দু’চাকায় নতুন ভোরের স্বপ্নে বিভোর থমাস হিরকক

0

লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে ও সব শিশুকন্যাকে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’-কর্মসূচি নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। পশ্চিমবঙ্গেও অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার জন্য সাইকেল দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আগ্রহে রাজ্য সরকার। প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ থাকলেও এখনও কয়েকটি রাজ্যে বিস্তর ফাঁকফোঁকর রয়ে গেছে।

এখনও গ্রামীণ ভারতের একটা বড় অংশে বাড়ির থেকে স্কুলের দূরত্বই পড়ুয়াদের মাথাব্যাথা। দীর্ঘ পথের পাশাপাশি রাস্তাও খারাপ এবং বন্যজন্তুদের উপদ্রুব রয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় তাই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের জীবনের প্রথম স্কুলে যেতে বহু পথ হাঁটতে হয়। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কেও কীর্ণাহারের মিরাটি গ্রাম থেকে স্কুলে যেতে হত কয়েক কিলোমিটার হেঁটেই। এখনও অনেক জায়গাতেই পরিস্থিতি যথা পূর্বং তথা পরং। সমাধানের পথটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে তৎপর এক ভিনদেশি। মার্কিন মুলূকের ছেলে। যখন তাঁর গোঁফের রেখাও ঠিকমতো ওঠেনি। তখন থেকেই সমাজের জন্যে ভাবনা এবং গরিব গুর্বো মানুষের জন্যে কিছু করে দেখানোর অদম্য ইচ্ছে। বেছে নিয়েছিলেন ভারতের পিছিয়ে পড়া কিছু জনপদ। এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালার নাম থমাস হিরকক।

বাবার সঙ্গে প্রথমবার ভারতে যখন এসেছিলেন থমাস। তখন ১২ বছর বয়স। নোবেলজয়ী কৈলাস সত্যার্থীর ‘বচপন বাঁচাও আন্দোলন’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন থমাসের বাবা। যিনি উত্তর পূর্ব ভারত এবং বিহার ও ঝাড়খণ্ডে শিশু শ্রম রুখতে ‘বচপন বাঁচাও’-এর সঙ্গে ছিলেন। এই এলাকাগুলোয় সাক্ষরতার হার মাত্র ২০ শতাংশ। এখানকার অধিকাংশ মেয়েরাই মাধ্যমিকের পর আর স্কুলে যায় না।

ঝাড়খণ্ড গভীর বন আর খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি রাজ্য। আর এই গহন অরণ্যের জন্য যাতায়াত করা খুবই সমস্যার। খনি থাকার জন্য ওই এলাকায় শিশুশ্রম ক্রমেই বাড়ছিল। বিশেষ করে অভ্র খনি এলাকাগুলিতে মেয়েদের শিক্ষার হার খুবই শোচনীয় ছিল। স্কুলের সংখ্যাও ছিল হাতেগাওনা। বিদ্যালয়ে যেতে হলে তাই বহু দূরে যেতে হত। এমনকি স্কুলগুলিতে মেয়েদের জন্য কোনও শৌচাগারও ছিল না। এই অবস্থায় মেয়েদের পড়াশোনা করাটা বাড়াবাড়ির মতো ছিল। তাই এই সব এলাকায় মেয়েদের সাক্ষরতার হার ২০ শতাংশের ওপরে আর ওঠেনি। এমন গ্রাম পাওয়া কঠিন ছিল, যেখানে কোনও মেয়ে মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরিয়েছে। শিক্ষার পিছিয়ে যাওয়ার এই ছবির অন্যতম কারণ ছিল স্কুলে যাওয়ার পথ। প্রথমত দীর্ঘ রাস্তা, তার ওপর গোটা পথ ছিল বিপদে ভরা। সাপ, লেপার্ডের মতো ওত হিংস্র প্রাণীরা রাস্তায় ওত পেতে ‌থাকত। পাশাপাশি শিশু পাচারও ছিল সাধারণ ঘটনা। এত বিপদ পেরিয়ে পড়াশোনা করতে হলে মেয়েদের যাতায়ত মিলিয়ে কুড়ি কিলোমিটার হাঁটতে হত।

অভাবের এমন ছবি দেখে শিউরে উঠেছিল মার্কিন স্কুল পড়ুয়া থমাসের মন। ঠিক করে ফেলেন এই শিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু কীভাবে। উত্তরটা কাগজ বা কলম নয়, স্রেফ সাইকেল। হ্যাঁ দু চাকার যান। যাতে চেপে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো সত্যি হবে। সাইকেলে চেপে বিপদের পথ একধাক্কায় উধাও হয়ে যাবে। কমবে যাতায়াতের কষ্ট। সাইকেলের কল্যাণে স্কুল যাওয়ার দূরত্ব কমে যাওয়ায় আর শিশু শ্রমিক হতে চাইবে না কেউ। ডেভিড হিরককের সন্তান মনে করেন এই পথে এগোলে ধীরে ধীরে পাল্টাতে পারে ছবিটা।

ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে কাজ শুরু হয়ে যায় থমাসের। স্ট্যাটফোর্ডের স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে সাইকেল কেনার জন্য ফান্ড জোগাড়ের কাজ শুরু হয়। ৬০০ মার্কিন ডলারে প্রথমে ১০টি বাইসাইকেল কেনা হয়। তখন সময়‌ ২০০৮ সাল। প্রথম বার এই অর্থ উঠে আসায় মনোবল বেড়ে যায় থমাসের। ১০ থেকে সাইকেলের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪০০। এত বড় কর্মকাণ্ডের জন্য একটি অলাভজনক সংস্থাও গড়ে ফেলেন থমাস। নাম দেন বাইক ক্লাব। ২০১১ সালে এই সংগঠনের ভাঁড়ারে ৯০০ মার্কিন ডলারের বেশি চলে আসে। এই সাইকেল ভারতে তৈরি করা হয়, যা গহন বনের কঠিন পথ সহজে পেরিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ দিন যাতে চলতে পারে তার জন্য সাইকেলে সারানোর সরঞ্জামও দেওয়া হয়। প্রতিটি সাইকেলে চারজন শিশুর ভার নিতে পারে।

একটা সাইকেল। এত কাজ। এমন সাইকেলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত ছিল না ঝাড়খণ্ডের মফস্বলের শিশুরা। সাইকেল চড়ার ব্যাপারে থমাসই বাচ্চাদের শেখান। ‘একটি সাইকেল শিশুদের কতটা শক্তিশালী করে দিল। অনেক ক্ষমতাও তারা যেন পেয়ে গেল। এটা একটি সত্যি বিস্ময়কর ঘটনা।’ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বললেন থমাস। পরিবহণের বাইরেও অনেক কিছু এনে দিল এই সাইকেল। শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গেল এই দ্বিচক্রী যান। যার ফলে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার ভবিষ্যতের ছবিটাও বদলাতে থাকবে। সাইকেল এগোনোর মতো ওই এলাকায় বালিকা থেকে কিশোরীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাও অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন তারা সাইকেলে চেপে অন্য গ্রামে পৌঁছে গিয়ে সমবয়সীদের বোঝাচ্ছে পড়াশোনা করা কত জরুরি। তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করছে এই সাইকেল যোদ্ধারা।

Related Stories