আশাবাদের দূত সুন্দর পিচাই যা বললেন

0

খড়গপুর আইআইটির প্রাক্তনী সুন্দর পিচাই দীর্ঘদিন পর ফিরলেন তার পুরনো ডেরায়। খড়গপুর আইআইটির ক্যাম্পাসে ছাত্রদের উজ্জীবিত করলেন গুগলের সিইও। খানিকটা স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লেন। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় যখন বলতে শুরু করলেন তখন উঠে এলো তাঁর শিকড়ের মাটি। বললেন, ভারতের সম্ভাবনার কথা। ভারতীয় হওয়ার গর্ব তার ভাষণে ঠিকরে বেরচ্ছিল। তাঁকে দেখতেই ভিড় জমিয়েছিলেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার আইআইটিয়ান।

একবার চোখ বুলিয়ে নিই পিচাই কী বললেন সেই দিকে।

খড়গপুর আইআইটিতে এতদিন পর এসে ভালো লাগছে। এখানে প্রবেশাধিকার পাওয়াটা সোজা ছিল না। আমাকে লড়তে হয়েছে। ক্লাস বাঙ্কও করেছি প্রচুর। পাশাপাশি খেটেওছি। মেসের ডালটা এখনও ভুলিনি। বুঝতেই পারতাম না ওটা সম্বর ছিল না ডাল। হিন্দিটা তো আমি জানতাম না। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর শিখেছি। 'আবে সালে' এই কথাটা ভাবতাম কাউকে ডাকবার জন্যে ব্যবহার করতে হয়। আমার স্ত্রীর সঙ্গে এখানেই দেখা হয়েছে। এই তো এখানেই। তখন খুব একটা সোজা ছিল না প্রেমটেম, ক্যাম্পাসে দেখা করা কথা বলা বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল। বাড়িতে কম্পিউটার দেখিনি। এখানেই প্রথম কম্পিউটারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। এখন আমাদের শতিনেক স্মার্টফোন আছে। আমার মনে আছে এই ক্যাম্পাস লাইফের নানান টুকিটাকি ঘটনা। যেমন আমি ঘরে তালা দিয়ে বেরতাম আর ফিরে এসে দেখতাম ঘরের ভিতরটা সাজানো গোছানো হয়ে গেছে। কিন্তু দরজায় তালাটা ঝুলছে তো ঝুলছেই। ধাঁধার মত লাগত। কিছু কিছু জিনিস বদলায়নি। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি অনেক কিছুই আবার এ ক'বছরে বদলে গিয়েছে।

আমার মনে হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তোমাদের অভিজ্ঞতা খুব বেশি পার্থক্য হবে না। এখানেই সারাজীবনের বন্ধু হয়। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে।

আমরা সবসময় গুগলে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়েই কাজ করি। আমরা এমন জিনিসই বানাই যা প্রতিদিন কয়েকশ কোটি মানুষ ব্যবহার করেন। আপনি অকৃতকার্য হতেই পারেন। কখনও শখনও। ঠিক আছে। অ্যালফাবেটের সিইও ল্যারি পেজ বলেন কিন্তু বড় কিছু করার দিকে সব সময় আপনার দৃষ্টি থাকা উচিত। যদি আপনি সফল নাও হন তবু, তাকানো উচিত আপনার দূরে স্থির করা লক্ষ্যের দিকে। হেরে গেলেও সেই ধরণের কাজ থেকে আপনি অনেক কিছুই শিখতে পারবেন।

গণনা করার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়েছে। তথ্যকে পর্যালোচনা করার অ্যালগোরিদমও এখন অনেকটাই সহজ সরল হয়েছে। গুগলের ইমেজ রিকগনিশন, ভয়েস রিকগনিশন, ট্র্যান্সলেশন সার্ভিস জীবনই বদলে দিতে সক্ষম। ভারতের ডিজিটাল মার্কেটের পরিধি বাড়ছে। ভারতের কোম্পানিগুলোর এবার আরও বৃহত্তর উদ্ভাবনে মন দেওয়া জরুরি। আমি নিশ্চিত ভারত থেকেই বিশ্বের তাবড় উদ্ভাবন দেখতে পাওয়া যাবে খুব শিগগিরই।

এখানকার বাবা মায়েরা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। উচ্চশিক্ষাই লক্ষ্য। এটাই ভারতের শক্তি। আমি এর সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে সৃজনশীলতায় গুরুত্ব দিতে বলব এবং আরও একটু বেশি ঝুঁকি নিতে বলব।

ছোটোদের ওপর এখন পড়াশুনোর দারুণ চাপ। শুনলাম ক্লাস এইট থেকেই নাকি আইআইটিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেয় বাচ্চারা। শুনে চমকে গেছি। আইআইটিই শেষ কথা নয়। হতে পারে না। অনেক ভালো ইউনিভার্সিটি আছে। অনেক রকম পড়াশুনো করার সুযোগ আছে। কেউ যদি আইআইটি তে আসার সুযোগ না পায় তাহলে তো সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় না।

দুর্দান্ত সব লোকজন আছেন ভারতে। দুর্দান্ত সব আইডিয়াও আছে। যারা সত্যিকারের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। কিন্তু হয়ত আইআইটির রাস্তা মাড়াননি। ভারতে এরকম অনেক প্রতিভা আছে। আর বাজারে হাজার একটা উপায়ও আছে, ভারতের মাটিতে দুর্দান্ত কিছু করারও।

নেতা হিসেবে শুধুমাত্র নিজের সাফল্যের দিকে তাকালে চলবে না অপরের সাফল্যকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বহু মানুষ আছেন যারা প্রতিদিন লড়ে যাচ্ছেন নিত্য নতুন সমস্যা নিয়ে নেতা হিসেবে আমাদের উচিত তাদের লড়াইকে সফল করতে সহযোগিতা করা। নেতার আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল তার দলের কথা ভাবা। দলের কর্মীদের কথা ভাবা। আমি সব থেকে বেশি উত্তেজিত এটা ভেবে যে জীবনে প্রায় সব অঙ্গনেই মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে প্রয়োগ করতে পারছি।

বাজারে আরও সস্তায় স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে আছে গুগল। তিরিশ ডলার মানে হাজার দুয়েক টাকার মধ্যে যদি স্মার্টফোন পাওয়া যায়। তাহলে ইন্টারনেট আরও সহজলভ্য হয়ে যাবে। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়াতে তৎপর গুগল। ভারতের ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রোগ্রামকে সমর্থন করছে গুগল। গুগল চাইছে টাকা লেনদেনের ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল কী করে করা যায়। ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ রূপায়ন হলে ভারত বিশ্বের যেকোনও উন্নত দেশের সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে।

আগামী দশ বছর পর আমি ঠিক কী করব আমি জানি না। কিন্তু আমি প্রোডাক্ট তৈরির ব্যাপারে ভীষণই উৎসাহী। সেই সব প্রোডাক্ট যেগুলো মানুষের জীবনকে আরও সরল করতে সক্ষম। আমার মনে আছে জিমেইল যখন লঞ্চ হয়েছিল সেটা ছিল একটা এপ্রিল ফুলের দিন। আমরা যখন জিমেইলে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্যে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলাম তখন লোকজন ভেবেছিল এটা বোধহয় কোনও এপ্রিল ফুল জোক। কিন্তু আজ জিমেইলের থেকে অপরিহার্য জিনিস আপনার জীবনে আর কী আছে।