ভারতের প্রথম 'ক্যারিশমা কোচ' দানিশ শেখ

1

'ক্যারিশমা' শব্দটার আভিধানিক অর্থ জনসাধারণকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা। সেই শক্তি বা ক্ষমতা কেউ-কেউ অর্জন করে থাকেন। সেই অর্থে ভারতের প্রথম 'ক্যারিশমা কোচ' বলা যেতেই পারে দানিশ শেখকে। তাঁর কথা বলার ধরণ, অভিনব সব আইডিয়া আর জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট অভিমুখ বাস্তবিক অসাধারণ। ফলে তাঁর ক্যারিশমা কোচিং স্টার্টআপ যে সাড়া ফেলবে তা বলাই যায়। কিন্তু দানিশকে দেখলে আপনি বুঝতেই পারবেন না। সেও যেন আমাদেরই মতন। "আমি পারলে তুমি কেন পারবে না?" মার্কা কোনও কথা তাঁর মুখে শুনতে পাবেন না। তাঁর সহজ কথা, ক্যারিশমা আসলে একটা বিশেষ দক্ষতা, যা শিখতে হয়।

কনভেন্ট স্কুলের গন্ডীটা কোনক্রমে পেরতে পেরেছিলেন ইন্দোরের দানিশ। অন্তর্মুখী, হাস্যকর সব ব্যাপারস্যাপারের জন্য তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো আশঙ্কিত ছিলেন শিক্ষকরা। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় রেজাল্ট হতাশাজনক। স্কুল বদলাতে বাধ্য হন দানিশ। আর দু'বারের চেষ্টায় কোনওমতে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করেন। এইরপরই ঘুরল জীবনের মোড়। বইকেই একমাত্র বন্ধু করে নিলেন দানিশ। একসময় পড়ে ফেললেন ডেল কার্নেগির লেখা সেই বিখ্যাত বই

‘How to win friends and influence people’. এই বইয়ে যা যা পড়লেন বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ শুরু করে দিলেন ১৬ বছরের দানিশ। প্রতিদিন একজন অপরিচিতর সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। গত ১২ বছর ধরে এভাবেই ৫ হাজার জনেরও বেশি অচেনা-অজানা লোকের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।


সম্প্রতি মুম্বইয়ের জয় হিন্দ কলেজে হিউম্যান নেটওয়ার্ক নিয়ে একটি TEDx talk-এ যোগ দিয়েছিলেন দানিশ। তাঁর রাখা বক্তব্য খুবই উপভোগ করে ছাত্রছাত্রীরা। সেখানেই দানিশ বলেন," বাছবিচার না করে আমি যদি ওইভাবে লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা না করতাম, তাহলে হয়তো একজন সেরা বন্ধুর দেখাই পেতাম না। অজানা মানুষের সঙ্গে মিশতে আমার দারুণ লাগে। আমাদের চারপাশে মানুষ। প্রতিটা মানুষ একেক ধরনের। তাঁদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা আলাদা। আমাদের সেটা গভীরভাবে দেখতে হবে।" এভাবেই মানবচরিত্রের সঙ্গে সড়গড় হয়ে ওঠেন দানিশ। শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, সঙ্গে গোগ্রাসে বই ও সায়েন্টিফিক রিসার্চ পড়া। এভাবেই অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন দানিশ।

দানিশের 'ক্যারিশমাটিক' জীবনের শুরুটা হয় তাঁর ১৮ বছর বয়সে। ইন্দোরে Webdunia.com নামে একটি IT/Media company-তে language editor পদে ইন্টারভিউ দেন দানিশ। তাঁর থেকে বেশি অভিজ্ঞ, ভাষায় দখল রয়েছে এমন প্রতিদ্বন্ধীদের কিন্তু সহজেই পিছনে ফেললেন দানিশ। এভাবেই পরবর্তী সময়ে একটার পরে একটা সাফল্য তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। ২০ বছর বয়সে মাইক্রোসফ্‌টের একটি প্রজেক্টে ১০০ জনের বেশি একটা দলকে নেতৃত্ব দেন দানিশ। ২১ বছর বয়সে Lionbridge Inc. কোম্পানিতে সর্বকনিষ্ঠ Global Project Manager পদে যোগদান। ২২ বছরে তাঁকে ডাক আসে Yahoo! India থেকে। সেখানেও সংস্থার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ International Product Manager (Yahoo! Mail, Yahoo! Messenger)।

