ভারতে ব্যবসার এখন, তখন ও আগামী যেরকম

0

অনেকগুলি কারণে ভারত আজ সংবাদের শিরোনামে উঠে আসছে । সবসময়ই বিশ্বের যেকোনো দেশের উৎপাদিত পণ্য বা পরিষেববার একটা বড় বাজার হিসাবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে ভারত। ২০২০ সালের মধ্যে যেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অনুঘটক হয়ে দেখা দেবে এবং বিশ্ববাজারে ভারতের দৃপ্ত আত্মঘোষণাকে সম্ভব করে তুলবে, তা হল ভারতের ক্রমবিকাশমান মধ্যবিত্তশ্রেণি। আইএসবি হায়দ্রাবাদ লিডারশিপ সামিটে ‘দ্যা ইন্ডিয়া স্টোরি’ শীর্ষক অভিভাষণে এমনটাই বললেন পেপসিকো ইন্ডিয়া’র সিইও ডি শিবকুমার। ওঁর মতে, আগামী পাঁচ বছরে, দেশের ক্রমবর্ধমান এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির দৌলতে ভারতের বাজার আরো বাড়বে। ভারতের অবস্থা কিভাবে বদলেছে, এবং বিশ্ববাজারের নিরীখে তার অবস্থানে কিভাবে পরিবর্তন এনেছে, সময়রেখা ধরে ঐতিহাসিক পর্যালোচনার মধ্যে দিয়ে শিবকুমার সেটা উপস্থাপিত করেন।

ডি শিবকুমার, সিইও, পেপসিকো, ইন্ডিয়া
ডি শিবকুমার, সিইও, পেপসিকো, ইন্ডিয়া

শিবকুমারের মতে, কিছু শতক আগে আমাদের দেশের জিডিপি’র পরিমাপ করা হত জনসংখ্যা দিয়ে। কারণ সেসময় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন বা অর্থমূল্যর মত বিষয়ে ভারতের অবস্থা কোনোভাবেই উল্লেখযোগ্য ছিলনা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চীন ও ভারত পরিচিত ছিল দুটি বৃহৎ ‘বাজার’ হিসাবে। ইতিহাসের গতিপথে ৩০০ বছরের আলোচনার প্রেক্ষিতে শিবকুমার দেখালেন যে পৃথিবীর অর্থনৈতিক চালচিত্রে বদল এসেছে ঠিক কিভাবে।

১৭০০ শতক – সবচেয়ে পিছনে থাকা পাঁচটি দেশের পার ক্যাপিটা জিডিপি ছিল ৪২৪। এবং তালিকার শীর্ষে থাকা প্রথম পাঁচটি দেশের জিডিপির গড় ছিল ১৩৩৩।

১৮০০ শতক – সবচেয়ে পিছনের পাঁচটি দেশের জিডিপি কমে দাঁড়াল ৩২৫। অন্যদিকে প্রথম পাঁচটির গড় জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে হল ১৪৭৯। অষ্টাদশ শতক থেকে উনবিংশ শতকের মধ্যে জিডিপি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল চারগুণ।

১৯০০ শতক– সবথেকে পশ্চাৎপদ দেশগুলির গড় পার ক্যপিটা জিডিপি এইসময় চিল ৬৩৯ এবং সবথেকে সমৃদ্ধ দেশগুলির গড় ৪১৪৫। অর্থাৎ পিছিয়ে থাকা দেশগুলির তুলনায় সাতগুণ বেশি।

২০২০ ইয়ার মার্ক – আজকের দিনের মোবাইল টেকনলজির প্রভাবের কথা হিসাবের মধ্যে রেখে বলা যায় যে ২০২০ এর মধ্যে সবচেয়ে পিছনের পাঁচটি দেশের গড় পার ক্যাপিটা জিডিপি দাঁড়াবে ৩৩৮০ এবং প্রথমসারির দেশগুলির ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হবে ৫৪,৪০০। অর্থাৎ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতি তথা বিকাশের ফলে বৃদ্ধির অনুপাত এইসময় দেখা যাচ্ছে প্রায় ৬০ গুণের কাছাকাছি।

শিবকুমারের মতে বিশ্বব্যাপী সম্পদ বন্টনের চালচিত্রে আগামী কয়েকদশকে বেশ কিছু রদবদল আসবে এবং উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাবে ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে।

১৮০০- এইসময় তালিকার শীর্ষে ছিল চীন, যার জিডিপি ছিল বিশ্বের মোট জিডিপির ২৯ শতাংশ। এবং মোট জিডিপির ১৬ শতাংশ নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল ভারত। নবম অবস্থানে থাকা আামেরিকার জিডিপি ছিল মো্ট জিডিপির ১.৮ শতাংশ।

২০২৫- মোট জিডিপির ১৬ শতাংশ থাকবে চীনের, ৫ শতাংশ ভারতের এবং শীর্ষে থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

২০৫০ – মোট জিডিপির ২৭ শতাংশ হবে চীনের। ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ হবে ১৭ শতাংশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২১ শতাংশ। অতয়েব এই তিনটি দেশের সম্মিলিত জিডিপি পরিমাণ হবে পৃথিবীর মোট জিডিপির ৬৫ শতাংশ।

