সদানন্দের দৌলতে ওরা আর ফেলনা নয়

0

যাদের কথা বলছি তাদের কেউ মূক, কেউ বধির, কেউ বা কুষ্ঠ আক্রান্ত, কেউ আদিবাসী শ্রেণি বলে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, কেউ হত দরিদ্র পরিবারের-দুবেলা দুমুঠো তো দূর অস্ত, সপ্তাহে দু একদিন উপোস নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখা ছিল অলীক বিষয়। আর এরাই এখন দেখিয়ে দিচ্ছেন কিভাবে স্বপ্ন দেখেত হয়। স্বপ্ন সফল করতে হয়। সেই সাহসটাই দিয়েছেন সদানন্দ বিশ্বাস।

রুমা, লক্ষ্মীদের বড় আনন্দ। কেউ আপন মনে হাসছে, কেউ নানা ইশারায় অনর্গল বলে চলেছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ওদের কেউ কেউ হয় এই প্রথম মন খুলে হাসল। আর হাসবে নাই বা কেন? শারীরিক প্রতিবন্ধকতায়, অভাবে-অনটনে ধূসর হতে থাকা দিনগুলি আজ যে বাঁধা পড়েছে নতুন রঙিন সুতোয়। যারা ওদের ফেলনা ভেবেছিল তাদের সবার মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছে ওরা। কীভাবে? চলুন শোনা যাক।

দুর্গাপুরের বাসিন্দা সদানন্দ পেশায় কথক শিল্পী। দেশ বিদেশে কথক পরিবেশন করে সদানন্দ এখন সেলেব্রিটি। ঝুলিতে বহু পুরস্কার, স্বীকৃতি। তাঁরই প্রতিষ্ঠান কথক ধরোহরের হাত ধরে বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বিশেষ করে বস্তির মেয়েরা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে। সদানন্দর কাছে কথকের তালিম নিচ্ছে। পরিবারের বোঝা সেই মেয়েদের কথক নাচ দেখতে উপচে পড়ছে অনুরাগীদের ভিড়।

দেশ বিদেশে অনুষ্ঠান করতেই বছরের প্রায় সবকটা দিনই ব্যস্ত থাকেন বেনাচিতির বাসিন্দা সদানন্দ। এর মধ্যেই চলে নতুন প্রতিভার খোঁজ। চলে যান আশেপাশের বস্তিগুলিতে। সেখান থেকে খুঁজে নেন মূক, বধির, বাড়ির বোঝা হয়ে বেড়ে ওঠা মেয়েদের। তাদের মধ্যে প্রতিভার সন্ধান করেন সদানন্দ। কথক নাচের তালিম দেন। গত দু বছরে এভাবে ৯০ জন শিল্পী তৈরি করেছেন, তালিম দিয়েছেন। কথকের মধ্য দিয়ে সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন জীবনের রং হারিয়ে ফেলা ওই মেয়েদের। কয়েকদিন আগে কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন। যারা কর্মশালায় অংশ নিয়েছিল তাদের নিয়ে দুর্গাপুরের সিটিসেন্টারের কাছে সৃজনী প্রেক্ষাগৃহে সদানন্দের প্রতিষ্ঠান কথক ধরোহর নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে। বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া থেকে কর্মশালায় অংশ নেওয়া ৯০ জনের মধ্যে ৪২ জন অনুষ্ঠানে কথক পরিবেশন করে। এদের সবাই মূক ও বধির অথবা কুষ্ঠ আক্রান্ত। সদানন্দ বলেন, ‘তালিম দিতে গিয়ে অনুভব করেছি, বিশেষ করে মূক ও বধির মেয়েরা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়র মাধ্যমে কথকটাকে রপ্ত করছে। ওদের উদ্দ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাই আমি’। ‘সদানন্দবাবুর প্রয়াস প্রশংসারও ঊর্ধ্বে’, বলছিলেন এক মুগ্ধ কথক সমঝদার।

কেন্দুয়া বিকাশ সোসাইটির নাচের শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের সমাজে এমন অনেক প্রতিবন্ধী মেয়ে আছে। সমাজে পিছিয়ে পড়া এই মেয়েদের আমরা প্রশিক্ষণ দিই। হাতের নড়াচড়া, গানের ছন্দ আর সময়জ্ঞান, এই সবকিছু মিলিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের তৈরি করা হয়। স্টেজ পারফরমেন্সে দর্শকরা বুঝতেই পারেন না ওরা সবাই মূক ও বধির’। নিজের হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে নিয়ম করে পূর্ণিমা, রীতাদের তালিমের সময়টুকু মিস করেন না সদানন্দ। কষ্ট একটু হয় বটে, তবে ওদের সাফল্য কথক শিল্পীকে যে আনন্দ দেয় তা আর কোথাও খুঁজে পান না। প্রতিবন্ধী, পিছিয়ে পড়া এই মেয়েদের নিয়ে আরও অনেক বড় স্বপ্ন দেখেন বেনাচিতির সদানন্দ।