অন্ধগলির শিক্ষার আলো অ্যাঞ্জেলিনা,যেন জ্ঞানের পিলসুজ

জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ের কানা গলিতে।ভিখোরির বস্তি পরিবেশে পার্কসাইটের সাধারণ ঘরেই বাবা-মার হাত ধরেই জীবনের মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয়।জীবনের ব্রত সেই শিক্ষা মুল্যবোধ যেন প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রকাশ পায়। আলো-আঁধারির এই জীবনে সঠিক পদক্ষেপের শিক্ষা চালের বেড়ে ওঠা ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে থাকে অ্যাঞ্জেলিনা দিয়া।বস্তির চালে থাকা অতি সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা বাইশ বছরের এক নারীর গল্প।


0

‘আমি বড় হয়ে উঠেছি মুম্বইয়ের ভিখোরিতে বস্তি পরিবেশে। যা পরিচিত পার্কসাইট নামে। খুবই সাধারণ ঘরেই আমার বড় হয় ওঠা। আমার বাবা-মার হাত ধরেই আমার জীবনের মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচয়। আর আমি চাই সেই মুল্যবোধ যেন আমার প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রকাশ পায়। আলো-আঁধারির এই জীবনে সঠিক পদক্ষেপের শিক্ষা আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে থাকি।’ কথাগুলি অ্যাঞ্জেলিনা দিয়াস নামে অতি সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা এক নারীর। মাত্র ২২ বছর বয়সে জীবনের মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে এবং শিক্ষাব্যবস্থার অসামঞ্জস্য দূর করতে এক বিপ্লবে ব্রতী অ্যাঞ্জেলিনা। ২০০৯ সালে দশম শ্রেণিতে পড়াকালীনই অ্যাঞ্জি স্বপ্ন দেখতে থাকেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই ভেদাভেদ দূরীকরণের। আর সেই জন্যই ‘টিচ ফর ইন্ডিয়া’ (টিএফআই)-এর সঙ্গে যোগ দেওয়ার চিন্তা করতে থাকেন। ওই সময় অ্যাঞ্জির দাদা একদিন সংবাদপত্রের একটি বিজ্ঞপ্তি তাঁর হাতে তুলে দেন। যেখানে উল্লেখ রয়েছে ‘টিএফআই’ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমতা আনার প্রচেষটা করছে এবং তার জন্য কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে আবেদন রাখা হয়েছে টিএফআইয়ের সদস্যপদ গ্রহণের। ঠিক এরকমই কিছু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন অ্যাঞ্জেলিনা এবং তা এসেও গেল। কলেজে পড়ার সময় তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে এই ‘ফেলোশিপ’ নিয়েই কথা বলছেন। তখন অ্যাঞ্জি পড়াশুনা করছেন মুম্বই-এর জেভিয়ার্স কলেজে বিএ-এর অন্তিম বর্ষে। টিএফআইও তখন মুম্বইয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজ করার কোথা ভাবছে। আর দেরি করলেন না তিনি। বুঝে গেলেন তাঁর সময় এসে গিয়েছে।

সেদিন ভুল সিদ্ধান্ত নেননি অ্যাঞ্জি। আজ তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে টিএফআই-এর একজন ‘প্রোগ্রাম ম্যানেজার’। ফেলোশিপ শেষ করে দেশের কাজে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে নিয়োগ করে দিয়েছেন তিনি। এত বড় একটা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়া অ্যাঞ্জির সঙ্গেই কথা বলল ‘সোশ্যাল স্টোরি’।

এসএসঃ এই ফেলোশিপ সম্পর্কে কিছু বলুন।

অ্যান্ডিঃ ফেলশিপের সময়টা আমার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে আমরা বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন স্কুলে গিয়েছি। পাঁচ সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ছিল। কিন্তু দু’ সপ্তাহ পরই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা খুবই জটিল। আমি বুঝতে পারলাম ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথাও আমার একটা দুরত্ব থেকে যাচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে আমি ভীষণভাবে ভেঙে পড়তে লাগলাম। একেকদিন এমন হয়েছে আমি স্কুল ছুটি হওয়ার পর কান্নায় ভেঙে পরতাম। বুঝতে পারতাম আমার আগে যে শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকা ছিলেন তাঁদের সঙ্গে বাচ্চারা আমাকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। এরই মধ্যে হাফ ইয়ারলির রেজাল্ট বেরোল। আমি দেখলাম আমার ক্লাসের বাচ্চারা যথেষ্ট খেটেছে। তার মানে আমার তরফ থেকেই গাফিলতি হচ্ছে। আমিই হয়ত একশো শতাংশ দিয়ে উঠতে পারছি না। এরপর থেকে আর অসুবিধা হয়নি। রোজ নিজের ১২০ শতাংশ তাদের জন্য নিংড়ে দিতাম।

এসএসঃ টিএফআই সম্পর্কে অনেকের অনেক রকম ধারণা, আপনি একজন সদস্য হয়ে কিভাবে এদেরকে ব্যাখ্যা করবেন?