দানিশের জীবন কিন্তু বৈপরীত্যে ভরা। Product management-এ তাঁর দখল থাকলেও তিনি বেছে নেন communication and training. কোনও নামি B-school-এর ডিগ্রি তাঁর ছিল না। সেই ঘাটতি মেটাতে কার্যত বইয়ের পোকা হয়ে যান দানিশ। আর এখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেমিনারের ব্যবস্থা করেন তিনি। দুই বছর আগে চালু করেছেন তাঁর স্টার্টআপ পোর্টাল www.danishsheikh.com-যা লোকজনকে 'ক্যারিশমা' অর্জনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

দানিশ বললেন,"ক্যারিশমা বিষয়টা আমাকে সবসময় টানত। ফাঁকা সময়ে এনিয়ে নিয়ে ভাবতাম। এভাবেই স্টেপ বাই স্টেপ একটা শেখানোর পদ্ধতি তৈরি করলাম। যা একজনকে ক্যারিশমাটিক হতে সহায়তা করবে। বিজনেস স্কুলগুলোতে গেস্ট টকে অংশ নিতাম। এই 'ক্যারিশমা কোচিং' খুব শিগগিরই শখ থেকে ধ্যানজ্ঞান হয়ে গেল।"

অন্যকে প্রভাবিত করার এই যে ক্যারিশমা বা ক্ষমতা, দানিশ মনে করেন তা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। তাঁর কথায় Authoritative Charisma, Visionary Charisma ও Empathetic Charisma. সেগুলো কী? ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দানিশ বললেন,"স্টিভ জোবসের কথা ধরুন। তাঁর আছে Visionary Charisma অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনও প্রোডাক্টের সাফল্যকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন ও পরবর্তী সেই সময়কে তিনি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখছেন। মাদার টেরেসার আবার Empathetic Charisma, যাঁরা অসহায় তাঁদেরকে তিনি অনুপ্রাণিত করছেন।" তাঁর কাছে বিষয়টা তাহলে কি এতই সহজ? দানিশ কিন্তু বললেন,"আমি জানি সব প্রশ্নের সবসময় উত্তর দিতে পারব না। তা সত্ত্বেও প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি। ধরাবাঁধা কোনও সিদ্ধান্ত নিই না। মানবচরিত্র বিষয়টা খুবই জটিল আর সেজন্য সেভাবেই এর মুখোমুখি হতে হয়।"

মিস ইন্ডিয়া থেকে সিইও, আইনজীবী, ম্যানেজার, স্টার্টআপ ফাউন্ডার থেকে সফল উদ্যোগপতি -দানিশের ক্লায়েন্টের মধ্যে রয়েছেন বহু নামজাদা ব্যক্তি। তাঁরা কারা? না, সেইসব নাম বলা সম্ভব নয়। বিজনেস এথিকস মেনেই সেটা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। ক্লায়েন্টের নাম-পরিচয় গোপন রাখাটাও যে ক্যারিশমা কোচিংয়ের অঙ্গ। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতেও তাঁর কোচিং শুরু করেছেন দানিশ। পরের বছর কোচিং সেন্টার খুলতে চান ব্রিটেনে। তবে এ সব সত্ত্বেও খুবই বিনয়ী দানিশ। হামবড়া ভাব তাঁর স্বভাবে নেই। "মুম্বইয়ে যখন প্রথম যাই গোরেগাঁওয়ে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকতাম। এখন পালি হিলে থাকলেও আগের জীবনটাকে মাথায় রেখেছি। সেসব থেকে শিক্ষা নিয়েছি। বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের ক্যারিশমা কীভাবে কাজে লাগান যায়, সেটাই ক্লায়েন্টদের শেখানোর চেষ্টা করি", বললেন দানিশ।

লেখা - মুক্তি মাসি