বাংলার রাজনীতিতে 'সেন্টু টাচ্‌'

0

একটা ছেলে ফুটবল খেলতে চেয়েছিল। স্বপ্ন দেখেছিল বড় ফুটবলার হবে। কিন্তু হয়ে গেল একজন কার্টুনিস্ট। ঠিক যেন রুমালের বেড়াল হওয়ার গপ্পো। অজিতেশ করের সেন্টু হয়ে ওঠার গল্পটাও তেমনি টান টান আর চমকে ভরা। এই ভোটের বাজারে তো বটেই সারা বছরই টেলিভিশনে বিভিন্ন খবরের চ্যানেলের শেষ পাতে দই মিষ্টি দেন সেন্টুই। টিআরপি হাই। কখনও কূটকচালি, কখনও চিমটি কখনও অন্য কোনও নামে কার্টুন দিয়ে হুল ফুটিয়ে আসছেন তিনি। সেই ২০০৭ সাল থেকে ২০১৬। নয় নয় করে নয় বছরে বাংলায় খবরের চ্যানেলের ইতিহাস ভূগোল অনেক বদলে গিয়েছে। তাবড় সাংসদ-সাংবাদিক-সম্পাদক তলিয়ে গিয়েছেন স্মৃতি বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু রক সলিড হয়ে টিকে রয়েছেন পলিটিক্যাল কার্টুনিস্ট খোদ নারদ মহাশয়। গ্রামে গঞ্জে শহরে মফঃস্বলে তাঁর বানানো কার্টুন দেখার জন্যেই মানুষ টিভির চ্যানেল ঘোরায়। ৫ মিনিটের কার্টুন শেষ হলে টিভি বন্ধ করে দেয়। আর ওই বরাদ্দ পাঁচ মিনিটেই সেন্টু মজার ছলে তৈরি করে দেন দর্শকের মতামত। গঠিত হয় জনমত। ভোটে তার প্রভাব পড়ে।

"Political cartoons are vivid primary sources that offer intriguing and entertaining insights into the public mood, the underlying cultural assumptions of an age, and attitudes toward key events or trends of the times." Jonathan Burack

সাদা মাঠা মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলতেন আর কে লক্ষ্মণ। তাঁর কমন ম্যান যতই কমন হোন না কেন, ভীষণ আনকমন একটা কাজ করে গেছেন লক্ষ্মণ। সুদর্শন মৌমাছির মত নীরবে কলমের মার্জিত আঁচড়ে এঁকে গেছেন একটা নির্দিষ্ট সময়ের ইতিকথা। মানুষের বিরক্তি। মানুষের অভিমান। মানুষের ক্রোধের কারণগুলো। এমন এক সর্বজনীন ভাষায় দলিল হিসেবে রেখে গেছেন যে আজও তা প্রেরণা দেয়। এরকমই প্রেরণা দিয়েছে কলকাতার এক স্বনামধন্য কার্টুনিস্ট কুট্টি। রসিকতার ছলে হুল ফোটানোর কাজটা শিল্পের স্তরে তুলে এনেছিলেন এই কার্টুনিস্ট। বাংলার সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজ সবের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন তিনি। আবার তাঁর কালি-কলমের কষ্ঠি পাথরেই বারবার মাথা কুটেছে বাংলার রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি। 

