টুকিটাকি-বাঙালি উদ্যোগপতির ডেটা অ্যানালিটিক স্টার্টআপ

0

কয়েকদিন ধরে ভাবছেন গোয়া যাবেন, তবে সেভাবে পরিকল্পনা করে ওঠা হয়নি। হঠাৎই দেখলেন আপনার ফেসবুকের পাতায় গোয়ার অপূর্ব সুন্দর সব ভিলায় থাকার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিজ্ঞাপন, বা ধরুন এবারের নিউ ইয়ারের পার্টিতে সকলের চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য একটা ড্রেস কেনার কথা ভাবছেন, কিন্তু কিছুতেই দোকানে যাওয়া আর হয়ে উঠছে না, সকালে উঠে ফেসবুক খুলেই দেখলেন নিউজফিডে ঠিক সেরকমই একটি ড্রেসের বিজ্ঞাপন যেমনটা আপনি চেয়েছিলেন।

ফেসবুকের পাতায় এরকম নানা ধরনের পণ্য ও পরিষেবার বিজ্ঞাপন দেখতে অভ্যস্ত আমরা। এবং প্রায়শই তা মিলে যায় আমাদের পছন্দের সঙ্গে, উস্কে দেয় কিছু সুপ্ত ইচ্ছেকে। মনে হয়, আরে ফেসবুক আমার মনের কথা জানল কী করে! অনেক সময় আবার কিছু কেনার পরিকল্পনাই ছিল না, কিন্তু যেহেতু সেটি একদম আপনার মনের মতো তাই প্রয়োজন না হলেও কিনে ফেলেন সেটি।

কম্পিউটার ও স্মার্ট ফোনের দৌলতে ইন্টারনেট আমাদের জীবনে এমনভাবেই জড়িয়ে গেছে যে কখনো সচেতনভাবে তো কখনো বা অবচেতনেই আমরা ঘুরে বেড়াই বিভিন্ন সাইটে, নিজেদের অজান্তেই আমাদের ইচ্ছে, পছন্দগুলি প্রতিফলিত হয় আমাদের অনলাইন কার্যকলাপে। আর সেই কার্যকলাপের ওপর থাকে কড়া নজর। গুণতি হয় প্রতিটি ক্লিক, আর তার ওপর ভিত্তি করেই সংস্থাগুলি তৈরি করে তাদের মার্কেটিং নীতি ও কৌশল। বিষয়টা আমার আপনার কাছে বেশ ভয়ের হলেও কোম্পানিগুলির কাছে কিন্তু তার ক্রেতাদের এই পুঙখানুপুঙ্খ জানাটা স্বপ্ন।

গত কয়েকবছরে সোশ্যাল মিডিয়া এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে মার্কেটিংয়ের জগতে, হয়ে উঠেছে মার্কেটিংয়ের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। কখন কোথায় কোন বিজ্ঞাপনটি দিলে তা সবথেকে বেশি কার্যকরী হবে, পৌঁছবে সঠিক মানুষের কাছে তা নিয়ে রয়েছে জটিল হিসেব, আর সেই হিসেব করার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্টার্টআপ।


এমনই এক স্টার্টআপ, টুকিটাকি। বছর তিনেক আগে টুকিটাকি শুরু করেন অভিষেক চ্যাটার্জি ও জীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্থার সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা অভিষেক পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটেশনাল বায়োলজিতে (অ্যাপ্লায়েড ম্যাথেমেটিকস) এমএস শেষ করেন। এরপর ডবল ক্লিক (গুগল) ও জেপি মর্গ্যান, নিউইয়র্ক এর মতো সংস্থায় চাকরি করেন বছর পাঁচেক। জীতা ইংরেজিতে এমএ, ইন্টিগ্রেটেড মার্কেটিং ও কমিউনিকেশন নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা করেছেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। তিনি সংস্থার সিওও, কোম্পানির অপারেশন, মার্কেটিং ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলির দেখভাল করেন জীতা।


