সাধ্যের মধ্যে ডায়ালিসিস, পথ দেখাল নেহরু প্লাস

0

ডায়ালিসিস। রোগী এবং রোগীর পরিবার, দু’জনের জন্যই যন্ত্রণাদায়ক। একদিকে শারীরিক কষ্ট। অন্যদিকে প্রিয়জনের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব হারানোর অবস্থা। ডায়ালিসিস বাস্তবিক অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যদি না ভর্তুকি দিতে এগিয়ে আসে সরকার বা বিমার ব্যবস্থা থাকে। মুম্বই কিডনি ফাউন্ডেশনের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে নেফ্রোলজিস্টের সংখ্যা ৯৫০, ডায়ালিসিস সেন্টার ৭ হাজার আর ডায়ালিসিস মেশিনের সংখ্যা চার হাজার। ছ’বছর আগেকার এই সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় ভারতে কিডনির অসুখে আক্রান্তদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। একদিকে ব্যয়বহুল চিকিৎসা, অন্যদিকে উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব। ২০০৯ সালে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস) ও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে। দেখা যায় ভারতে ক্রনিক কিডনি ডিজিজে (সিকেডি) আক্রান্ত ২ লক্ষ ৩০ হাজার রোগীর মধ্যে ৯০ শতাংশই চিকিৎসা শুরুর এক মাসের মধ্যে প্রাণ হারিয়ে থাকেন। দেখা গিয়েছে ভারতীয়দের একটা বড় অংশই কিডনি বা হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। যার মূলে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। এমনই এক পরিস্থিতিতে ২০০৯ সালে হায়দরাবাদে ‘নেহরু প্লাস’ (ডায়ালিসিস নেটওয়ার্ক) গড়ে তোলেন কমল শাহ, সন্দীপ গুড়িবান্দা এবং বিক্রম ভুপ্পালা।

বিক্রম ভুপ্পালা বলেন, ‘১৯৯৯ সালে খড়গপুর আইআইটি থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পরে প্রায় দশ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটাই। মার্কিন মুলুকে থাকার শেষ কয়েক বছর নিউ জার্সিতে ম্যাকিনসে অ্যান্ড কোম্পানিতে স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্ট ছিলাম। সে সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দেশে ফিরে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে কিছু একটা করব। বিশেষ করে হাইপারটেনশন ও ডায়াবিটিসের প্রকোপ আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সে সময় ভারতে ডায়াবিটিক পেশেন্টের সংখ্যাটা ছিল প্রায় সাড়ে ছ’কোটি আর হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ কোটি’। বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর করতে গিয়ে ভুপ্পালা খোঁজ পান কমল শাহ’র (একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার)। একটা সময় অ্যাপল সংস্থায় সফ্‌টওয়্যার ডেভেলপার হিসাবে কাজ করতেন কমল। ১৯৯৭ সালে ডায়াগনিসিসে ধরা পড়ে কমল হেমোলেটিক ইউরেমিক সিনড্রোমে আক্রান্ত। পরবর্তী ১২ বছর ডায়ালিসিসের ওপর ছিলেন কমল। এখনও তাই। সবমিলিয়ে ১৮টা বছর। তবে এখন অনেকটাই সুস্থ। প্রতিদিন সকালে সাঁতার কাটেন, মাসে একবার বেড়াতে যান আর কাজও করেন চুটিয়ে। কোথাও কোনও ফাঁকি নেই। বিক্রম-কমলের সঙ্গে যোগ দেন গুড়িবান্দা। বেঙ্গালুরুবাসী এই ইঞ্জিনিয়ার একটা সময় ক্যান্সার রোগীদের জন্য কাজ করা একটি সমাজসেবী সংস্থার যুক্ত ছিলেন। তিনজনেই একটা সিদ্ধান্তে আসেন। কিডনির অসুখে আক্রান্তদের সাধ্যের মধ্যে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই ‘নেহরু প্লাস’।


বিক্রম ভুপ্পালা , গুড়িবান্দা এবং কমল শাহ (বাঁদিক থেকে )
বিক্রম ভুপ্পালা , গুড়িবান্দা এবং কমল শাহ (বাঁদিক থেকে )

