জোড়া রিয়েল এস্টেট স্টার্টআপ, নীলেশের বাজিমাত

0

তাঁর পরিবারের অনেকে আর্কিটেকচারের সঙ্গে যুক্ত। এমন পরিবারের ছেলে আর্কিটেকচারে ঝাঁপাবেন, সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের জীবনের নকশা অন্যভাবেই আঁকলেন নীলেশ যাদব। লন্ডনে আর্কিটেকচার কলেজে পড়ার সময় ব্যালে নাঁচ, কারপেন্ট্রি এসব নিয়েই মেতে থাকতেন। একটু ফাঁকা সময় পেলেই নতুন ধরনের কোনও নির্মাণ সামগ্রী তৈরির চেষ্টা করতেন। আসলে সাধারণ কিছু জিনিস দিয়ে অন্যরকম কিছু বানানোর একটা নেশা পেয়ে বসেছিল তাঁকে। লন্ডন ছাড়ার পরে বেশ কয়েক বছর নামি আর্কিটেকচারাল ফার্ম Kohn Pedersen Fox Associates-এ কাটান নীলেশ।

টেক ওয়ান- InPod

২০১১ সালে মুম্বই ফিরে আসেন নীলেশ। নতুন কী উদ্ভাবন করা যায় তা নিয়ে দিনরাত পড়ে থাকতেন। ২০১৩ সালে শুরু করলেন Annan Infrastructure Pvt. Ltd নামে সংস্থা। ঘর ও অফিসে পোর্টেবল লাইফস্পেস তৈরি করাই সংস্থার কাজ। পোর্টেবল এই লাইফস্পেসের নাম রাখা হয় Inpod. এই পডসগুলি মজবুত, হালকা ও স্ক্র্যাচপ্রুফ পোর্টেবল স্ট্র্যাকচার। যা তৈরি করা হয় inskin থেকে। ইনস্কিন জার্মান প্রযুক্তিতে তৈরি এক বিশেষ ধরনের বিল্ডিং মেটিরিয়াল। যা দিয়ে হালকা ধরনের দ্রুতগামী বোট বা নৌকা তৈরি হয়।

নিজের টাকাকড়ি দিয়েই স্টার্টআপ গড়েছিলেন নীলেশ। এই মডিউলার বিল্ডিং সিস্টেমের পেটেন্টও নিয়ে নেন তিনি। এরপর শুরু হয় রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট, ভিলা ও স্যাম্পল অ্যাপার্টমেন্টসের জন্য অর্ডার নেওয়া। ১০০০ থেকে ১৫০০ স্কোয়ার ফিট প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের দাম রাখা হয় ২৫ থেকে ৫৫ লক্ষ টাকার মধ্যে।এই ধরনের বিল্ডিং যে কোনও জায়গাতেই তৈরি করা যায়। অ্যাসেম্বল বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। বিভিন্ন অংশ জুড়ে দিলেই বাড়ি তৈরি। "এটা গাড়ির মতোই, আমরা তাই বিজ্ঞাপনে একথাই বলব, ‘Just buy it and live in it’," বললেন নীলেশ। এখনও পর্যন্ত এ ধরনের ১৩০টি মডিউল বিক্রি করেছেন নীলেশ। তাঁর আশা চলতি আর্থিক বছরের শেষে আরও ৩০০টি বিক্রি করতে পারবেন।

Wadhwa Group ও Mahindra Lifespaces- সহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় বিল্ডার ও ডেভেলপার তাদের নমুনা ফ্ল্যাটের ডিসপ্লের জন্য এই প্লাগ অ্যান্ড প্লে পডস ব্যবহার করছে। ভারতীয় রেলও আন্ধেরি রেল স্টেশনে এই পডস ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে জনসচেতনতা বাড়াতে কোনও ট্রেন দুর্ঘটনার প্রোটোটাইপ তুলে ধরা হবে।

টেক টু - EstateUp

ইনপড দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরে ব্যবসার অধিকাংশ দায়িত্ব স্ত্রী অবনী যাদবের হাতে তুলে দেন নীলেশ। আসলে আরও নতুন কিছু করতে চাইছিলেন তিনি। একসময় দুবাইয়ে কিছুদিন কনসাল্টিং আর্কিটেক্ট হিসাবে নীলেশ কাটিয়েছিলেন। মনে পড়ল সেই সময়ের একটা কথা। দুবাইয়ের প্রপার্টি মার্কেটে সবচেয়ে বেশি লগ্নি করেন রুশ ও ভারতীয়রা। সেই ভাবনা থেকে নতুন পথ খুঁজে নিলেন নীলেশ। এমন রেসিডেন্সিয়াল ফ্ল্যাট তৈরি করতে হবে যাতে কিছু অংশ প্রপার্টিতে লগ্নি করতে পারবেন সাধারণ মানুষ। আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে জোট বাঁধলেন দুবাইয়ের বাসিন্দা আকর্ষণ কাথুরিয়ার সঙ্গে।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হল পথ চলা। ৮০ হাজার ডলার লগ্নি করে দু'জনে গড়ে তুললেন EstateUp. দুবাইয়ে যারা সম্পত্তি করতে চান তাদের জন্য একটা ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম। আংশিক মালিকানার এই কনসেপ্টই এখন বিশ্বজুড়ে চলছে। এই মডেলে বিনিয়োগকারী মালিকানার একাংশ এবং ভাড়া বাবদ একটা টাকা পাবেন। অর্থাৎ লগ্নিকারী দু'ভাবে রিটার্ন পাবেন। ঠিক এই মডেলেই কাজ করছে বেঙ্গালুরুর একটি স্টার্টআপ Bricks Property Investment LLP.

কীভাবে কাজ হয় এই মডেলে? একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা সহজ করে বোঝালেন নীলেশ। দুবাইয়ে একটা ফার্নিশড কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের দাম পড়ে প্রায় ২২ হাজার ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা)। ধরা যাক সেই বিল্ডিংয়ের মালিক হলেন ১৬ জন, যাঁরা প্রত্যেকেই ১৪০০ ডলার ক'রে লগ্নি করেছেন। বিল্ডিং তৈরি হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। তৈরি হওয়ার পরে তা লিজ বা ভাড়ায় দেওয়া হল ৩৬ হাজার ডলারে। এ ক্ষেত্রে রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট (ROI of 1.5X) দাঁড়াল লগ্নিকারী প্রতি প্রায় ৭০০ ডলার। এ প্রসঙ্গে নীলেশ জানালেন, দুবাইয়ে গত দু'বছর ধরে সম্পত্তির দাম বার্ষিক প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। সেই হিসাবে ROI হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে।

এখন তাহলে কী করছেন নীলেশ? আপাতত দুবাইয়ে একটি রেসিডেন্সিয়াল প্রপার্টির জন্য ফান্ড তোলা হচ্ছে। পরিকল্পনায় রয়েছে সৌদি আরবের একটি প্রজেক্টও। লক্ষ্য হল চলতি বছরের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছ'টি প্রজেক্টের জন্য লগ্নিপুঁজির ব্যবস্থা করা।

লেখা - অপর্ণা ঘোষ