অ্যাঞ্জিঃ অনেকেই মনে করেন শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য টিএফআইএর নিজস্ব সমস্যা। যে কোনও একজন মিটিয়ে দিতে পারেন। আবার অনেকে মনে করেন, টাকার জন্য এই সমাজসেবা করছে টিএফআই। যোগ্য লোক এখানে সুযোগ পান না। কিন্তু এর কোনও কথাই ঠিক নয়। একজনের দ্বারা এই সমস্যার সমাধান হতে পারে না। সকলের সহযোগিতা এখানে দরকার। হাতেগোনা কয়েকজন কখনোই এই পরিস্থিতিকে বদলাতে পারবে না। আর টাকা নয়, মানুষের ইচ্ছে এবং উদ্যোগটাই আসল। সেই সঙ্গে দরকার কাজের প্রতি সততা এবং নিজের গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশ।

এসএসঃ ফেলোশিপ শেষ করে বর্তমানে টিএফআইয়ের ‘প্রোগ্রাম ম্যানেজার’। পরিবার এবং বন্ধুদের সমর্থন পেলেন কী করে?

অ্যান্ডিঃ আমার সিদ্ধান্তকে সবসময় সমর্থন করেছেন আমার বাড়ির লোকজন। তাঁদের সমর্থন না থাকলে আমি ফেলোশিপ শেষ করে ‘প্রোগ্রাম ম্যানেজার’ হয়ে উঠতে পারতাম না। আমি বাড়িতে আমার উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু আমার পরিবারও দেখেছেন, কীভাবে আমি এই শিশুদের পড়াশুনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লড়াই করেছি। আজ আমার ক্লাসে ৩৬জন ছাত্র আছে। এরা প্রতেকেই আমি যে ধরনের পরিবেশে বড় হয়েছি, সেই ধরনের পরিবেশে মানুষ। যেখানে শিক্ষার ছোঁয়া প্রায় নেই বললেই চলে। ‘প্রোগ্রাম ম্যানেজার’ হওয়ার অর্থ ১৬জন সদস্য নিয়ে কাজ করা। অর্থাৎ ৬৪০জন বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া। ভাবতে অসম্ভব লাগে, কিন্তু এই কাজের একটা অন্য আনন্দ আছে।


এসএসঃ এর চেয়ে তো অনেক বেশি পারিশ্রমিকের চাকরি করে অনেক জাঁকজমকপূর্ণ আরামের জীবনযাপন করতে পারতেন।

অ্যাঞ্জিঃ জাঁকজমকপূর্ণ আরামের জীবনযাপন করতে পারছি না বলে আমার কোনও দুঃখ নেই। আমি বড় হয়েছি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। বিলাসিতা আমি কখনোই দেখিনি। অত্যন্ত সাধারণভাবে আমি জীবন কাটিয়ে এসেছি। এই জীবনেই আমি সুখী।

এসএসঃ আপনার ছাত্রছাত্রী, তাদের প্রচেষ্টা সম্পর্কে কিছু বলুন। তারা নিজেদের সমস্যা আপনার সঙ্গে ভাগ করে নেন?

অ্যাঞ্জিঃ এই সব বাচ্চারা আমার বন্ধু। যখনই কোনও সমস্যা হয়ে তারা আমার কাছে ছুটে আসে। কারণ তারা জানে আমি তাদের সমস্যা শুনে সেটা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করব। তবে অনেকেই আছে, যারা সমস্যার কোথা জানাতে চায় । এতে তারা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে থাকে। আমি চেষ্টা করি তাদের সঙ্গে কোথা বলে সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলার। তাদের মধ্যেকার আত্মবিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার। আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক কিংবা পারিবারিক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায় বলে আমি বিশ্বাস করি।

