রুম অ্যাটেন্ডেন্ট থেকে 'নিজেই ব্ৰ্যান্ড' হাবড়ার সুপ্রিয়

3

আজ আপনাদের এক হায়দরাবাদী সুপ্রিয়র কথা বলব। হায়দরাবাদী বলার কারণ আছে। যদিও সুপ্রিয় চক্রবর্তী আদ্যোপান্ত বাংলার মানুষ। বাংলার ছেলে। হাবড়া অশোকনগরে বাড়ি। আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতই ও স্বপ্ন দেখত একদিন এতটাই বড় হবে দেশের দশজন ওকে চিনবে। নিজেই হবে একটি আস্ত ব্র্যান্ড। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করেছিল সুপ্রিয়। কিন্তু ইচ্ছেগুলো খুব সাদামাটা ছিল না। তাই ও ইঞ্জিনিয়ার হতে ছোটেনি। উকিল হওয়ার কথা ভাবেনি। যেকোনও কলেজে অনার্স বা পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে যায়নি। ওকে টেনেছিল হসপিটালটি। আলোঝলমলে হোটেল ইন্ডাস্ট্রি।

সল্টলেকের আইআইএইচএমের ছাত্র সুপ্রিয়কে বন্ধুরা চেনে আবেগপ্রবণ নরম মনের মানুষ বলে। আচারে ব্যবহারে ভীষণ নম্র। ভীষণ রুচিশীল। ভদ্র মানুষ সুপ্রিয় নিজেকে নিয়ত ভেঙেছেন গড়েছেন। এবং আবিষ্কার করেছেন। আজ আমরা ওর ভাঙা গড়ার গল্পই শুনব।

জাঁকিয়ে শীত পড়ার কিছু আগে সুপ্রিয় এসেছিলেন কলকাতায়। তাঁর নিজের সংস্থা আকারের কলকাতা সংস্করণ চালু করার উদ্দেশ্যে। সেই সুবাদেই আলাপ। বলছিলেন নিজের জীবনের লড়াইয়ের দিন গুলোর কথা। তিরিশ অনূর্ধ্ব এই যুবক এরই মধ্যে জীবনের নানান খড়খড়ে সত্যিটা দেখে ফেলেছেন। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কাজ করতে করতে দেখে ফেলেছেন কত কাণ্ড করতে হয়। একটা সময় হোটেল ম্যানেজমেন্ট পাশ করে প্রথম যে চাকরি করতে ছুটেছিল সুপ্রিয় সেখানে রীতিমত রুম অ্যাটেন্ডেন্টের কাজ করেছেন। বিছানা পরিষ্কার করা। ঘরের কোণায় ফুল রাখা। নরম প্লাস্টিকে মোড়ানো আপেল কলা হোটেলের ঘরে সাজিয়ে রাখার পাশাপাশি টয়লেটও সাফ করার কাজ করেছেন মাসের পর মাস। একেক সময় ওর মনে হয়েছে মাটিতে মিশে যাই। কখনও নিজের ইগো এতটাই চোখের বালির মত কচকচ করেছে যে কেঁদেই ফেলেছেন সুপ্রিয় চক্রবর্তী। মাস মাইনে তখন মাত্র সাত হাজার টাকা। কী হয় ওতে! মাসের শেষের দিকে শুধু ম্যাগি খেয়েই কাটিয়ে দিতে হয়েছে। রাতে মায়ের ফোন এলে ডুকরে উঠেছেন একদিন। আড়ালে বলেছেন তাঁর যন্ত্রণার কথা।

সুপ্রিয়র মা ভগবতী দেবী নন, সারদা মাও নন। কিন্তু চিন্তার স্পষ্টতায় তিনি ঈশ্বরী পাটনির চেয়ে কোনও অংশে কমও নন। তবু ছেলেকে সেদিন হৃদয়ে শক্ত হয়ে বলেছিলেন, “তুমি কী করবে সেটা তোমাকেই ঠিক করতে হবে। চাকরি করবে কি করবে না এই সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। কারণ কেরিয়ারটা তোমার। বড় সাধ করে তুমি হোটেল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ নিয়েছ। ইঞ্জিনিয়ার হও নি। উকিল হতে চাওনি। অন্য কোনও পথে যাওয়ার কথা ভাবো নি। ফলে এখনও রাস্তা তোমার সামনে প্রশস্ত।” 

মায়ের সঙ্গে টেলিফোনে ওই যে কয়েক মিনিট কথা বলেন সুপ্রিয় সেই বিন্দু থেকেই যেন দিশা পেয়ে যান হাবড়া অশোক নগরের ছেলেটা। সুদূর হায়দরাবাদে বসেই চটজলদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। চাকরিটা ছাড়বেন। ছাড়লেন। কিন্তু আবেদন করলেন তাঁকে যেন ফ্রন্ট ডেস্কে রিসেপশনে কাজ দেওয়া হয়। মঞ্জুরও হল আবেদন। এবার শুরু হল সুপ্রিয়র আরেকটা ইনিংস।