কুট্টিকে দেখেই বড় হয়েছেন সেন্টু। অজিতেশ কর। মনে মনে ছবি আঁকতেন। কিন্তু মাঠই টানত বেশি। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন জয়নগরের এই ছেলে। বাবা মা লেখাপড়ার জগতের মানুষ। স্কুল শিক্ষক। তাই পড়ায় ইতি টানার উপায় ছিল না। স্কটিশ চার্চ কলেজে এই ইতিহাসের ছাত্রের মন পড়ে থাকত মাঠেই। বিএ পাশ করাটা ছিল মাস্ট।  তাবলে খেলা থেমে থাকেনি।জুনিয়র মোহনবাগান, ফার্স্ট ডিভিশন ক্লাবে খেলছেন। জাতীয় দলে স্থান পাওয়ার জন্য দিনরাত নিরলস অনুশীলন করেছেন। কিন্তু অদৃষ্ট বোধহয় চাইছিল অন্য কিছু। হঠাতই দুর্ঘটনা। এমন চোট পেলেন যে মাঠের মধ্যমণি অজিতেশ এক ঝটকায় চলে গেলেন সাইডলাইনে। জীবনের পুরোটাই জুড়ে ছিল যে ফুটবল, চোখের পলকে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ভালো গোলকিপার হওয়ার লক্ষে কোনওদিন পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু যখন জীবনের মাঠে ফুটবলের ফাইনাল হুইসেল বেজে গেল, তখন মন দিলেন লেখাপড়ায়। পাশাপাশি, অন্য কিছুকে আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। এই সময় তাঁর বেশ কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুর দেখাদেখি ইচ্ছে হল সাংবাদিক হবেন।

পার্ট টু পরীক্ষার আগেই ওভারল্যান্ড পত্রিকায় লেখালিখি শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন সাংবাদিকতা তাঁর Cup of tea নয়। তখন ওভারল্যান্ডে কার্টুনিস্ট ছিলেন চণ্ডী লাহিড়ি। অফিস যাতায়াতের সুবাদে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখা হত। তাঁর আঁকা দেখে মনে হয়েছিল এই পেশাটা ‘এক্সপ্লোর’ করা যেতে পারে। কারণ কুট্টি, লক্ষ্মণরা তাঁকে ইতিমধ্যেই গোপণে ফুসলে নিয়ে গিয়েছিলেন এমন এক রুচিতে যেখানে রাজনৈতিক মত প্রকাশের ভঙ্গিমাটা ছবির ভাষায় ভাবতে শুরু করেছিলেন সেন্টু। বলছিলেন একটাই তার প্লাসপয়েন্ট ছিল সেটা হল রাজ্যের রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা। তবে প্রথা মেনে ছবি আঁকাটা তাঁর কখনওই শেখা হয়নি। অথচ ভালো লাগাটা আছে। এরকম একটা half boiled অবস্থা থেকে সেন্টু শুরু করলেন কাজ। 

ওই বয়সে আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়াটাও সম্ভব ছিল না। তাই কুট্টিকেই আশ্রয় করলেন। ‘দ্রোণাচার্যের শিষ্য একলব্যের মতো আগাগোড়া তাঁকে নকল করে গেছি’, অকপট স্বীকারোক্তি সেন্টুর। দু-একটা কাজ পেতে শুরু করেন। ওভারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি হয় মাসিক সাতশো টাকায়। বেশ চাকা ঘুরতে থাকে।

- পরিবার থেকে আপত্তি আসেনি, মা, বাবা?
প্রশ্ন শুনে মুচকি হাসলেন সেন্টু। বললেন,
-“বাবা মা হয়তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। আমি জীবনে আদৌ দাঁড়াতে পারব এমন আশা ছিল না। তাই মনে হয় তাঁরা আর বাছবিচার আপত্তি করেননি।”
কিন্তু অজিতেশ কর থেকে কীভাবে সেন্টু হয়ে উঠলেন?
-“ওভারল্যান্ডেরই একজন সিনিয়র সাংবাদিকের সৌজন্যে। তিনি বললেন কোনও কার্টুনিস্টের নাম অজিতেশ কর হতে পারে না। তাই আমার ডাকনামকেই সিগনেচার করা হল। আজ অবধি সেটাই রয়ে গিয়েছে।”

