ভারতীয় শস্যের প্রতিটি দানা বাঁচাবে অনুরাগের SIGO

0

আপনি কি জানেন শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের সেরা তিনটি দেশের একটি। এদেশে প্রতিবছর ২৬৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন উন্নতমানের শস্য উৎপন্ন হয়? গোটা বিশ্বের জনসংখ্যার অন্তত ছয় ভাগের মুখে অাহার জোগায় ভারত। অথচ এদেশের ১৭ শতাংশ মানুষ আজও অপু্ষ্টিতে ভোগেন। কি বিচিত্র পরিসংখ্য়ান!

বাস্তবটা বিচিত্রই লেগেছিল অনুরাগ অওস্থির। কিন্তু আর পাঁচজনের মতো ভবিতব্যের হাতে ছেড়়ে দিতে রাজি ছিলেন না অনুরাগ। সামাজিক উদ্যোগপতি বলে কথা!

উৎপাদিত শস্যের নষ্ট হয়ে যাওয়া, এবং এদেশে বাড়তে থাকা অপুষ্টি - এই দুটি বিষয় নিয়েই চিন্তিত ছিলেন লখ্‌নৌ-এর এই সামাজিক উদ্যোগপতি। কিছুদিন ওয়াশিংটন ডি সি-তে বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন। সে সময় প্রথম নজরে আসে বৈপরিত্য। ভারতের কৃষিক্ষেত্র নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। কারণ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষই কৃষিজীবী। দেশের জিডিপি-র কুড়ি শতাংশই আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি নিয়েই গবেষণা শুরু করেন অনুরাগ। বুঝতে পারেন, শস্য সংরক্ষণ আমাদের ফুড সাপ্লাই চেন-এ একটা বড় সমস্যা। 

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট এবং মাঝারি কৃষকেরা শুধুমাত্র শস্য সংরক্ষণ করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েন। শস্য সস্তায় বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পাশাপাশি বর্ষায় শস্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এবং ঋণের বোঝা মাথার উপর থাকায় অনেকেই তাড়াহুড়ো করে শস্য বিক্রি করে দিতে চান।

এই তথ্য পাওয়ার পরই Save Indian Grain. Org (SIGO) প্রতিষ্ঠা করেন অনুরাগ। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শস্য সংরক্ষণের ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট এবং ডেলিভারি - এই তিনটি বিষয়ে নজর দেয় এই সংস্থা। পাশাপাশি, সঠিক বাজার, সাপ্লাই চেন ডিরেক্টরি তৈরী এবং ক্লাস্টার ম্যাপের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের সুবিধার দিকটিও দেখতে শুরু করে SIGO।

হার্ভেস্ট সিজনে বাজারে সরাসরি শস্য বিক্রি করলে সরকারের নির্ধারিত ন্যুনতম বিক্রয়মূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম পাওয়া যায়। ফলে, ওইসময় খোলাবাজারে শস্য বিক্রি করলে আখেরে কৃষকদের ক্ষতিই হয়। এই বিষয়টিও নজর কাড়ে অনুরাগ আওয়স্থি-র। "আমরা এই জায়গাটাই সকলের সামনে তুলে ধরতে চাই এবং ওয়্যারহাউস ও পোস্ট-মার্কেট ইয়ার্ড-এর মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে চাই।"

এই সমস্ত তথ্যকে এক জায়গায় নিয়ে এসে ক্ষতির পরিমাণ হিসেব করার জন্য বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকের প্রয়োজন। কোনও অ্যাগ্রো ইকোনমিস্ট বা কৃষিক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব রয়েছে এমন কোনও ব্যক্তির পক্ষেই সঠিকভাবে এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিক্স-এর বিশ্লেষণ সম্ভব। SIGO Google Map এবং API-এর সাহায্যে এই সমস্ত তথ্যকে ভিস্যুয়ালি একটি পেজে তুলে ধরে। উৎপাদক. কৃষি-ব্যবসা, এবং যেসব সংস্থা কৃষিকাজ বা কৃষি-শিল্পের উপর নির্ভরশীল তাদের উপর ভিত্তি করে ক্লাস্টার ম্যাপ তৈরী করা হয়। এই ম্যাপ তাদের যোগাযোগ, নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে, ঐক্যবদ্ধবাবে কোনও সমস্যার সমাধান করতে এবং একসঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করে।