তবে জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশের ভাগীদার হওয়া ছাড়াও আরো অনেকগুলি বিষয় বলার থাকবে ভারতের ক্ষেত্রে।

২০১০ – প্রায় চল্লিশ লক্ষ পরিবারের গড় বার্ষিক উপার্জন ছিল ৩৭,০০০ মার্কিন ডলার এর কাছকাছি।

২০১৫ – উপরোক্ত পরিমাণ উপার্জনক্ষম পরিবারের সংখ্যাটা ৪০ লক্ষ থেকে বেড়ে ৬০ লক্ষ’তে পৌঁছাবে।

২০২০- ১কোটি ১০ লক্ষর বেশি পরিবার বাৎসরিক হারে উক্ত পরিমাণ(বার্ষিক ৩৭০০০ মার্কিন ডলার) অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে।

“অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে এক দশকের মধ্যে এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে। এবং এখান থেকেই বোঝা যায় যে এই পরিবারগুলিকে, এই পরিবারের মানুষগুলিকে আমরা প্রকৃত অর্থেই ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারব। তারা সবথেকে উন্নত ডিজাইন, উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চমানের পরিষেবা পেতে চাইবে। বার্ষিক ৩৭০০০ মার্কিন ডলার আয়ক্ষমতাসম্পন্ন প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ – যা ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যার দ্বিগুণ,” বললেন শিবকুমার।

যদিও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাটা ভারতের কাছে সর্বদাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে থেকেছে। 

২০১০ – দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের সংখ্যা ১২০ মিলিয়ন।

২০১৫ – বর্তমানে এই সংখ্যাটা এসে দাঁড়িয়েছে ১০৫ মিলিয়নে। এবং এখনো দারিদ্র্যসীমায় থাকা মানুষের সংখ্যার বিচারে ভারত সবথেকে এগিয়ে।

২০২০ – উপরোক্ত সংখ্যাটা অনেকটা কমে দাঁড়াবে ৮০ মিলিয়নে।

ভারতের দুর্দান্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি

১০৯ মিলিয়ন পরিবার নিয়ে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই আগামী দিনে জনসংখ্যার সবথেকে বড় অংশ হিসাবে দেখা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আমাদের অন্যভাবে ভাবা শুরু করতে হবে। এবং সেটা কেবলমাত্র পণ্য ও পরিষেবার নিরীখে নয়, বরং বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন ও রুপায়নের ক্ষেত্রেও।

“ দাদ্রিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে উপরের স্তরে নিয়ে আসার নীতি তখন আর প্রাসঙ্গিক থাকবেনা। ভারতের ১০৯ মিলিয়ন পরিবার অন্যরকম নীতি প্রণীত হতে দেখতে চাইবে,” জানালেন শিবকুমার।

ব্যক্তিগত উন্নতির উপায় হিসাবে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সুবিদিত। এবং ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি শিক্ষার বিষয়টিকে সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। অতয়েব এটাকে মাথায় রেখে বলা যায় যে, ২০২০ এর মধ্যে নীতিপ্রণেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং চাকরির প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখে ডিগ্রিভত্তিক শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। “ভর্তুকি তখন আর প্রাসঙ্গিক থাকবেনা,” বললেন শিবকুমার।

দ্বন্দ্ব সমাজ

ভারতের জনসংখ্যার গড় বয়স হল ২৯, যেখানে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে গড় বয়স ৩৭। কিন্তু পাশাপাশি এটা ভুলে গেলেও চলবেনা যে আমাদের দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সের মানুষের সংখ্যা হল ৬৫ মিলিয়ন এবং তাঁদের পরিষেবার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। ফলে জনসংখ্যাগতভাবে ভারত একটি নবীন দেশ হওয়ার পাশাপাশি প্রবীণ দেশও বটে।

“অনেকে বলেন যে বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী ৫০০ জন মানুষের মধ্যে ১০০ জন হলেন ভারতীয়। অতএব এর থেকেই বোঝা যায় ভারত একটি বিত্তশালী দেশ। কিন্তু ৪১ শতাংশ মানুষ দৈনিক এক মার্কিন ডলারেরও কমে জীবন যাপন করেন। এবং প্রায় ৮৩ শতাংশ মানুষ জীবন নির্বাহ করেন দৈনিক ২ মার্কিন ডলারের চেয়েও কম টাকায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্রুত বেড়ে উঠছে যে সব শহর, ভারতের বেশ কিছু শহর তার মধ্যে পড়ে ঠিকই। কিন্তু জীবনযাপনের মানের নিরীখে বিচার করলে ভারতের এই ক্রমবর্ধমান শহরগুলির মধ্যে একটিও সেরা শহরের ক্রমতালিকায় প্রথম তিরিশের মধ্যে স্থান পাবেনা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, ইতিবাচক অনেককিছুর পাশাপাশি নেতিবাচক প্রচুর বিষয়ও রয়েছে আমাদের দেশে।

