যে কোনও সময় পাল্টে যেতে পারে পাশা

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির এই বিজয় রথের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করলেন আশুতোষ।

1

পাঁচ রাজ্যে ভোটের ফল প্রকাশের পরপরই এই কলাম লিখতে চেয়েছিলাম। পারিনি। আসল ছবিটা সামনে আসার অপেক্ষায় ছিলাম। গত কয়েক সপ্তাহে অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেক ভবিষ্যৎবাণী, গবেষণা সব হয়েছে। তিনটি বিষয় উঠে এসেছে, যেগুলি নিয়ে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন-

১. মোদীর বিজয়রথ থামার লক্ষণ নেই এবং ২০১৯ এর সংসদীয় নির্বাচনের আগে তাঁকে রোখার চেষ্টা বৃথা।
২. অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধী নিজেকে দলের বাহাদুর শাহ জাফর প্রমাণ করছেন।
৩. সমসাময়িক রাজনীতিতে এএপিকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বলে মনে করা হলেও সুবিধে হল না তেমন একটা।

অস্বীকার করার উপায় নেই, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে বড় জয় পেয়েছে বিজেপি। রাজনীতিবিদরা ত্রিশঙ্কু লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবং যেকোনও একটি দল অন্য দুটির কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সবসময়। কেউ কেউ অবশ্য বলেছিলেন, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বিজেপি, কিন্তু এতবড় জয়ের ভাবনা ঘুণাক্ষরে কারও মনে আসেনি। কেউ ভাবেনি মাত্র ১৮টি আসন পেয়ে বিধানসভার দৌড় শেষ করবে বিএসপি। মোদীর নেতৃত্বে ৮০ শতাংশ আসন বিজেপির দখলে,যাকে মিরাকল ছাড়া কীই বা বলা যায়। প্রমাণিত হয়ে গেল শরিকদের নিয়ে ২০১৪ য় বিজেপির ক্লিন সুইপ এক্কেবারে ফ্লুক নয়। উত্তরাখণ্ডেও বড় জয় বিজেপির। কিন্তু একমাত্র ইউপি সবার নজর কেড়েছে। মোদীর কাজ করার পদ্ধতি নিয়ে সব সমালোচনার মু-তোড় জবাব দেওয়া গিয়েছে।এও বলা শুরু হয়েছে,২০১৯ এ আরও বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবেন মোদী।

যদি বলি এখনই এই নিয়ে বলা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে, আমার কথা কেউ মানতে চাইবেন না। দুবছরের সামন্য কটা দিন বেশি বাকি সংসদীয় নির্বাচনের। যদিও বলা হয়,রাজনীতিতে এক সপ্তাহও অনেক বেশি সময়, কে জানে কখন পাশার দান পাল্টে যায়। ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাগে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর মিসেস গান্ধী দুর্গার অবতারে ফিরে এসেছিলেন। বলা হচ্ছিল ভারত মানেই ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু বাহাত্তরের শেষের দিকে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে থাকে। পঁচাত্তরে ইন্দিরা সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছায় জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে হেরে যান তিনি। সেবার প্রথম কোনও অকংগ্রেসী সরকার ক্ষমতায় আসে,যা একেবারেই আশাতীত ছিল।

একইভাবে, দাদু এবং মা সংসদীয় নির্বাচনে যা কোনও দিন করতে পারেননি ১৯৮৪ সালে ৪০৫টি আসন জিতে তাই করে দেখিয়েছেন রাজীব গান্ধী। কিন্তু ৮৭ তে বোফোর্স কেলেঙ্কারিতে এতটাই কালিমালিপ্ত হয়েছিলেন যে ৮৯ এ ভিপি সিংকে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিতে হয়। ফিল গুড ফ্যাক্টর নিয়ে ২০০৪ এ অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারকে দেখে মনে হচ্ছিল ভালই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনে সহজে জয় আসবে বলে মনে হলেও প্রবলভাবে হারতে হয় তাদের। ২০০৯ এর মধ্যে পরপর দুবার হারতে হয় বিজেপিকে। অন্তর্দলীয় কোন্দলে এতটাই মাথাচাড়া দেয় যে ২০১৪তেও মনে হচ্ছিল বিজেপির কোনও ভবিষ্যৎ নেই। বরং ২০১৯ এর জন্য প্রস্তুত হওয়া ভালো। কিন্তু সবাই জানেন কীভাবে গোটা দৃশ্যপট পাল্টে গেল। প্রায় ধূলোয় মিশে গেল কংগ্রেস। বলা যেতে পারে, এখনও পর্যন্ত মোদীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল,কিন্তু এই সাফল্য কতদিন ধরে রাখতে পারবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তো থাকছেই। যদি পারেন তাহলে কোনও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে না তাঁকে, অন্যথায় ভিন্ন ইতিহাস লেখা হবে।

