শেয়ার বাজারকে আকর্ষক করেছে জিরোধা

0

যে দেশের জনসংখ্যা ১২০ কোটি, সে দেশ যেকোনও বাণিজ্যের জন্যই লোভনীয় বাজার। অথচ ভারতের এই ১২০ কোটির মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ সক্রিয়ভাবে শেয়ার কেনাবেচা করেন। শতাংশের হিসেবে যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.১ থেকে ০.২। এই পরিসংখ্যানটাই বদলাতে চায় zerodha, দেশের একমাত্র ডিস্কাউন্ট ব্রোকিং সংস্থা।

জিরোধা-র শুরু ২০১০ সালে, বেঙ্গালুরুতে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও নিতিন কামাথ জানিয়েছেন, শেয়ার ট্রেডার হিসেবে তিনি যে ধরণের শেয়ার ব্রোকারের অভাববোধ করেছেন, সেই ব্রোকার হয়ে ওঠার ভাবনা থেকেই জিরোধা-র জন্ম। জিরোধা দেশের একমাত্র অর্থনৈতিক পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা যারা ‘ফ্ল্যাট ফি মডেল’-এ কাজ করে। ন্যূনতম অর্থের বিনিময়ে পরিষেবা দেয় সংস্থাটি। দেশের প্রতিটি স্টক এক্সচেঞ্জ, কমোডিটি ও কারেন্সি এক্সচেঞ্জে তাদের সদস্যপদ আছে।

শূন্য থেকে শুরু

যতসামান্য মূলধন দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন নিতিন কামাথ। কম খরচে পরিষেবা দিলেও জিরোধা যে মান নিয়ে আপোস করে না, প্রাথমিকভাবে গ্রাহকদের সেটা বোঝানোই চ্যালেঞ্জ ছিল বলে মনে করেন নিতিন। জিরোধা শুরুর আগেই অবশ্য নিতিনের ব্যবসায় হাতেখড়ি। ২০০৬ সালে অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। ভাই, নিখিলকে নিয়ে খোলেন কামাথ অ্যাসোসিয়েট্‌স নামে এক সংস্থা, তখন তাঁর ভাইয়ের বয়স মাত্র ১৭। বর্তমানে জিরোধা-র ব্যবসায়িক কৌশল ঠিক করে দেন নিখিল। জিরোধা-র কোর টিমের আরেক সদস্য বেণু মাধব, সংস্থার চিফ অপারেটিং অফিসার। একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকার সুবাদে দু’জনের পরিচয়। নিতিনের কঠিন সময়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করা শুরু করেছিলেন বেণু। নিতিন তখন রিলায়েন্স মানি-তে সাব ব্রোকার। কর্মচারীদের ঠিক সময়ে মাইনে দিতেই মুশকিলে পড়তেন। তবুও এইচপি সংস্থার মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে নিতিনের সঙ্গে কাজে যোগ দিতে দ্বিধা করেননি বেণু মাধব। কঠিন সময়ের সেই অভিজ্ঞতাই এখন জিরোধার প্রয়োগ করেন দু’জনে। শুধুমাত্র শেয়ার ট্রেডিং শিখতে ২০০৯ সালে জিরোধাতে এসেছিলেন হানন দেলভি। আজ তিনি সংস্থার ক্লায়েন্ট রিলেশন শাখার প্রধান হানন দেলভি সংস্থায় যোগ দেন ২০০৯ সালে। নিতিনের স্ত্রী সীমা পাটিলের দায়িত্ব জিরোধার বিভিন্ন পরিষেবার গুনমান বিচার করা, তিনিও সংস্থার কোর টিমের সদস্য। আর জিরোধার ‌যাবতীয় প্রযুক্তিগত কারিকুরির পিছনে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে বিশেষজ্ঞ কৈলাস নাধ-এর মগজাস্ত্র।

