আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম জুগিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের পাশে কমল কিষাণ’

সনাতন কাল থেকে ভরতীয় অর্থনীতির ধারক ও বাহক হল কৃষি। সাম্প্রতিককালে সরকারের তরফে শিল্পায়নের বাড়তি তৎপরতাই হোক, অথবা নিত্য অবহেলাতেই হোক, কৃষি জমির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শস্য উৎপাদনের হার দ্রুত ও বিপজ্জনক ভাবে কমছে। তার উপর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা, উৎপাদিত শস্য মজুত রাখার সমস্যা, সরকারি উদাসীনতা ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থায় শস্যের পর্যাপ্ত মূল্য না পাওয়া, প্রভৃতি একাধিক কারণে কৃষিক্ষেত্র থেকে সরে আসছেন কৃষকদের একটা বড় অংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হারটা যে রকম ভয়ঙ্কর ভাবে ঊর্ধ্বমুখী, তাতে বিপাকে পড়তে পারেন ভারতের লক্ষ লক্ষ খেতমজুর, যাদের কাছে অন্নসংস্থানের একমাত্র পথ হল একপ্রস্থ উর্বর জমিটুকুই। বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট খামারের চাষিদের সামনেই প্রতিবন্ধকতাটা সব থেকে বেশি। ঠিকঠাক মজুরির অভাবে খেতমজুরের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। উৎপাদন ব্যয়কে ছাপিয়ে লাভের অঙ্ক খুব কম সময়ই আসে। ফলে, ছোট খামারের কৃষকরা ক্রমশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন চাষের আঙিনা থেকে। আর্থ-সামাজিক ভারসাম্যটাও এতে নষ্ট হচ্ছে।

0
‘কমল কিষাণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা দেবী মূর্তী
‘কমল কিষাণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা দেবী মূর্তী

ছোট চাষিদের এই সমস্যা উপলব্ধি করেই এগিয়ে এসেছে দেবী মূর্তী’র স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘কমল কিষাণ’। নেহাত কাকতলীয় ভাবেই কৃষকদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসা দেবী’র। ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী দেবী স্নাতক হওয়ার পর ‘শিট মেটাল ডেভেলপিং ম্যানেজার’ হিসাবে কাজ করতেন। আইআইএস বেঙ্গালুরু থেকে ‘এন্টারপ্রেনারশিপ’-এ মাস্টার্স করার সময় থেকেই সামাজিক ভাবনার বিষয়টি দেবী’র মাথায় ঘুরপাক খায়। তাঁর কথায়, ‘শিট মেটাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমার দক্ষতার ছাপ রেখে একটা ইতিবাচক বদল আনার জন্য নতুন ক্ষেত্রের সন্ধানে ছিলাম। তখন ক্লাসের এক বন্ধুই আমাকে কৃষিজ সরঞ্জামের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন। প্রাথমিকভাবে আমি নিশ্চিত হতে চাইছিলাম যে, সত্যিই কৃষি ক্ষেত্রে পূরণ করার মতো কোনও ফাঁকফোকর আছে কিনা। প্রায় দু’বছর ধরে আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, একাধিক গবেষণাগারে ঘুরে ঘুরে এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্তে আসি যে, ছোট খেতমজুরদের জন্য সত্যিই কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’ দেবী’র হাত ধরে ‘কমল কিষাণ’এর পথ চলা শুরু সেই থেকেই। ২০১২ সালে ‘কমল কিষাণ’ প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে দেবী’র বেশিরভাগ সময়টাই কেটেছে কর্ণাটকের কৃষিজমিতে চাষিদের সঙ্গে। অফিসে সময় কাটাতেন নামমাত্র। দেবী জানান, ‘চাষের জমিতে মেশিন হাতে কোনও মেয়েকে কাজ করার ব্যাপারটা নিয়ে কৃষকদের বরাবরই কৌতুক করতে দেখেছি। তবে এটা তাদেরকে কৌতূহলী করে। সেটাই আমাকে সাহায্য করেছে কৃষকদের কাছ থেকে ইতিবাচক পরামর্শ পেতে, যা আমাকে পরবর্তী কালে কৃষিজ সরঞ্জামের উন্নতিতে প্রভূত সাহায্য করেছে।


ধান বপন যন্ত্র হাতে কৃষক
ধান বপন যন্ত্র হাতে কৃষক

কমল কিষাণ’ শুরু থেকেই নতুন নতুন কৃষিজ যন্ত্রপাতির উদ্ভব ও তার মানোন্নয়নে নজর দিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ছোট খামার মালিকদের পরিশ্রমকে লাঘব করার লক্ষ্যেই কাজ করেছে সংস্থাটি। কেননা, ভারতের প্রায় আশিভাগ কৃষকই ৫ একর বা তার কম জমিতে খামার বানিয়ে চাষ আবাদ করে থাকেন। বড় জমিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারটা লাভদায়ক হলেও ছোট খামারে তা যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ। ছোট খামারে ব্যবহারিক দিক দিয়েও অসুবিধার সৃষ্টি হয় বড় মেশিনে। তাছাড়া ছোট জমিতে কাজ করার মতো খেতমজুরের সংখ্যাও কমে আসছে দিন দিন। শারীরিক পরিশ্রম ছাড়াও খেতমজুরের সাহায্যে চাষ আবাদে খরচও যেমন বেশি হয়, সময়ও লাগে অনেক। তার উপর উৎপাদন ব্যয় বেশি বলে লাভের মুখ দেখতে পান না কৃষকরা। ‘কমল কিষাণ’-এর কৃষিজ যন্ত্রপাতিগুলি ছোট চাষিদের শুধু পরিশ্রম থেকেই মুক্তি দেয়নি, চাষের খরচ কমিয়েছে অনেকটাই। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে উৎপাদন বেড়েছে অনেকাংশে। ধান বপন যন্ত্র, আলু তোলা ও শাক-সব্জি কাটার যন্ত্র, ফলের চারা রোপণ, আখ কাটা ও স্থানান্তরণের যন্ত্র প্রভৃতি নিয়ে ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে ‘কমল কিষাণ’। বিশেষ করে ধান রোপণ যন্ত্রের ব্যবহারটা এখন প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়ছে। এর ব্যবহারটা এতই সুবিধাজনক যে, তার জন্য আলাদা কোনও দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। এতে খরচও নাম মাত্র। একর প্রতি জমিতে মাত্র ১০০০ টাকায় ধান রোপণ করা যায় হাত প্যাডেল চালিত এই যন্ত্রটির সাহায্যে।

প্রথমদিকে খামারে এই সব যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে একটা সংশয় থেকে গিয়েছিল, যেটা এখনও পুরোপুরি মিটে যায়নি। দেবী’র কথায়, ‘কৃষকদের এই সব যন্ত্র ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলাটাই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। এই বিষয়ে যারা আমাদের যন্ত্র একবার ব্যবহার করেছে, তারা সাহায্য করেছে বাকিদের এর কার্যকারিতা বোঝাতে। তাদের কাছ থেকে আমরা যথেষ্ট ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। আমাকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে তারা জানিয়েছিলেন যে, আমাদের যন্ত্রপাতিগুলি তাদেরকে চাষ আবাদে কতটা সাহায্য করেছে। গোটা বিষয়টাই আমাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রেরণা জুগিয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়টাকে অর্ধেকে নামিয়ে আনার মতো নতুন নতুন যন্ত্র উদ্ভাবনের। আশা করি ২০১৫ সালের মধ্যেই অন্তত পক্ষে ৫০ হাজার কৃষকের হাতে আমরা তুলে দিতে পারব এই সব কৃষিজ সরঞ্জামগুলি’।