জনসংযোগের সুযোগ। হাজার একটা মানুষের মন বুঝে ফেলার তাঁর সহজাত বিদ্যেটা এবার ভেলকি দেখাতে শুরু করল। মানুষের মন পড়া যেন জলভাত। কর্পোরেট ক্লায়েন্ট কী চাইছেন, কিংবা হাতের মেহেন্দি শুকোয়নি এমন যুগলই বা কী চান। সব যেন ক্রেতার চাহনি দেখেই পড়ে ফেলতে পারেন সুপ্রিয়। সেই থেকে নিজেকে আরও আরও মেলে ধরার সুযোগ পেলেন। প্যাশনের সঙ্গে কাজ করতে থাকলেন। এবং ডাক পেলেন আই আই এইচ এম হায়দরাবাদের ফ্যাকাল্টি হওয়ার। আরও একবার তাঁর দেখা হল নিজের সঙ্গে। ছাত্রদের চাহিদা বোঝার অবকাশ পেলেন। তাদের সমস্যাগুলো টের পেলেন। এবং সাধারণ ছাত্রদের উন্নতির অন্তরায় কোথায় তাও আবিষ্কার করলেন তিনি।

আইআইএইচএমে আরও অনেক দায়িত্বই পেতে থাকলেন সুপ্রিয়। সেলস মার্কেটিং থেকে ব্র্যান্ডিং। কাজের সূত্রে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরতে হত। বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করতে হত। সাফল্যের সঙ্গে সেসব ঝক্কি উৎরে দিতে পারলে পরম তৃপ্তির অভিজ্ঞতাও লুকলেন না। এসবের মধ্যে দিয়েই নিজেকে আরও বেশি বেশি করে চিনেছেন। আর ছোটবেলার সেই বড় হওয়ার স্বপ্নটাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

খুলে ফেলেছেন আকার। আকার আসলে এমন একটি কনসালটেন্সি ফার্ম যার মোটো Empower Yourself, নিজেকে স্বাবলম্বী কর। তরুণ প্রজন্মের কাছে এ যেন সুপ্রিয়র আবেদন। যদি জিজ্ঞেস করেন কী কাজ করে এই আকার। তাহলে বলে রাখি এই কনসালটেন্সি ফার্মটি কিন্তু আপনার ব্যক্তিত্বের খোল নলচেই বদলে দেওয়ার খেমতা রাখে। রীতিমত বিজ্ঞানসম্মত কায়দায় আপনার মনের ভাষা পড়ে সেই মত আপনার ব্যক্তিত্বকে আকার দেয় এই সংস্থা। নিউরো লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রাম মারফত, ছাত্রদের মনের অন্দরমহলের জড়িয়ে থাকা অস্পষ্টতা কাটিয়ে স্বচ্ছ ভাবনার স্রোত রীতিমত বইয়ে দিতে পারে আকার। শুধু ভাষা শেখানো হয় না। তাকানো থেকে শুরু করে ওঠা বসা চলা ফেরা। আবেগ অনুভূতি এবং বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ শরীরের ভাষায় ফুটিয়ে তোলার গোপন বিদ্যেটাও শিখিয়ে দেবে সুপ্রিয়র টিম।

সে অর্থে দেখতে গেলে সুপ্রিয়র আকার কোনও স্টার্টআপ নয়। সুপ্রিয় স্টার্টআপ হিসেবে উল্লেখও করেন না। কিন্তু স্টার্টআপ উদ্যোগপতিদের জন্যে সুপ্রিয়র এই কোর্স, এবং উপদেশ দারুণ কার্যকরী। বিশেষ করে উদ্যোগপতিরা যখন বিনিয়োগকারীর সামনে গিয়ে দাঁড়ান তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় বিনিয়োগ টানার সম্ভাবনা। আর প্রথম দর্শনই কীভাবে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর করে তোলা যায় সেটা শিখিয়ে দিতে পারেন সুপ্রিয়। কিন্তু প্রশ্ন হল উদ্যোগপতিরা কি সুপ্রিয়র টার্গেট অডিয়েন্স! প্রশ্নটা ঘুরছিল। জিজ্ঞেস করতেই এক গাল হেসে বললেন, ওরা তো বটেই, কর্পোরেট দুনিয়ার পদস্থ কর্তা থেকে কলেজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, ছাত্র... এমনকি দুঁদে রাজনীতিবিদরাও যোগাযোগ করছেন ওর স্পেশালাইজড কোর্সের টিপস নিতে।

বিভিন্ন রকমের ক্লায়েন্টের জন্যে বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যবস্থা আছে। তবে সুপ্রিয়র বক্তব্য তরুণ প্রজন্মকে নিজের পায়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড় করানোর ইচ্ছেটাই ওর কাছে সব থেকে প্রবল।

নেশা বলতে হতদরিদ্র শিশুদের সঙ্গে খেলতে ভালোবাসেন, সুবিক্ষা নামে একটি সমাজসেবী সংস্থা খুলে ওদের বিকাশের কাজও করছেন অকাতরে। শূন্য থেকে শুরু করে, লড়াইয়ের পর লড়াই করে আজ আমাদের সুপ্রিয় নিজের স্বপ্নের কাছে পৌঁছেছেন।

Related Stories