Zerodha - র কোর টিম
Zerodha - র কোর টিম

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ

নিতিন কামাথের দাবি, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ জিরোধাকে আর পাঁচটা অনলাইন স্টক ট্রেডিং সংস্থার থেকে অনেকটাই এগিয়ে রাখে। Pi, Quant, Q এবং Kite এই চারটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে খুব সহজে শেয়ার বাণিজ্য করা যায়।

  • পাই – বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম যুগের থেকে এগিয়ে। বিভিন্ন রেখচিত্র ও বিশ্লেষণের সাহায্যে নিয়ে শেয়ার কেনবেচা করা যায়। মনে হবে ২০১৫ নয়, যেন ২০২০ সালে বসে শেয়ারের বাণিজ্য করছেন।
  • কোয়ান্ট – প্রত্যেক ট্রেডারকে তার পুরনো ট্রেডিং এই খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করে দেখায় Quant। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জনৈক ট্রেডারের অনলাইন ট্রেডিং জার্নাল হিসেবে কাজ করে।
  • কিউ – ব্যক্তিগত সহকারী বলতে পারেন। পোর্টফোলিও, লেজার, ট্রেড রিপোর্ট সবই রাখা থাকবে Q-এর মস্তিষ্কে। মাউসের এক ক্লিকেই পেয়ে যাবে নিজের শেযার বাণিজ্যের বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার।
  • কাইট – ৭০ হাজার স্টক ঘেঁটে Kite আপনাকে যথাযথ শেয়ার কেনাবেচার টিপস দেবে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেটেও চলতে পারে কাইট।

এই স্মার্ট ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তো রয়েইছে।

সাফল্যের গ্রাফ

জিরোধার দাবি, শুরুর পর থেকে আজ অবধি প্রতি বছর তো বটেই প্রতি ত্রৈমাসিকেও সংস্থার বৃদ্ধির হার থেকেছে ১০০%। বর্তমানে সারা দেশে জিরোধার প্রায় ৮০ হাজার ক্লায়েন্ট রয়েছে। গত অর্থবর্ষে ৭০ কোটি টাকা আয় করেছিল সংস্থাটি। নিতিন জানিয়েছেন এই অর্থবর্ষে তাদের লক্ষ ১০০ কোটির মাত্রা ছোঁয়া। বিমা হোক বা মিউচুয়াল ফান্ড, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেল্স টার্গেট পূরণের চক্করে সংস্থার এজেন্টরা গ্রাহকদের অপ্রয়োজনীয় পলিসি বিক্রি করেন। শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে এই অভিযোগ ওঠে। নিতিন জানিয়েছেন তাঁর সংস্থায় কোনও ব্রোকারেজ টার্গেট নেই। ফলে গ্রাহককে ভুল বুঝিয়ে শেয়ার বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না।

বর্তমানে অনলাইনে যে কোনও ব্যবসার অপরিহার্য অঙ্গ অ্যানালিটিক্স। ব্যবসার প্রতিটা পদক্ষেপ, ওঠা-পড়ার বিশ্লেষণের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকে সংস্থার উন্নতি। ট্রেডল্যাব ও নিওেট্রেড নামে দুটি অ্যানালিটিক্স সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছ জিরোধা, সংস্থা দুটিতে তারা মোট ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগও করেছে। আরও ৩টি স্টার্টআপ সংস্থার সঙ্গেও তারা কাজ করছে।

দেশের জনসংখ্যার ৫% মানুষকে শেয়ার কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত করতে চায় জিরোধা, এখন যা ১ শতাংশের গণ্ডিও পেরোয়নি। যে দেশে ৬০% মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই, তাদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের আওতায় আনা যে এক অসম লড়াই। অলীক কল্পনা? হতে পারে। কিন্তু স্বপ্ন না দেখলে যে লড়াইয়ে যেতা যায় না।

(লেখা: সিন্ধু কাশ্যপ ও আদিত্যভূষণ দ্বিবেদী, অনুবাদ: ঋত্বিক দাস)