তখন টাকা রোজগারের চিন্তা মাথাতেই ছিল না সেন্টুর। শুধু চেয়েছিলাম এমন একটি পেশাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবেন যা ফুটবলার না হতে পারার দুঃখকে ভুলিয়ে দেবে। সেইসময় আজকাল পত্রিকা থেকে একটি গোষ্ঠী বেরিয়ে “সোনার বাংলা” পত্রিকা চালু করে। ওই অফিসে যোগাযোগ করেন সেন্টু। চুক্তি হয় প্রতি কার্টুন ২০০ টাকা। তিনি রাজি হয়ে ‌যান। এখানেই প্রথমবার রাজনৈতিক কার্টুন করার সুযোগ পান। সেইসময় আজকালের কার্টুনিস্ট ছিলেন কুট্টি। সেখানে সাত মাস কাজের অভিজ্ঞতা কেরিয়ারের পথ প্রশস্ত করেছিল ওই উঠতি কার্টুনিস্টের। প্রতিদিন পেজ ওয়ানে আসার সুবাদে সাংবাদিক মহলে পরিচিতি বাড়তে শুরু করে তাঁর।

“একবার ১৯৯৬ সালে খবর পাই, বর্তমান পত্রিকার বরুণ সেনগুপ্ত দেখা করতে চেয়েছেন। তখন তো আনন্দ ধরে না। সংবাদের দুনিয়ার স্টলওয়ার্ট আমাকে ডেকেছেন জানতে পেরে খুব খুশি হয়েছিলাম। নির্ধারিত দিনে বর্তমান অফিসে যাই। কিন্তু দেখা হয়নি বরুণবাবুর সঙ্গে। পরের দিনও দেখা হল না। অবশেষে একদিন ডাক পেলাম। কাচের ঘরে ডেকে বরুণবাবু জানালেন, কার্টুন ছাপা হলে ৫০০ টাকা করে পাব‍”। এরপর দীর্ঘদিন তাঁর একটি কার্টুনও ছাপা হয়নি। তিন মাস পর প্রথম কার্টুন ছাপে বর্তমান। তবে বরুণ সেনগুপ্ত যে তাঁকে মাইলেজ দিয়েছিলেন একথা স্বীকার করেন সেন্টু।

২০০৭ সালে খাস খবরে ৩০ সেকেন্ডের প্রেজেন্টেশন দিয়ে অডিও ভিস্যুয়ালে ভাগ্য পরীক্ষা। খাস কার্টুন বলে একটি অনুষ্ঠান শুরু হয়। ওইবছরই নিজের সংস্থা ট্রেন্ডি টুনস তৈরি করেন। বর্তমানে ফ্রিলান্সার হয়ে গেলেন। একে একে কলকাতা টিভি, নিউজ টাইম, চব্বিশ ঘণ্টার মতো খবরের চ্যানেলের পাশাপাশি বিনোদন ক্ষেত্রে পা রাখলেন সেন্টু। জি হাউজের সঙ্গে একাধিক প্রজেক্টে কাজ করেন। আড়ে বহরে বাড়ল ট্রেন্ডি টুনস। বর্তমানে আর্টিস্ট, গ্রাফিক ডিজাইনার, অ্যানিমেটর মিলিয়ে ৩৩ জন কর্মীর একটা দুর্দান্ত টিম চালান সেন্টু। গানকে ব্যান্টার করে, কবিতাকে প্যারোডি করে তৈরি করেন তাঁর অস্ত্র। আর তাই দিয়ে নিজের সম্পাদকীয় একে রাখেন সাংবাদিক লড়াকু এই কার্টুনিস্ট। আক্রমণ যেমন করেন তেমনি ঠাট্টাও করেন রাজনীতির চরিত্রগুলিকে নিয়ে। নন্দীগ্রাম থেকে নেতাই সিঙ্গুর হয়ে, সারদা সিবিআই এমনকি কামদুনি অনুব্রত কেউ কখনও রেহাই পায়নি সেন্টুর চিমটি থেকে। আর এভাবেই সাধারণ মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন  এই পলিটিক্যাল কার্টুনিস্ট।

সেন্টু শুধু পলিটিক্যাল কার্টুনেই নিজেকে আটকে রাখতে চান না, তাঁর Trendy Toons এখন কফিমাগ, ব্যাগ, টি শার্ট, ল্যাম্পশেডেও কার্টুনের ছোঁয়া আনতে উঠে পড়ে লেগেছেন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে সেই সব ট্রেন্ডি কার্টুন আঁকা সামগ্রী।

Related Stories