অনুরাগ জানালেন, "কয়েকজন অবস্রপ্রাপ্ত আইআইটিয়ান, যাঁরা নিজেদের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে সমাজের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে চান, তাঁরা পরামর্শদাতা হিসেবে এই প্রজেক্টের সঙ্গে কাজ করছেন।"

'হপার-বটম সিলো' নামের এমন এক হাই টেনসাইল গ্যালভ্যানাইজড স্টোরেজ বিন যা সহজেই ভেজা শস্য সংরক্ষণ করতে পারে পরবর্তী মরশুম পর্যন্ত বীজ সংরক্ষণ করতে পারে, আবার শুকনো বীজকেও সংরক্ষণ করতে পারে। এটা প্রস্তুত করার পর SIGO এই প্রোডাক্টের মার্কেটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। কৃষকরা যেভাবে শস্যদানা সংরক্ষণে সমস্যার সম্মুখীন হন তার অবসান ঘটানোই ছিল এই প্রোডাক্টর লক্ষ্য।

এই কাজ করার সময় অনুরাগ কৃষি এবং খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। তাঁদের পরামর্শ মেনেই অনুরাগ সরাসরি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে তাঁদের সমস্যার কথা জানতে চান।

"আমি লখনউ এর কাছেই বিভিন্ন জায়গার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলি। সবজি মান্ডিগুলিতেও যাতায়াত শুরু করি।" এরপরই অনুরাগ উপলব্ধি করেন, মার্কেটিং ডিজাইন করার জন্য বেস-অফ-দ্য-পিরামিড অর্থাৎ BOP মার্কেট কে বুঝতে হবে। অন ফিল্ড রিসার্চ শেষে অনুরাগ একটি ফ্ল্যাট-বটম-ফার্ম বিন ডিজাইনের কাজ শুরু করেন। তাঁর মতে প্রযুক্তি এবং বিজনেস মডেল এমন হওয়া উচিত যাতে সব স্তরের মানুষ তা ব্যবহার করতে পারেন। বাছাই করা কয়েকজনের জন্য প্রোডাক্ট তৈরী করে কোনও লাভ নেই।

SIGO কাজ করতে শুরু করার পর কৃষিকাজ থেকে শুরু করে কৃষি পরবর্তী ক্ষতি এবং পুরো সাপ্লাই চেন সম্পর্কে বোঝার কাজটা সহজ হয়ে যায়। "দু'বছর ধরে আমরা শুধুমাত্র বিভিন্ন সমস্যা, তাদের লক্ষণ বুঝতে শেখা, আমাদের কাজের মূল অংশীদার - কৃষক এবং সর্বশেষ গ্রাহক, এদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করি।" তাঁদের সমস্যা সম্পর্কে পুরোপুরি বুঝতে পারার পরেই আমরা সমাধান সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা শুরু করি। কম খরচে সমস্যার সমাধান করতে পারাই ছিল আমাদের লক্ষ্য।

SIGO সবে পথ চলা শুরু করেছে এবং এখনও তারা কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের কাছে পৌঁছতে পারেনি। তবে কর্পোরেট সেক্টর, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের এনজিও, বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং এদেশের সরকার এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছাপ্রকাশ করেছে।

এই মুহূর্তে বিনিয়োগের সন্ধানে রয়েছে SIGO। বিশ্বজুড়ে, অন্তত ৪০০ কোটি মানুষ বছরে ৩,০০০ ইউ এস ডলার অর্থাৎ দৈনিক ৮ডলার রোজগার করেন। এই জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই ভারত এবং চীনে বাস করে এবং এঁদের রোজগারের ৭০ শতাংশই খাবারে খরচ হয়ে যায়। 

২০৬০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের জনসংখ্যা ৯০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে যা খাদ্য উৎপন্ন হয় তার চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির পরিমাণ, জলবায়ুর অকস্মাৎ পরিবর্তন, বদলাতে থাকা বৃষ্টিপাতের ধাঁচ - সবমিলিয়ে কৃষিকাজের পাশাপাশি শস্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।

আর বাড়তে থাকা এই ফুড সিকিওরিটি চ্যালেঞ্জ-এর বার্তা এদেশের সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার মোকাবিলা করাই SIGO-র মূল লক্ষ্য।

লেখা - সিন্ধু কাশ্যপ,অনুবাদ - বিদিশা ব্যানার্জী