গ্রামীণ ভারতকে আলোকিত করে অনার্জি

2

ভারতের প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মানুষের কাছে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। ৬০০ মিলিয়ন মানে ৬০ কোটি। এর অর্থ প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ। এখনও বিদ্যুতায়নের বাইরে। এক্ষেত্রে পূর্ব আর উত্তর পূর্ব ভারতের চিত্রটা সব থেকে ভয়াবহ। প্রান্তিক এলাকার দরিদ্র মানুষের কাছে বিদ্যুৎ এখনও একটি বিলাসিতা মাত্র। সৌর বিদ্যুতের মত অত্যন্ত উপযোগী ও পরিবেশ বান্ধব উপায় থাকলেও তা যথেষ্ট জনপ্রিয় নয় আমাদের দেশে।

সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বদলানোর কাজে ব্রতী অনার্জি। আমাদের দেশে সৌরবিদ্যুতের প্রচলন কম হওয়ার কয়েকটি কারণ নির্দিষ্ট করেছে এই সংস্থা। উপযুক্ত ইকোসিস্টেমের অভাব, অর্থনৈতিক সহয়তার অভাব, পণ্যের খারাপ গুণগত মান ও বিক্রির পর পরিষেবার অভাব। এই ক্ষেত্রগুলি দিয়েই ২০০৯ সালে কাজ শুরু করে অনার্জি, কাজের জায়গা মূলত পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িষা ও উত্তর পূর্ব ভারত।

সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা বিনয় জাজু ও পীযুস জাজু। মুম্বইয়ের এসপি জৈন থেকে ম্যানেজমেন্টে স্নাতক পাস করেছেন বিনয়, কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার জেনারেল ইলেকট্রিক ও বাংলাদেশের গ্রামীণ শক্তির সঙ্গে। পীযুসের পড়াশোনা কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অর্থনীতি নিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে বছরের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক পীযুস দেশের বিভিন্ন শহরে এবং হংকং ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কিং সেকটরে কাজ করেছেন।

২০০৮ সালে পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত বিষয় কাজ করার জন্য একটি অলাভজনক সংস্থা তৈরি করেন পীযুসরা। সেই সূত্রেই বিভিন্ন গ্রামে যেতে হত, বুঝতে হত তৃণমূলস্তরের সমস্যাগুলি। তখনই দেখেন বিদ্যুত না থাকার কারণে কী ভাবে পিছিয়ে থাকতে হয় মানুষকে। তখনই বিনয় ও পীযুস এমন কিছু একটা করার চিন্তা ভাবনা শুরু করেন যাতে গ্রামীণ ভারতের এই ভয়ঙ্কর সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়। এর পরের বছরই শুরু অনার্জি।

নিজের নিজের কাজের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই প্রান্তিক মানুষের জীবনে আলো পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন বিনয় ও পীযুস। প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক অভিনব ব্যবসার মডেল বেছে নিয়েছে অনার্জি। প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সহায়তা ও তৃণমূল স্তরের সংগঠন এই তিনের মেল বন্ধনে তৈরি এই মডেলের মাধ্যমে সহজেই তারা দূরতম গ্রামের অন্ধকারতম জায়গায় পৌঁছিয়ে যেতে পারে, এমনটাই দাবি এই সংস্থার। 

প্রথমেই নির্দিষ্ট করা হয় সেইসব ক্ষেত্রগুলিকে যেখানে সৌরবিদ্যুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বেছে নেওয়া হয় চারটি ক্ষেত্রকে- কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকা সংস্থান। কৃষির জন্য সৌরবিদ্যুতচালিত সেচ পাম্প ও মাইক্রো হিমঘর তৈরি করে অনার্জি, শিক্ষার জন্য গ্রামে আইসিটি সেন্টার তৈরি করে অনার্জি। এখানে কম্প্যুটার শিক্ষা হয়, মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন। গ্রামীণ তরুণ তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয় তৃণমূল স্তরের উদ্যোগপতি। তাঁরাই ঘরে ঘরে অনার্জির পণ্য পৌঁছে দেওয়া, বিক্রি পরবর্তী পরিষেবা দেওয়া ইত্যাদি কাজ করেন। গ্রামেই প্রশিক্ষিত লোক থাকায় কোনো সমস্যা হলে তা সারিয়ে নেওয়া যায় গ্রামেই। স্বাস্থ্যকর খাবার রান্নার জন্য রয়েছে সৌর বিদ্যুত পরিচালিত স্টোভ। এই সম্পূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য গ্রামে গ্রামে তৈরি করা হয়েছে রিনিউয়েবল এনার্জি সেন্টার। এছাড়াও স্বনির্ভর গোষ্ঠী, এনজিও ও এমএফআইদের সঙ্গে কাজ করে অনার্জি, ব্যবস্থা করে মাইক্রো ফিন্যান্স ঋণের। অনার্জির সব কাজই পরিচালিত হয় আরইসি বা শক্তিকেন্দ্রর মাধ্যমে। গ্রামের মানুষের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের বিষয় সচেতনতা গড়ে তুলতেও কাজ করে এই আরইসি।

ভারতে বিদ্যুত সমস্যা দূর করতে এক উল্লেখ যোগ্য কাজ করছে এই সংস্থা। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থানেও রাখছে বিশেষ ভূমিকা। ইতিমধ্যেই হাজারেরও বেশি গ্রামে ৩,৫০,০০০ এরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে অনার্জির পরিষেবা। আগামী বছরের মধ্যে ১ মিলিয়ন জীবনের আলো এনে দেওয়ার লক্ষ্য রেখেছে এই কোম্পানি, তৈরি হবে ৫০ টি রিনিউয়েবল এনার্জি সেন্টার। ২০২২ এর মধ্যে তাঁদের সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার দ্বারা উপকৃত মানুষের সংখ্যাটাকে ১০ মিলিয়নে পৌঁছে দিতে চান পীযুসরা।

Related Stories