‘আমরা শুরুটা করেছিলাম হায়দরাবাদ দিয়েই। আসলে আমরা চেয়েছিলাম চেনা জায়গা দিয়েই শুরুটা হোক। এরপর হায়দরাবাদেই আর একটি সেন্টার খুললাম। আসলে দেখতে চাইছিলাম, একাধিক সেন্টার কীভাবে চালানো যায়। পরবর্তীকালে বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, পুনে, নয়ডা, রোহটাক, বোকারো, কানপুরেও সেন্টার খোলা হয়েছে। সবমিলিয়ে ১৪টি রাজ্যের ৩৪টি শহরে নেহরু প্লাসের সেন্টার রয়েছে। আমাদের মূলমন্ত্র একটাই। রোগীদের উচ্চমানের পরিষেবা দেওয়া। কিছু সমস্যাও এসেছে এবং আমরা তা পেরিয়েও গিয়েছি। অন্য রাজের ক্ষেত্রে অঞ্চলগত কিছু সমস্যাও থাকে। যেমন ধরা যাক উত্তর প্রদেশ। সবমিলিয়ে এখানকার রীতিনীতি একটু অন্য ধরনের। তা সত্ত্বেও এখানে আমাদের পাঁচটি সেন্টার রয়েছে’, বললেন ভুপ্পালা। সমস্যা ঠিক কোথায়? ভুপ্পালার কথায়, ‘মেট্রো শহরগুলির তুলনায় ছোট-ছোট শহরে কাজ করা বেশি কঠিন। এইসব জায়গায় চিকিৎসা সামগ্রীর পণ্য প্রবেশ কর কোথাও-কোথাও মাত্রাতিরিক্ত। তবে তার থেকেও যেটা বেশি সমস্যার তা হল সেন্টারে কাজ করার উপযুক্ত চিকিৎসক ও প্রশাসনিক কর্মীর অভাব। কর্মীদের কীভাবে ধরে রাখা যায় সেদিকে আমরা নজর দিয়েছি’।


এ গেল মানবসম্পদের বিষয়। এবার চোখ রাখা যাক চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়ে। ভুপ্পালা বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তি আমদানি করে থাকি জাপান বা জার্মানি থেকে। ভারতেই এর ডিস্ট্রিবউটর আছে। লাইসেন্সিংয়ের বিষয়টি উৎপাদনকারী সংস্থাই দেখে নেয়। ডায়ালিসিস মেশিন থেকে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণেরও কোনও ব্যাপার নেই। ফলে নিয়মের ক্ষেত্রেও তেমন কোনও কড়াকড়ি নেই। তবে হ্যাঁ, এইসব মেশিনের দাম যথেষ্ট চড়া। এক-একটার জন্য আমাদের ৭ লক্ষ টাকা খরচ পড়ে। কিন্তু অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও রোগীদের আমরা যতটা কম সম্ভব পয়সায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করে থাকি’। সেটাই বা সম্ভব হচ্ছে কীভাবে? এর উত্তরও দিয়েছেন ভুপ্পালা। তাঁর কথায়, নেহরু প্লাস এখন দেশের মধ্যে বৃহত্তম ডায়ালিসিস প্রোভাইডার। সে কারণেই সাধ্যের মধ্যে ডায়ালিসিস চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারছেন তাঁরা।


যত বেশি সম্ভব পেশেন্টের জন্য ডায়ালিসিসের ব্যবস্থা করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ব্যবস্থাও করে ফেলেছে নেহরু প্লাস। তবে সরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে সক্রিয়তার প্রশ্নে সময় বেশি লাগছে। কোনও কাজই দ্রুত হতে চায় না। সেই তুলনায় বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ অনেক বেশি গতিশীল। তবে এমনটা নয় যে নেহরু প্লাস সরকারের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে চায় না। বরং উল্টোটাই। নেহরু প্লাসের পরবর্তী লক্ষ্য, এশিয়ার অন্য দেশগুলিতে ছড়িয়ে যাওয়া। যাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম ডায়ালিসিস নেটওয়ার্কের স্বীকৃতি পেতে পারে নেহরু প্লাস।

চিকিৎসা মানেই খরচখরচা। রোগ যত জটিল, খরচও ততটাই চড়া। তা হলে দরিদ্ররা কী চিকিৎসা পাবে না? নেহরু প্লাসের প্রতিষ্ঠাতাদের বক্তব্য, ডায়ালিসিস অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ, নিজের পকেট থেকে সেই টাকা দিতে হলে অধিকাংশ ভারতবাসীই বিপাকে পড়েন। সরকারেরও তাই এগিয়ে আসা উচিত। এই রোগের চিকিৎসার বিষয়টি আরও সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত। তবে নেহরু প্লাস কিডনির রোগীদের উচ্চমানের চিকিৎসা যেভাবে করছে, সেভাবেই চালিয়ে যাবে।