শান্তিনিকেতনের রিসাইক্লিং শিল্পী জীবনবাবু

0

বীরভূম শান্তিনিকেতনের বনডাঙা এলাকার বাসিন্দা জীবন কুমার মণ্ডল। কাঠের ফেলে দেওয়া ছাঁট, পাথরের টুকরো, বিস্কুটের প্যাকেট, ফলের বীজ ইত্যাদি নানা ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে অপূর্ব সব শিল্পকর্ম তৈরি করেন জীবন বাবু। তৈরি হয় মূর্তি, চাবির রিং, গয়না ইত্যাদি নানা জিনিস।

ছোটবেলা কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। “দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। শিল্প তো ছিল বিলাসিতা। তবে ছবি আঁকতে ভাল লাগত, সেই থেকেই যদি কিছু আয় করা যায়, সংসারে কিছু টাকা দেওয়া যায় এই ভাবনা থেকেই গ্রিটিংস কার্ড বানাতে শুরু করি। রাস্তার ধারে বসে বেচতাম সেই কার্ড। লোকজনের কার্ড পছন্দ হয়, ক্রেতার সংখ্যার বাড়তে থাকে”, বলছিলেন জীবনবাবু।

গ্রিটিংস কার্ডের পাশাপাশিই অন্যান্য নানা হাতের কাজের জিনিস তৈরি করতে শুরু করেন জীবন বাবু। কাঁচা মাল কেনার টাকা তো ছিল না, তাই ফেলে দেওয়ার জিনিস দিয়েই নানা ধরণের জিনিস তৈরি শুরু করি। সেগুলিও বিক্রি হচ্ছিল, রোজই নতুন কিছু বানানোর চেষ্টা করতাম। বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলায় নিজের তৈরি জিনিস বিক্রি শুরু করি, এছাড়াও রাস্তার ধারে বিক্রি তো ছিলই।

তাঁর তৈরি জিনিস জনপ্রিয়তা পাওয়ায় নিজের একটি ছোট কর্মশালা তৈরি শুরু করেন জীবনবাবু, নাম মণ্ডল হ্যান্ডিক্রাফটস। পরে নাম বদলে মায়ের নাম অনুসারে নাম দেন উমা হ্যান্ডিক্রাফটস। একটু একটু করে ব্যবসা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে তাঁর তৈরি জিনিসের চাহিদা। ইতিমধ্যে মেয়ে বড় হয়েছে, বাবার সঙ্গে হাত লাগিয়েছে কাজে। এখন সেই উমা হ্যান্ডিক্রাফটসের দ্বিতীয় মূল শিল্পী সে। এছাড়াও রয়েছেন আরও দুজন সহকারী শিল্পী ও একজন মার্কেটিং ম্যানেজার। হাতের কাজ শেখানোর জন্য একটি ছোট স্কুলও তৈরি করেছেন জীবন বাবু। আশেপাশের গরীব ঘরের ছেলে মেয়েরা হাতের কাজ শিখতে আসে শেখানে। জীবন বাবুর স্বপ্ন স্কুলটিকে বড় করবেন, যাতে এখানে হাতের কাজ শিখে নিজেদের পরিবারের দারিদ্র্য দূর করতে পারে স্থানীয় শিল্পীরা।

“বর্তমানে আমি মাসে ১০০০০ জিনিসের অর্ডার পাই, কিন্তু লোক বল নেই, নেই কাজ করার জায়গাও তাই মাসে ১০০০ এর বেশি জিনিস তৈরি করতে পারি না। কিছু মূলধন পেলে প্রথমেই একটি কারখানা তৈরি করব, মানে কাজ করার জায়গা। জনা দশেক কর্মী নিয়োগ করব যারা সহকারী শিল্পী হিসেবে কাজ করবেন। তৈরি হবে কর্ম সংস্থান। এছাড়া স্কুলটাকেও বড় করব শেখান থেকেও উঠে আসবে শিল্পীরা, কাজ শিখে সকলেই হয়ে উঠবেন মূল শিল্পী”, বললেন জীবন বাবু।

জীবনবাবুর তৈরি জিনিসের উত্পাদন মূল্য খুবই কম, দাম বাড়ে শিল্পগুণে। সাত টাকা উত্পাদন মূল্যের জিনিস তৈরি হয় কম করে ৫০ টাকায়। ফলে এই শিল্পে কর্মসংস্থান হলে শিল্পীরা কম খরচে বেশি লাভ করতে পারবেন।

সহকারী শিল্পীদের জন্য এক অভিনব আয়ের মডেল তৈরি করেছেন জীবনবাবু। দিনের প্রথমভাগে জীবনবাবুর কর্মশালায় কাজ করেন তাঁরা। প্রাথমিক কাটিং ইত্যাদির কাজ করেন। প্রতিটি জিনিস পিছু পারিশ্রমিক ধার্য রয়েছে। এরপর দিনের দ্বিতীয়ভাগে সেই উত্পন্ন জিনিস নিয়ে বিশ্ববাংলা হাটে বিক্রি করতে যান ওই শিল্পীরা। লাভের একটা বড় অংশ পান তাঁরা।

রিসাইকেল্ড প্রডাক্টের চাহিদা এখন বিশ্বজুড়ে, তাই সঠিক যোগাযোগ ও মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে অনেক দূর যেতে পারে উমা হ্যান্ডিক্রাফটস। জীবনবাবুর স্বপ্নও সেরকমই। বোলপুর শান্তিনিকেতনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে নিজের শিল্পকর্ম পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন গ্রামীণ এই শিল্পী। স্বপ্ন দেখেন গরীব শিল্পীদের কর্ম সংস্থানের।