‘‘সোমালিয়ার মাদার টেরেসা’’ ডাঃ হাওয়া আবদির গল্প

মৃত্যুর কতই না ছল। আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় কখনও সে হানা দেয় দুর্ভিক্ষ হয়ে। কখনও সে অনাহার কিংবা গৃহযুদ্ধ। ডাঃ হাওয়া আবদি যেন মৃত্যুর সামনে এক দেওয়াল। চিকিৎসকের পেশা এবং সেবার ধর্মকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিএয় তিনি যেন হয়ে উঠেছেন দুঃস্থদের মা। আর্তদের মা। শরনার্থীদের মা। তাঁর আরও একটা নাম আছে। সোমা লিয়ার মাদার টেরেসা।

0

হাওয়া তাঁর দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সোমালিয়ায় চালাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। নাম – ডাঃ হাওয়া আবদি ফাউন্ডেশন (ডিএইচএএফ)।এই মুহূর্তে তা প্রায় ৯০ হাজার শরনার্থীকে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছে। দিচ্ছে চিকিৎসার সুযোগ। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাওয়া আবদি ফাউন্ডেশনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কর্মীর সংখ্যা শতাধিক। সঙ্গে রয়েছে কৃষক এবং মৎস্যজীবীদের নিয়ে গঠিত সুবিশাল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। যার ফলে ধীরে হলও সোমালিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক আন্দোলন। এখনও পর্যন্ত ফাউন্ডেশনের তরফ থেকে উপকৃত মানুষের সংখ্যা ২০ লক্ষ।

পুরানো সেই দিনের কথা

হাওয়া আবদির বয়স তখন খুব বেশি হলে ১২। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলেন তাঁর মা। সোমালিয়ায় মৃত্যুতো তো নতুন কিছু নয়। যে দেশে এখনও চিকিৎসার ন্যূনতম পরিকাঠামো নেই, সেখানে মৃত্যুই তো স্বাভাবিক। মাতৃশোকে বিহ্বল ছোট্ট মেয়ে নিল চিকিৎসক হওয়ার অঙ্গীকার। সে বাঁচাতে চায়। মায়ের মতো কাউকেে যেন না মরতে হয়। মৃত্যুর সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন হাওয়া।

অবশেষে সেই দিন কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি পাসের পর দেশে ফিরে গড়লেন রুরাল হেলথ্ ফাউন্ডে্শন। নাম বদলে যা এখন পরিচিত ডাঃ হাওয়া আবদি ফাউন্ডেশন নামে।

শুরুতে ছোট্ট একটা ঘরে ক্লিনিক। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সোমালিয়ায় সাধারণ মানুষের সন্দেহ তখন এতটাই যে হাওয়াকে পড়তে হল বাধার মুখে। তবুও চেষ্টা আর চেষ্টা। যারা এতদিন সন্দেহ করছিল, ঘোর অবিশ্বাসে ঠেলে ছিল দূরে, তারাই কিনা আসতে লাগল তরুণী হাওয়ার ক্লিনিকে। কী তার কারণ? কী সেই রহস্য? হাওয়ার দুই মেয়ে ডেকু এবং আমিনাও চিকিৎসক, মায়ের তৈরি ফাউন্ডেশনে তাঁরাও জড়িয়ে সক্রিয়ভাবে। পুরানো দিনের স্মৃযতি রোমন্থন করতে গিয়ে ডেকু জানালেন, রোগীদের চিকিৎসার সময় তাঁর মা সোমালিয়ার সনাতনী চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতেন। বোঝাতেন আধুনিক চিকিৎসা ঠিক কেন গ্রহণযোগ্য। এভাবে রোগও সারত, ভেঙে যেত অবিশ্বাস এবং সন্দেহের প্রাচীর। সোমালিয়ার প্রত্যন্ত এলাকা হাওয়াকে চিনল ‘‘ঘরের মেয়ে’’ হিসেবে। ২০১২ সালে সম্ভাব্য নোবেল প্রাপকদের তালিকায় ছিল তাঁর নাম।

দুই মেয়েকে নিজের মতো করেই গড়েছেন হাওয়া। তুলে ধরেছেন, সোমালিয়ার ঐতিহ্য। বোঝাতে চেয়েছেন, দেশটা গরিব হলেও মানুষগুলো অতিথিবৎসল।অপরিচিত মানুষদের ডেকে এনে , দাওয়ায় বসে তারা চা খেতে খেতে গল্প করে। ওদের সঙ্গে ঠিকভাবে মিশতে পারলে অল্প সময়ের মধ্যেই মজবুত হয় সম্পর্কের বন্ধন।

সংস্কৃতির নাম ডিএইচএএফ

সোমালিয়ার একটা সময় বলা হত ‘‘মেয়েদের জায়গা হল বাড়ির মধ্যে। সন্তান প্রতিপালন ছাড়া ওরা আর কী বা করতে পারে।’’ ঠিক সে সময় মহিলা রোগ বিশেষঞ্জ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে হাওয়া যেন দেশের হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন নারীশক্তির বিজয় পতাকা। তাঁর সংস্থায় তারুণ্য এবং মেধাই চালিকাশক্তি। অধিকাংশ কর্মীর বয়স তিরিশের নিচে। অল্পবয়সীদের কাছ থেকে নতুন পরিকল্পনা পেলে তা খোলা মনে গ্রহণ করেন হাওয়া।

গৃহযুদ্ধের সময় দুই মেয়ে এবং গুটিকয়েক চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে দিনে প্রায় তিনশো রোগী দেখতেন হাওয়া। মেয়ে ডেকু বলেন, রোগ যন্ত্রণায় কাতর দুঃস্থ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তাঁদের একমাত্র কাজ। হাওয়া অবদি ফাউন্ডেশনের হাসপাতাল হল একত্রিশ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সমস্ত সোমালি পুরুষ-মহিলার একমাত্র আশা-ভরসা। পরম নিশ্চয়তার স্থান।

সামাজিক ক্ষেত্র নিয়ে যারা কাজ করতে চান, তাদের হাওয়া কন্যা ডেকু তিনরকম পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, সমাজের নিচুতলায় যারা রয়েছেন, তাদের ভালোবাসতে পারলে, তবেই এ কাজে আসুন। স্থানীয় স্তরে মানুষের চাহিদা সম্পর্কে জানুন। কাজ করতে হবে তাঁদের চাহিদা মেটানোর জন্য। দ্বিতীয়ত, প্রতি মুহূর্তে লড়াই করে যারা বেঁচে রয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন। সামান্য খাবার এবং জলের জন্য সোমালিয়ায় শিশু এবং মহিলাদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। এমন সব মানুষের জন্য কাজ আমরা গর্বিত। তৃতীয়ত, আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। কিন্তু সময়ের চাহিদা মেনে পরিকল্পনাও বদলাতে হয়। কারণ দুনিয়া পরিবর্তনশীল।

সময়ের নিয়ম মেনে বদলায় সব কিছু। বদলায় চিকিৎসা ব্যবস্থা। বদলাতে হয় নিজেকেও। কিন্তু সোমালিয়ার মাদার টেরেসা হওয়ার আগেও যেমন ছিলেন, এখনও তাই। শত সহস্র সোমালির হাসিতেই তাঁর সুখ, যন্ত্রণায় আসে চোখে জল।