ICSE পরীক্ষায় 95.8% পেয়ে ক্যান্সারকে হারিয়ে দিল রাঘব

0

কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার সময় কর্কটের জাল অক্টোপাসের মতো বিঁধেছিল। হাসপাতালে সুঁচের যন্ত্রণা, কেমোথেরাপিতে কেটে গিয়েছিল একটা বছর। প্রিয় স্কুলে যাওয়ার তেমন সুযোগ হয়নি। ক্যান্সারকে হারিয়ে জীবনের যুদ্ধে বড় মাইলস্টোন ছুঁলেন রাঘব ছন্দক। কলকাতার হেরিটেজ স্কুলের এই কৃতী পড়ুয়া আইসিএসই–তে ৯৫.৮% নম্বর পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন অসম্ভব বলে কিছু নেই। অসাধ্যসাধনে নিজের নয়, পরিবার, বন্ধু ও স্কুলের সহযোগিতার কথা বলছে রাঘব।

ক্রিকেট, ফুটবল অন্ত প্রাণ। মেসির খেলা থাকলে টিভির সামনে বসতেই হবে। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাচ থাকলেও তাই। এমন খেলাপাগল ছেলে স্কুলেও একাধিকবার সেরা খেলায়াড়ের পুরস্কার পেয়েছে। রাঘবের এই খেলা নিয়ে পাগলামো একসময় দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল মনোজ ছন্দক, সানন্দা ছন্দককে। বছর দুয়েক আগে রাঘবের পিঠের ব্যাথায় তাঁদের মনে হয়েছিল খেলতে গিয়ে বোধহয় ছেলের এই অবস্থা হয়েছে। ডাক্তার দেখিয়েও প্রাথমিকভাবে কাজ না হওয়ায় একগাদা পরীক্ষা। তারপর বায়োপসির রিপোর্ট পেয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল ছন্দক দম্পতির। রিপোর্ট জানায় লিম্ফোবায়োস্টিক লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে রাঘব। গত বছরের এপ্রিলের এই ঘটনার পর প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ছেলেকে ক্যান্সার নিয়ে ভাবতেই দেননি অভিভাবকরা। রাজারহাটের এক বেসরকারি হাসপাতালে শুরু হয় রাঘবের চিকিৎসা। টানা প্রায় দেড় মাস ছয় দফা কেমোথেরাপির পর রাঘব যখন স্কুলে ফিরল, তখন এগিয়ে এসেছিল অনেকগুলো হাত। রাঘবের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা, নোটস। সবরকমভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিল হেরিটেজ স্কুল।

আইসিএসই পরীক্ষার মাস দশেক আগে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল রাঘবের। ওই কঠিন সময়ে খুড়তুতো ভাই তথা সহপাঠী সৌরভ ছন্দক পড়ার চাপটাই নিতে দেয়নি রাঘবকে। পরিবারের উৎসাহ, স্কুল, বন্ধুদের সহযোগিতায় ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একটু একটু জয়ের রাস্তায় ফিরতে থাকে এই কিশোর। আইসিএসই পরীক্ষার ফল জানিয়ে দিল অসম লড়াইটা একপেশেই হয়েছে। ক্যান্সার নয়, জিতছে এক পঞ্চদশীর অদম্যর লড়াই। ৯৫.৮% নম্বর পেয়ে স্কুলের দ্বিতীয় সেরা এবং কলকাতার মুখ রেখেছে রাঘব। যন্ত্রণার দিন ভুলে রাঘব সামনের দিকে এগোতে চায়। তার কথায়, “খেলাধুলো আর পড়াশোনা। এর বাইরে আমার আর কী আছে।” কীভাবে ক্যান্সারকে সপাটে বাউন্ডারিতে ফেললে। কিশোরের উত্তরটা অনেক হারানোর মাঝে প্রাপ্তি খুঁজে দেয়। রাঘবের জবাব, “ক্যান্সার জয় করে যুবরাজ সিং–এর ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন আমায় টেনেছিল। মনে হয়েছিল পারব। তাই যন্ত্রণার দিনগুলো অতীত।”

তিন ভাই–বোনের সংসারে সবার ছোট রাঘব। সবথেকে আদুরে। সল্টলেকের বিডি ব্লকের বাসিন্দা মনোজ ছন্দক চান ছেলে যেভাবে এগোতে চায় সেভাবে চলুক। কথায় কথায় তিনি ফিরে যান ছেলের লড়াইয়ের দিনগুলোতে। মনোজ ছন্দক বলেন, “ক্যান্সারের খবরে আমরা খানিকটা ভেঙে পড়লেও, ওর স্কুলই ইচ্ছেটা বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের বরাভয় নতুন করে আমাদের ভাবতে শেখায়।” মনোজবাবু ব্যিবসা নিয়ে ব‍্যস্ত থাকেন। ছেলের উত্থান–পতনের সাক্ষী মা সুনন্দার যেন ঘোর কাটে না। সুনন্দাদেবীর কথায়, “কষ্ট পেলেও রাঘব কিছু বুঝতে দেয়নি। হাসিমুখ দেখে সব যন্ত্রণাই যেন কেটে গিয়েছে।” ঝড়ের পর তছনছ হয়ে যাওয়া নয়, খাদ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শৃঙ্গজয়ের নেশায় বুঁদ রাঘব। তাঁর চোখে আইআইটিতে। ক্রিকেটার যুবরাজ সিং, অরুণলালরা দেখিয়েছেন। রাঘব শুধু দেখালেন না, প্রায় ৯৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছে থাকলে অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।ছন্দকের জীবন এখন সত‍্যিই ছন্দময়।