অতুল বলে একটি ছেলের গায়ের রং কালো বলে নানাক্ষেত্রে তাকে হেনস্থা হতে হত। এর ফলে সে অত্যন্ত রগচটা ছেলে হয়ে গিয়েছিল। এমনকি অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে মারামারিও লেগে থাকত। বর্ণবৈষম্য নিয়ে আমি অতুলের সঙ্গে অনেক আলোচনা করি। ব্যাপারটা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। এতে লাভও হয়। এখন অতুলকে দেখি অনেক গুরুতর পরিস্থিতিকে হাল্কা করার জন্য জোকস বলছে। এছাড়াও আমির বলে একটি ছেলে আছে। যে একসময় বেশ অপ্রীতিকর ভাষায় কথা বলত। আমার কথাও শুনতে চাইত না। সে মনে করত আমি তাকে বোঝানোর কেউ নই। কিন্তু তাও আমি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করতে লাগলাম। এখন আমিরের মধ্যেও অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে।

এসএসঃ টিএফআই-এর মেয়েদের জন্য বিশেষ কোনও নীতি নিয়েছে কী? একজন মহিলা হয়ে সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

অ্যাঞ্জিঃ টিএফআই-এর নীতিতে লিঙ্গবৈষম্যের কোনও স্থান নেই। আমার ক্লাসে ১৮জন ছেলে এবং ১৮জন মেয়ে পড়ে। আমি নিজে খুব গর্ববোধ করি যখন দেখি আমার শিক্ষা ছেলে এবং মেয়ে উভয় সমানভাবে পাচ্ছে। তবে ফেলোশিপ যাঁরা করছেন, তাঁরা চেষ্টা করেন মেয়েদের বাড়ির লোকদের বোঝাতে--- মেয়েদের বর্তমানে শিক্ষিত করাটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।

এসএসঃ এখনও পর্যন্ত নিজের কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

অ্যাঞ্জিঃ আমি বিশ্বাস করি আমার বাচ্চাদের, বিশ্বাস করি নিজেকে, বিশ্বাস করি একদিন প্রত্যেক শিশু সমান শিক্ষা পাবে। সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দেবে কঠোর পরিশ্রম, নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উৎসর্গ করা এবং ভালবাসায় সমস্ত সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে। বাচ্চাদের পড়াতে গেলে দরকার ধৈর্য। আমি শিখেছি জটিল পরিস্থিতিতেও নিজেকে শান্ত রাখতে। আমার সাফল্য লুকিয়ে আছে আমার বাচ্চাদের সাফল্যের মধ্যে। আমারই এক ছাত্র ইঞ্জামুল যখন স্কলারশিপ পেয়েছে শুনে আমার যে কী আনন্দ হয়, বলে বোঝাতে পারব না। স্নাতক পর্যন্ত তার পড়াশুনার সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছে সরকার।

এসএসঃ আমাদের সরকারি নীতির সমস্যাটা কোথায়?

অ্যাঞ্জিঃ আমাদের দেশে প্রত্যেক বাচ্চার সমান শিক্ষার কথা বলা হলেও, তার জন্য সঠিক নীতির প্রণয়ন হয়নি। যার জন্য নবম শ্রেণিতে পৌঁছে দেখা যায় ছাত্রছাত্রীরা পিছিয়ে রয়েছে আরও ৪-৫ বছর। এর কারণ শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকারা বেশিরভাগ সময় স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে চিন্তিত থাকেন। ফলে একটা বাচ্চারও সঠিক মূল্যায়ন হয় না। এছাড়াও অভিভাবকদের মধেয়েও সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আমার দু’ মাস ফেলোশিপের সময় দেখেছি অভিভাবকদের মধ্যে সঠিক ধারণাই নেই শিক্ষার জন্য টাকা বিনিয়োগ করে লাভটা কী হবে? তারা আশাও করতে পারেন না, তাঁর সন্তান স্নাতক হয়ে পরিবারকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

এসএসঃ ভবিষ্যতে আপনার পরিকল্পনা কী?

অ্যাঞ্জিঃ একবার ভেবেছিলাম নিজের একটা স্কুল করব। কিন্তু আমাদের দেশে স্কুল অনেক আছে। তাই ঠিক করেছি, শিক্ষকতার মানের উন্নয়নের জন্য কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করব। এ ছাড়াও মিডডে মিলটাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করব। আমিশ-নিরামিষ ভাগ করে ‘মিল ভ্যান’ চালু করব। এছাড়াও ক্যাফে করার ইচ্ছে রয়েছে। বাচ্চারা এটা ভালবাসবে।

আমাদের দেশে সামাজিক সমস্যা নিয়ে তো কথা বলেন অনেকেই, কিন্তু ক’জন তার সমাধান খুঁজতে এগিয়ে আসেন, আর কজনই বা এই সমস্যাকে নিজের মনে করে নিয়ে দিনের পর দিন লড়ে যান? মাত্র ২২ বছরে অ্যাঞ্জি তাঁর যে স্বপ্নকে পূরণ করতে নেমেছেন, তাই বা ক’জন পারে?