পোষ্যরা যখন ‘ডাক্তারবাবু’

0

যৌন পীড়নের শিকার হয়েছিল ১২ বছরের ছোট্ট মেয়েটা। মনের ক্ষত প্রভাব ফেলেছিল তার শরীরে। সবার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিয়েছিল সে। মানুষ দিয়ে যখন কাজ হল না, তখন তার মৌনব্রত ভাঙল একটা সারমেয়। হ্যাঁ, গল্প মনে হলেও সত্যি। বাস্তবে এই পোষ্যই মনোরোগীদের কাছে হয়ে উঠছে ডাক্তারবাবু। ‘অ্যানিমাল অ্যাসিস্টেড থেরাপি’-র মাধ্যমে শিশু, প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিসা চালাচ্ছে ‘অ্যানিমাল এঞ্জেলস ফাউন্ডেশন’।

২০০৫ সালের কথা। ঘরে ঘরে শিশুদের মধ্যে মনোরোগের বাড়বাড়ন্ত দেখে কিছুটা অবাক হচ্ছিলেন দুই মনোবিদ। কাউন্সেলিং করেও আশানুরুপ ফল পাচ্ছিলেন না তাঁরা। শেষে মগজে এক বুদ্ধি খেলে যায় তাঁদের। শিশুদের মন বুঝতে একটা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সারমেয়কে কাজে লাগান তাঁরা। ফলও মেলে হাতেনাতে। দেরি না করে সেই বছরই পোষ্যদের দিয়ে মনোরোগ চিকিৎসার একটি সংস্থা খোলেন রাহিণী ফার্নান্ডেজ ও রাধিকা নায়ার। নাম দেন ‘অ্যানিমাল এঞ্জেলস ফাউন্ডেশন’।


প্রথমে রোহিণীর একটি মাত্র ল্যাব্রেডর দিয়ে শুরু হয়েছিল সংস্থার কাজ। পরে আশানুরুপ সাড়া পাওয়ায় ক্রমশই বাড়াতে হয় সংস্থার পরিধি। বর্তমানে সংস্থার হাতে রয়েছে ২০টি সারমেয়। সংস্থার পুরনো স্মৃেতি হাতড়ে রোহিণী জানালেন, ‘‘ভারতের বুকে পোষ্যের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে আমরাই প্রথম সংস্থা। তবে বাড়িতে কখনও কোনও পোষ্য ছিল না আমার। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পড়ার সময় পোষ্যকে কাজে লাগিয়ে রোগ সারানোর বিষয়টা মাথায় আসে। পরবর্তীকালে রোগীদের সুস্থ করতেও তা ব্যবহার করি।’’ তবে দেখে সাধারণ মনে হলেও কাজটা যে সহজসাধ্য ছিল না, তা নিজের মুখেই স্বীকার করলেন সংস্থার অন্যতম স্থপতি। মূলত পোষ্যের মাধ্যমে চিকিৎসায় পোষ্য নির্বাচনই প্রধান কাজ। কারণ মানসিক ভারসাম্য না থাকায় অনেক সময়ই পোষ্যের ওপর চটে যান রোগীরা। অনেকে আবার চড়চাপড় মেরে দেন। সেক্ষেত্রে পোষ্য পাল্টা হামলা করলে বিপদ বাড়ে তাঁদের। সে কারণে প্রথমেই পোষ্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়। কী থাকে সেই পরীক্ষায়? শারীরিক সক্ষমতা, ধৈর্য্য, রোগীর সঙ্গে মেলামেশার ক্ষমতা যাচাই করেই নিয়োগ করা হয় পোষ্য। নতুবা ‘ডাক্তারবাবু’ হওয়ার শংসাপত্র জোটে না তাদের।


সংস্থার দাবি, মুম্বই ছাড়াও হায়দরাবাদ ও নাসিকে তাদের কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে চারজন প্রশিক্ষিত মনোবিদ ছাড়াও পোষ্যদের একটা গোটা দল রয়েছে। মূলত স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে তাঁদের ডাক পড়ে। বর্তমানে ‘পোষ্যের সাহায্যে চিকিৎসা’-র বিষয়টা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তবে প্রথম দিকে সংস্থার পথটা এতটা মসৃণ ছিল না। রোহিণী জানিয়েছেন, ‘‘বাড়ির শিশুটিকে পোষ্য দিয়ে চিকিৎসায় রাজি হতেন না কেউই। অনেকে আবার পোষ্যের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েই প্রশ্ন করে বসতেন। সেই সময় ‘অ্যানিমাল অ্যাসিস্টেড থেরাপি’ খায় না মাথায় দেয়, তা বোঝার উপায় ছিল না কারও। অনেকেই এর নাম পর্যন্ত শোনেননি। এছাড়াও মুম্বই শহরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পোষ্য পাওয়াও ছিল দুষ্কর। দিন বদলেছে, সে কারণে মুম্বই ছাড়াও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এখন সহজেই পোষ্য নিয়ে যেতে পারে ‘অ্যানিমাল এঞ্জেলস’।’’