সংস্থার মূল দফতর সিঙ্গাপুরে, ভারতে অফিস রয়েছে বেঙ্গালুরুতে। প্রথমে বিজ্ঞাপন-প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবেই শুরু করেছিল টুকিটাকি। সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঠিক কোথায় কখন বিজ্ঞাপনটি দেওয়া উচিত সেটা বাতলে দেওয়াই ছিল টুকিটাকি টিমের কাজ। সাফল্য আসে দ্রুতই, বড় বড় কোম্পানিদের গ্রাহক হিসেবে পায় টুকিটাকি, সঙ্গে সঙ্গেই বাড়াতে থাকে নিজেদের কাজের পরিসরও। বর্তমানে ডেটা বিশ্লেষণ, ক্রেতা বা গ্রাহক ভবিষ্যত ব্যবহার আন্দাজ করা, মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করে টুকিটাকি।

মার্কেট রিসার্চ, ব্র্যান্ডিং ও ডিজিটাল মিডিয়া ডেলিভারি এই তিনটিই মূলতঃ তাদের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। তাদের প্রতিযোগীরা মার্কেট রিসার্চের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ইনসাইট ডেটার ওপরই নির্ভর করে কিন্তু টুকিটাকি অনলাইন ও অফলাইন এই দু’য়ের ভিত্তিতে ক্রেতাদের প্যাশন পয়েন্ট খুঁজে বের করে, ফলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রচার পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকরী, এমনটাই দাবি সংস্থার।

বাজারে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য গ্রাহকদের প্রকাশভঙ্গি, পছন্দ-অপছন্দ বুঝে নিজেদের ব্র্যান্ডের অভিনবত্ব তুলে ধরা বর্তমানের এই দ্রুততার যুগে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অগঠিত ডেটার সঙ্গে ব্র্যান্ড ডেটাকে মিলিয়ে নির্দিষ্ট ক্রেতা মডেল তৈরি করতে সাহায্য করে টুকিটাকি।

যেমন একটি শ্যাম্পু ব্র্যান্ড বিভিন্ন মিডিয়াতে নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচার চালানোর জন্য ক্রেতাদের পছন্দ অপছন্দ বুঝতে চাইছিল। টুকিটাকি তাদের ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তির দ্বারা টার্গেট অডিয়েন্সকে, বর্তমান ভাললাগা ও ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহারের ভিত্তিতে কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে ফেলে। তারপর এই প্রত্যেকটি অংশের ক্রেতাদের নির্দিষ্ট প্যাশন পয়েন্টের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়। যার মাধ্যমে প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা আলাদা প্রচারের বক্তব্য নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়।

ডেটা থেকে দেখা যায় ভারতে মেট্রো শহরগুলিতে ২৫-৩৪ বছর বয়সী মহিলাদের সরাসরি প্যাশন পয়েন্ট স্যালন ও স্পা ও পরোক্ষ প্যাশন পয়েন্ট ফিটনেস। অন্যদিকে ছোটশহরের মহিলারা চুলের স্টাইলের ক্ষেত্রে সাবলম্বী হওয়া পছন্দ করেন এবং তাদের পরোক্ষ প্যাশন পয়েন্ট বিয়ে ও ফটোগ্রাফি। এর ওপর ভিত্তি করে শ্যাম্পু কোম্পানিটি দুই অংশের জন্য দুটি ভিন্ন বক্তব্য তৈরি করে ও সাফল্য পায়।

মিডিয়া ডেলিভারিতেও একই ভাবে সাহায্য করে টুকিটাকি। ফেসবুকের মার্কেটিং পার্টনার তারা। তাদের গ্রাহক তালিকায় রয়েছে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড, বিবা, যাত্রা.কম, কুইক্যর, পেটিএম ও স্টারের মতো প্রথম সারির সংস্থা।

এবছর গোড়ার দিকে জাঙ্গল ভেঞ্চারের মাধ্যমে রাইট ব্রাইট পার্টনার্স ও ব্লুম ভেঞ্চার্সের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে ১ মিলিয়ন ইউএস ডলার সিড রাউন্ড বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে টুকিটাকি। এর আগে ২০১৩ তে ২,০০,০০০ ইউএস ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছিল কোম্পানিটি।

বর্তমানে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে নিজেদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য কাজ করছে টুকিটাকি। এছাড়াও গবেষণা ও পণ্যের উন্নতির জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে সংগৃহীত বিনিয়োগ।