উল্টোভাবেও দেখা যায়। মোদীর ক্যারিশমা সত্ত্বেও বিজেপি বা এনডিএ জোট শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডে জয় হাসিল করতে পেরেছে। বিজেপি এখানে ক্ষমতায় ছিল না। অন্যদিকে, পাঞ্জাব আর গোয়ায় ক্ষমতায় থাকা বিজেপিকে হারের মুখ দেখতে হয়েছে। মণিপুরেও আসনের বিচারে প্রথম কংগ্রেস। পাঞ্জাবে বিজেপি-অকালি জোট রুখতে পারেনি বড় মার্জিনে কংগ্রেসের জয়। গোয়াতেও মানুষ বিজেপিকে বর্জন করেছে, যদিও বিধায়ক কেনাবেচা করে শেষ পর্যন্ত বিজেপিই সরকার গড়েছে। মণিপুরেও সোজা রাস্তায় ক্ষমতায় যেতে পারেনি বিজেপি। তার মানে দেখা যাচ্ছে যেখানে বিজেপি এবং তার শরিকরা মানুষের ভরসা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে জনগণ তাদের ত্যাগ করেছে। ফলে মোদি ক্যরিশমা দিয়ে সবসময় জয় আসবে ভেবে নিলে নিজের পায়ে কুড়ুল মারা হবে। প্রধানমন্ত্রীর গদি অটুট রাখতে হলে তাঁকে ফল দেখাতে হবে, বিশেষ করে আর্থিক ক্ষেত্রে।

কাদায় হাতি পড়ার মতো অবস্থা কিন্তু কংগ্রেসের। দলের বিপর্যয়ের দায় নিতে হবে রাহুলকেই। তাঁর নেতৃত্বে নিয়ে প্রশ্ন এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে যে পাঞ্জাব, গোয়া, মণিপুরে কংগ্রেস ভালো ফল করেও তার বাহবা দাবি করতে পারছেন না। উল্টে দলের মধ্যে গুঞ্জন, এবার নেতৃত্বে বদল আনা হোক অথবা রাহুল তাঁর নেতৃত্বের স্টাইল পাল্টান। রাহুলের বড় সমস্যা হল তাঁকে এমন নেতার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে যিনি তাঁর জনপ্রিয়তার সেরা ফর্মের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সৎ বা অসৎ যে কোনও উপায়ে ক্ষমতা দখলের পরও কোনও বিতর্কের সম্মুখীন হচ্ছেন না। অরুণাচল এবং উত্তরাখণ্ড সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে কংগ্রেসকে জাতীয় রাজনীতিতে অর্থহীন করে দেওয়া তাঁর পরিকল্পনার একটা ঝলক ছিল। হালের উদাহরণ গোয়া এবং মণিপুর, যেখানে কংগ্রেসকে সরকার গড়তেই দিল না বিজেপি। রাহুল অনেকটা রক্ষণাত্মক। সোনিয়া গান্ধীর মতো দলের সিনিয়র নেতাদের সমীহ আদায় করে নিতে পারেননি রাজীব তনয়। দলের অন্দরেই ক্ষোভ, রাহুল নিজের সাঙ্গপাঙ্গ পরিবেষ্টিত থাকতেই পছন্দ করেন এবং আইডিয়াগুলিও ঢিমে লয়ের। নতুন দিশা দেখাতে হবে। নতুন স্বপ্ন বেচতে হবে। কংগ্রেসকে তার আইডিয়া এমনভাবে বাজারজাত করতে হবে যাতে নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিশা দেখতে পান দেশের মানুষ। নিজেকে বদলাতে পারলে তবেই টিকবেন কংগ্রেস সহ সভাপতি। একটু বেশি বলা হয়ে গেল বোধহয় !

এটা ঠিক যে, পাঞ্জাবের ভোটে এএপিকে নিয়েও আশার আলো দেখা গিয়েছিল। মিডিয়া একসময় পূর্বাভাস দিয়েছিল মাফলার ম্যানের দল এখানে তিন চুতুর্থাংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেতে পারে। গোয়াতেও ভালো ফলের আশা ছিল। কিন্তু শরিককে নিয়ে পাঞ্জাবে মাত্র ২২টি সিট জেতা গিয়েছে। গোয়াতে খাতাই খোলা হয়নি। ২০১৪ য় ৪০৯ টি সিটে হারার পর সমালোচকরা যেমন আপের শোকগাঁথা লিখে ফেলেছিলেন এবারও তাই হচ্ছে। কিন্তু ঠিক পরের বছর ২০১৫য় সব সমালোচনার জবাব দিয়ে ব্যাপকভাবে ফিরে এসেছিল দল। সবাই ভুলে যান মাত্র চার বছর বয়েস দলটির। এত কম সময়ে দলটি দিল্লিতে দু বার সরকার গড়েছে। অন্যান্য রাজ্যে মূল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। এটাও কম অর্জন নয়। অন্যন্য রাজনৈতিক দল বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয় এখন এএপি যে অবস্থায় আছে সেখানে পৌঁছতে। দু দশকের বেশি সময় ইউপি থেকেও বিজেপির ভোটপ্রাপ্তি ১৯৮০ সালে ছিল ৩ শতাংশ এবং ১০৮৪ সালে ৪ শতাংশ।

এএপি হারিয়ে যাচ্ছে না এটা তো নিশ্চিত। সমালোকরা আবারও হতাশ হবেন। দেশে শক্ত বিরোধী দল দরকার যাতে সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে বিতর্ক, সমালোচনার রাস্তা বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না। সংখ্যলঘুদের অধিকার বজায় থাকতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও তারা যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। বিবিধের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে সহিষ্ণুতা জরুরি। মানুষ এখন বিজেপি-আরএসএক কে ক্ষমতায় এনেছে। কিন্তু গণতন্ত্রে দৃশ্যপট বদলাতে সময় লাগে না, যেমনটা হয়েছিল বাজপেয়ী জমানায়।১০ বছর সময় লেগেছিল আবার ফিরে আসতে।

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)