবীর, এন শংকর শ্যামলী সহ ১০ থেকে ১২ ধরনের ধান ব্যবহার করি মূর্তি তৈরিতে’। শুধু ধান নয়, চন্দনের হাতে তৈরি কাঠ এবং ফাইবারের নানা ভাস্কর্য প্রশংসা কুড়িয়েছে শিল্প অনুরাগীদের।

বাঁকুড়ায় জন্ম, বড় হওয়া। আশেপাশের আদিবাসীদের দেখে বেড়ে ওঠা। আদিবাসীদের শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যেন আত্মিক যোগাযোগ জঙ্গলমহলের ভাস্করের। চন্দন বলেন, ‘অনেকেই জানেন না আদিবাসীদের হাতে তৈরি কত অদ্ভুত সুন্দর শিল্প রয়েছে। শুধুমাত্র প্রচারের অভাবে সেসবে নজরই পড়ে না কারও। অথচ এগুলিই আমাদের আসল লোকসংষ্কৃতি। একটু ঘষেমেজে নিলে আর সঠিক দিশা পেলে এই শিল্পগুলিই হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণের কোন্দ্র বিন্দু’। স্থানীয় এই শিল্পগুলিকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার ইচ্ছে রয়েছে বিশ্বভারতীর এই প্রাক্তনীর। সেইসঙ্গে বাঁকুড়ার বিখ্যাত টেরাকোটা শিল্পে আগের সেই কদর হারিয়ে যাচ্ছে। টেরাকোটার পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কাজও করছেন চন্দন। তাঁর ইচ্ছে একটা সংগ্রহশালা তৈরি করে তাতে জঙ্গলমহলের নানা শিল্প ঐতিহ্য এবং তাঁর হাতে গড়া ধান দিয়ে তৈরি শিল্পগুলি সংরক্ষণ করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। চন্দন জানেন ইচ্ছে সঙ্গে রেস্তরও জোর থাকতে হয়। অত বড় অংকের টাকা তাঁর একার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। তবু চেষ্টা করছেন যদি সরকারি কোনও সাহায্য পাওয়া যায়। সাহায্য চাইছেন এনজিওগুলোর কাছ থেকেও।

পুজোর বাকী আর কটা দিন। তাঁর হাতে ধানের তৈরি থিমের মণ্ডপ আর মূর্তি নজর কাড়বে দর্শনার্থীদের। দায়িত্ব প্রচুর। সব যাতে নিখুঁত হয় সেদিকে সচেতন নজর শিল্পীর। পাশে থেকে সাহায্য করছেন স্ত্রী মধুমিতা। আর রয়েছে চন্দনের মোনালিসা আর্টস স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও। স্যারের সঙ্গে প্রায়শই কাজে হাত লাগায় সৌরভ, অমলেন্দু, সুচরিতারা। হাতে কলমে শিখতে শিখতে তারাও একদিন বড় বড় শিল্পী হয়ে উঠবে। তাদের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পের প্রচার হবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। আর সেই স্বপ্ন চোখে নিয়েই অক্লান্ত পরিশ্রম করে ‌যান তাদের প্রিয় চন্দন স্যার।