ইতিমধ্যেই দেশের বেশ কয়েকটি শহরে ‘পোষ্যের সাহায্যে চিকিৎসা’ নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। মনোবিদদের অনেকেই এই থেরাপিকে মান্যতা দিচ্ছেন। মনোবিজ্ঞান বলছে, পোষ্যের সাহায্যে চিকিৎসায় শিশুদের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্করাও উপকৃত হতে পারেন। কিন্তু ঠিক কীভাবে? মনোবিদরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি শিশু সারমেয়কে কাছে পেলে নিজের বন্ধু করে। সারমেয়র প্রতি বিশ্বাস জন্মানোয় সহজেই একটা প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ফলে খোলামেলা পরিবেশে কোনও ‘অটিজম’-এ আক্রান্ত শিশুর সঙ্গে সহজেই সম্পর্ক গড়তে পারেন মনোবিদ। এছাড়াও সারমেয়কে খাওয়ানো, তাকে আদ‌র করার মধ্যে শিশুমনে একটা সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে সমাজে মেলামেশার ক্ষেত্রে যা খুব কাজে দেয়।

কেবল শিশুমনেই নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মনেও নাড়া দেয় পোষ্যরা। বিশেষ করে বাইপোলার ডিসঅর্ডার, হতাশা বা পারকিনসন্স সারাতে কাজে আসে পোষ্যরা। অনেক সময় দেখা যায়, বউ-ছেলের সঙ্গে বিবাদের পর গুম মেরে বসে যান অভিভাবকরা। পরবর্তীকালে এই নিস্তবদ্ধতা থেকে তাঁদের মনে নিসঙ্গতা বাসা বাঁধে। যা সহজেই দূর করতে পারে বিড়াল, কুকুর বা পাখি। পরীক্ষামূলকভাবে দেখা গিয়েছে, পাখির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফের সবার সঙ্গে অজান্তেই কথা শুরু করেন প্রবীণ নাগরিকরা। বিড়াল, কুকুরের সঙ্গে খেলতে খেলতে তাঁর শারীরিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। হতাশা থেকে আনন্দময় হয়ে ওঠে প্রবীণদের জীবন। এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞান বলছে, শরীরে এন্ডোমরফিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়াতেই খুশির মেজাজ ফিরে পান তাঁরা। ‘অ্যানিমাল এঞ্জেলস’-এর কর্ণধাররা জানিয়েছেন, ২০টি পোষ্য থাকলেও পোষ্যের সাহায্যে মনোচিকিৎসায় তাঁদের প্রধান কাণ্ডারী কিন্তু সারমেয়রাই। আবার রটওয়েলার নামের এক বিশেষ প্রজাতির সারমেয় এই কাজে ইতিমধ্যেই দক্ষ করে তুলেছে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে, সেরেব্রাল পালসিতে আক্রান্ত শিশুর রোগ সারাতে সব থেকে কাজে আসে ঘোড়া। বয়স্কদের ‌মনোরোগ সারাতে বিড়াল যথেষ্ট সাহায্য করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ছটফটে ছেলেমেয়েকে শান্ত করতে কাজে লাগে মাছে। এছাড়াও খরগোস, হরিণ ও পাখি ‘পোষ্যের সাহায্যে চিকিৎসায়’ মানুষের অন্যান্য রোগও সারে।

একদিন একটি মাত্র কুকুর নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠান আজ দেশের অন্যতম বড় শহরে ছড়িয়েছে। রোহিণী ও রাধিকার আশা, আগামী দিনে মনোরোগ চিকিৎসায় আরও গুরুত্ব পাবে পোষ্যরা। কারণ ইতিমধ্যেই তাঁরা উপলব্ধি করেছেন, ‘‘মানুষ যা পারে না, পোষ্যরা তা পারে।’’

Related Stories