ইন্টারনেট – বদলের অন্যতম অনুঘটক

ভারত ক্রমশ উন্নতি করছে, নাকি উন্নয়নের লক্ষ্যে এখনো অনেকটাই পথ চলা বাকি – এই দুই এর মধ্যে যেটাই বাস্তব হয়ে থাকনা কেন, শিবকুমারের মতে ২০২০ এর মধ্যে ৬০০ মিলিয়ন মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে যাবে। অতয়েব, ২০২০ এর মধ্যে ভারতীয় উপভোক্তার ধরনে একটা বদল আসবে। আগামী পাঁচ বছরে ভারতীয়রা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেককিছু জানবেন, এবং ইন্টারনেটকে আনন্দের জন্য ব্যবহার করতে ও অনলাইনে কেনাকাটা করতে শিখবে্ন।

শিবকুমার আরো জানালেন যে বর্তমানে ভারতীয় ই-কমার্সের বাজারের মোট অর্থমূল্য ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ২০০২০ এর মধ্যে এই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াবে ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। “FMCG এর বাজারের বর্তমান অর্থমূল্য ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০২০ এর মধ্যে এটা বেড়ে গিয়ে ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে পরিণত হবে।”

“এর অর্থ, পাঁচ বছরের মধ্যে ই-কমার্সের ব্যবসা শতাব্দীপ্রাচীন FMCG এর ব্যবসাকেও ছাপিয়ে যাবে,” বললেন শিবকুমার। মানুষের ব্যাঙ্কিং এর ধরন ও প্রশাসনিক কাজের পদ্ধতিতেও বদল আসবে ইন্টারনেটের দৌলতে।

১০০ স্মার্ট সিটির পরিকল্পনা

বর্তমানে প্রতিবছরে প্রায় একহাজার ‘টাউন’ বা বড় শহর গড়ে উঠছে। এর অর্থ, বদল আসছে গ্রামের চরিত্রে। সেগুলি চলে আসছে ‘টাউন’ বা শহরের আওতায়। বর্তমানে ভারতে ‘টাউন’ এর সংখ্যা প্রায় ৮০০০ এর কাছাকাছি। শিবকুমারের আশা যে, স্মার্ট সিটিগুলি টেকনিক্যাল আন্তপ্র্যানরদের জন্য অনেক নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করবে।

স্টার্টআপ ও আন্তপ্র্যানরশিপের বিকাশ-

আন্তপ্র্যানরশিপ ও স্টার্টআপের ক্রমবিকাশ অবশ্যম্ভাবী। এবং আরো বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়ার সুবাদে আগামীতে আরো বিবিধি সৃজনশীল প্রযুক্তির বিকাশ ঘটবে ও গড়ে উঠবে নানানধরনের স্টার্টআপ। “আন্তপ্র্যানরশিপের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্ব আরোপ করাটা তাই অবাক হবার মত কোনো বিষয় নয়,” বললেন শিবকুমার।

ভারতের স্টক এক্সচেঞ্জের দিকে নজর ফেরালে দেখা যাবে যে এইমুহুর্তে নথিভুক্ত কম্পানির সংখ্যা হল প্রায় ৫৯০০। ওয়ালস্ট্রিটের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা হল ৫৫০০, জানালেন শিবকুমার। কিন্তু ৫৯০০ টি নথিভুক্ত সংস্থার মধ্যে ৬৫ শতাংশের ক্ষেত্রেই মালিকানা হল পরিবারভিত্তিক। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৫০ শতাংশ সংস্থাই পারিবারিক মালিকানাধীন। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে হরেক সম্ভাবনার পরিসর উন্মুক্ত হবে স্টার্টআপগুলির জন্য। গোটা বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক মানচিত্রে কিভাবে বদল এসেছে ও আসবে, শিবকুমার সেটার একটা সংক্ষিপ্ত ছবি তুলে ধরলেন তাঁর বক্তব্যের মধ্যে –

২০০০ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থমূল্যের ব্যবসা চলানো সংস্থার সংখ্যা ছিল ৮১৮ টি। ভারতের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল ১৯ এবং চীনের ক্ষেত্রে ৫১।

২০১০ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা এইসময় প্রায় ১৮৫ এর কাছকাছি, চীনের ক্ষেত্রে ৪৬৫ এবং ভারতের ক্ষেত্রে ১৪১।

আগামীদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থমূল্যের ব্যবসা চালানো সংস্থার সংখ্যা হবে ১৮৪২, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা হবে ১২০৫ ও ভারতের ক্ষেত্রে ৪৫০।

নিজের বক্তব্যের সমাপ্তিতে শিবকুমার বললেন, ভারত যে আগামীতে একট বড় সময় জুড়ে সংবাদের শিরোনামে থাকবে শুধু তাই-ই নয়, বরং বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রেও নেবে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা। এবং আগামী পাঁচ বছরে এটা বিশেষভাবে দেখা যাবে।

(লেখা – সিন্ধু কাশ্যপ, অনুবাদ – সন্মিত চ্যাটার্জী)