জগদ্ধাত্রী পুজোয় কৃষ্ণনগরে অকাল ‘ধনতেরাস’

0

অকাল বোধনের কথা সবাই শুনেছেন। কিন্তু অকাল ধনতেরাসের কথা কি শুনেছেন কেউ কখনও? কৃষ্ণনগরে হয় সেই অকাল ধনতেরাস। উপলক্ষ জগদ্ধাত্রী পুজো। বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর রমরমার পিছনে একটা গপ্পো আছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে ব্যবসার তাগিদ। কৃষ্ণনগর সেই ব্যবসারই পীঠস্থান।

কথায় বলে ভক্তের ভগবান। ভক্তদের মনোবাঞ্ছা মাকে সোনার টিপ দেবে, কারও নিবেদন টিকলি কারও বা নথ আবার কেউ মানত করে রেখেছিল সোনার হার পরাবেন এবার পুজোয়। আর তাই কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো মানেই গয়নার দোকানে ভীড়। স্বর্ণালঙ্কারের ছড়াছড়ি। কয়েকশো ভরি সোনার গয়নার পাহাড়।ভালই লক্ষ্মীযোগ হয় কৃষ্ণনগররে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের। পরিসংখ্যান বলছে জগদ্ধাত্রী পুজোর হিড়িকে কয়েক দিনে নদিয়ার সদর শহরে গয়না কেনার যে ধুম পড়ে তাতে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হয়। অকাল ‘ধনতেরাস’।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরে কৃষ্ণনগরে শুরু হয়েছিল জগদ্ধাত্রী পুজো। রাজ্যপাট না থাকলেও কয়েকটি পুজোতে খানদানি ভাব এতটুকু কমেনি। প্রাচীন এই শহরে থিমের পুজোর রমরমা হলেও, এখনও চাষাপাড়া বারোয়ারির বুড়িমা, কাঁঠালপোতা বারোয়ারির ছোটমা বা মালোপাড়া বারোয়ারির জলেশ্বরী মা নিজস্বতায় অনন্য। এই পুজোগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিমার সাজ বা অলঙ্কার। প্রায় ৫০০ ভরি অলঙ্কারের ‘মালিক’ বুড়িমার পুজো মিথের পর্যায়ে পৌঁছেছে। টিপ, নথ, টিকলি, বালা থেকে হার। বুড়িমাকে এই সব অলঙ্কার দিয়েই সাজান উত্সাহীরা। সব কিছুই সোনার। এমনকী দেবীর বাহন সিংহও কম গহনা পায় না। বড়মার মতো এত অলঙ্কার না পেলেও খুব একটা কম যায় না ছোটমা বা জলেশ্বরী মা। মানত বা মনোস্কামনা পূরণের জন্য এভাবে দেবীকে অলঙ্কার নিবেদন করেন ভক্তরা। দেবীকে ঘিরে মানুষের এই আবেগ ও বিশ্বাস কৃষ্ণনগরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও শিল্পীদের পৌষ মাস এনে দিয়েছে।

দুর্গাপুজো বা ধনতেরাস নয়, রাজার শহরে আসল ‘ধনতেরাস’ শুরু হয় জগদ্ধাত্রী পুজোয়। কৃষ্ণনগর শহরে প্রায় একশোটি সোনার দোকান রয়েছে। আর কৃষ্ণনগরের ‘বউবাজার’ বলতে বোঝায় হাই স্ট্রিটকে। এখানে অন্তত ৫০টি সোনার দোকান রয়েছে। সোনাপট্টির এক ব্যবসায়ী সুদীপ কর্মকার জানালেন, ‘‘শুধু সোনার টিপ বিক্রি করেই লক্ষাধিক টাকা এসেছে। অন্যান্য অলঙ্কার ধরলে টাকার অঙ্ক পাঁচ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে।’’ শহরের সোনার দোকানগুলিতে ৮০ টাকা থেকে সোনার টিপের দাম শুরু হয়। নথের দাম অন্তত ৫০০ টাকা। জগদ্ধাত্রী পুজোতে স্বর্ণালঙ্কারের ব্যবসা সম্পর্কে ভারতীয় স্বর্ণকার সমিতির সভাপতি সুভাষ কর্মকার বলেন, ‘‘এবার জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় সোনার ভরি ২৫ হাজার টাকায় নীচে নেমে আসে। তার ফলে বিক্রি ভালই হয়েছে। দাম নাগালের মধ্যে থাকায় এবার সবথেকে বেশি চাহিদা ছিল টিপের। দোকান প্রতি গড়ে পাঁচ লাখ টাকার বিক্রি ধরলে শুধু কৃষ্ণনগরে এবার জগদ্ধাত্রী পুজোয় প্রায় ৫ কোটির সোনার ব্যবসা হয়েছে।’’ কৃষ্ণনগর স্টেশন রোড এলাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ী সুশোভন সরকারের মতে ব্যবসার হিসেব ধরলে কৃষ্ণনগরের ‘ধনতেরাস’ জগদ্ধাত্রী পুজো। বছরের সবথেকে সোনা বিক্রি এই সময়ই হয়।

১০০ টাকার মধ্যে সোনা কেনার এমন সুযোগ আর কে ছাড়ে। অধিকাংশ দোকানেই তাই সোনার টিপ কেনার হুড়োহুড়ি। মানুষের ‘গোল্ড রাশ’ শুধু কৃষ্ণনগর শহর নয়, ধুবুলিয়া, নবদ্বীপ, মাজদিয়াতেও দেখা গিয়েছে। এবার বুড়িমার কাছে টিপ মানত করেছিলেন বাদকুল্লার সুমিতা সরকার। তাঁর কথায়, ‘‘গতবারের থেকে এ বছর সোনার দাম বেশ কিছুটা কম। তাই ৫০০ টাকায় অনেক বড় টিপ কিনতে পেরেছি।’’ সুমিতার মতো অনেকেই এই কথা বলছেন। বাইরের লোক বেশি আসায় বিক্রিটাও তাই এবার বেশি। বাজেটের মধ্যে সোনা পেয়ে যাওয়ায় ক্রেতারাও যেমন খুশি তেমন হাসি ফুটিয়েছে ব্যবসায়ীদের। দর্শনার্থী বা স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা মেজাজে থাকলেও যত চিন্তা পুলিশের। মণ মণ সোনা পাহাড়া দেওয়া কী চাট্টিখানা ব্যাপার।