"ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরাই internet.org এর বিরোধিতা করছেন," জুকারবার্গ

0

মার্ক জুকারবার্গ, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। সম্প্রতি আইআইটি দিল্লিতে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগ দেন জুকারবার্গ। ফ্রি বেসিক ইনিশিয়েটিভ (পূর্বের internet.org) এর কারণে সমাজের নানা অংশের কাছে সমালোচনার মুখে পড়ে ফেসবুক। অনেকেই এটিকে নেট নিউট্রালিটির পরিপন্থী মনে করছেন। ফেসবুক প্রথম থেকেই ফ্রি বেসিক ইনিশিয়েটিভ-এ তাদের সমর্থনের বিষয় কট্টর মনোভাব দেখিয়েছে কিন্তু চাপের মুখে পড়ে সম্প্রতি তারা তাদের প্ল্যাটফর্মটি আরও কিছু ডেভেলপারের জন্য খুলে দিয়েছে।

প্রশ্নোত্তর পর্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানে তুলে দেওয়া হল।

বিশ্বের প্রেক্ষিতে ভারতের গুরুত্ব প্রসঙ্গে

ভারতের বিষয় ফেসবুকের আগ্রহ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জুকারবার্গ বলেন, "আমাদের লক্ষ্য পৃথিবীর প্রত্যেককে যুক্ত করা। ভারত পৃথিবীর সবথেকে বড় গণতন্ত্র, ভারতকে যুক্ত না করে পৃথিবীর এই সংযোগ সম্ভব নয়"।

ফ্রি বেসিক (internet.org) প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জুকারবার্গ বলেন, বর্তমানে ২৪ টি দেশে এটি চালু রয়েছে এবং প্রায় ১৫ মিলিয়ন গ্রাহক এর অংশ। এটিকে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত করার পথে চ্যালেঞ্জগুলির বিষয় বলতে গিয়ে তিনি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রাপ্যতাঃ ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা প্ল্যান, স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ নেই অনেক গ্রাহকের।

ক্রয় ক্ষমতাঃ সাধারণ স্মার্ট ফোন থাকলেও অনেক গ্রাহকই ইন্টারনেট ডেটা ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা খরচ করতে অক্ষম।

সচেতনতাঃ অনেক গ্রাহক রয়েছেন যাদের ইন্টারনেট করার ডিভাইস রয়েছে এবং তাঁরা ডেটাও কিনতে পারেন কিন্তু ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার সুবিধাগুলি সম্পর্কে যথেষ্ট জানা বোঝা নেই তাঁদের।

ফেসবুক নতুন নতুন পদ্ধতিতে কাজ করে এই বাধাগুলি অতিক্রম করতে চাইছে। আরও বেশি সুবিধাজনক মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা যাতে কম ডেটা খরচ হয়, প্রত্যন্ত এলাকায় সৌর-শক্তি এয়ারপ্লেনের সাহায্যে ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছনো ইত্যাদি এমনই কিছু উদ্যোগ।

প্রযুক্তিই কী সর্বোচ্চ সুপার পাওয়ার?

একজন ছাত্র জুকারবার্গকে জিজ্ঞেস করেন, ভিনগ্রহের প্রাণী যদি তাঁকে একটি সুপার পাওয়ার দিতে চায় তিনি কী চাইবেন? উত্তরে জুকারবার্গ বলেন, প্রযুক্তি মানুষকে সুপার পাওয়ার দিচ্ছে, এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন কীভাবে অকালাস রিফ্ট মানুষকে বিকল্প বাস্তবে পৌঁছতে (টেলিপোর্ট) সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক জায়গায় থাকা মানুষ, এর সাহায্যে এক জায়গায় আসবে ও অসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা করবেন। আমরা মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করে মহাশূন্যে বা জলের নীচে পিংপং খেলতে পারব বা মাধ্যাকর্ষণ বিরোধী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারব। খুব তাড়াতাড়িই একটি হেডসেট পড়ে পৃথিবীর যেকোনও জায়গায় পৌঁছে যেতে পারবেন আপনি”।

ফেসবুক, লেখা এবং ছবি থেকে ভিডিওতে এখন বেশি জোর দিচ্ছে। জুকারবার্গ বলেন, “ইন্টারনেটের এই স্বর্ণযুগে ভাব আদানপ্রদানের প্রাথমিক মাধ্যম হয়ে উঠতে চলেছে ইন্টারনেট। গল্প বলার জন্য ভিডিও একটি অত্যন্ত কার্যকরী মাধ্যম, কিন্তু মানুষ আরও বেশি শক্তিশালী মাধ্যম খুঁজছেন আর সেখানেই আসে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি”।

internet.org কী নেট নিউট্রালিটিকে সমর্থন করে?

জুকারবার্গের উত্তর, “অবশ্যই। নেট নিউট্রালিটির শর্তগুলি কী হওয়া উচিত সে বিষয় দেশগুলি তর্ক বিতর্ক চালাচ্ছে। আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মনীতির বিষয় কাজ করছি। মানুষের ক্ষতি করে এরকম কিছু যাতে কোম্পানিগুলি করতে না পারে সে বিষয় অবশ্যই নিয়ম থাকা প্রয়োজন। যেমন কোনও অপারেটর যদি আপনার থেকে অতিরিক্ত টাকা চায়, এই নিয়মের মাধ্যমে তা আটকানো যাবে। ভালো নেট নিউট্রালিটির নিয়মগুলি মানুষকে সাহায্য করবে।

জুকারবার্গ জোর দিয়ে বলেন Internet.org এর উদ্দেশ্য সৎ এবং যারা ইতিমধ্যেই ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যবহার করছেন তাঁদের থেকেই বিরোধিতা এসেছে। তিনি বলেন, “নেট-নিউট্রালিটির পক্ষে সওয়ালকারীরা নিজেরা ইন্টারনেটের সুবিধা ভোগ করেন। কিন্তু বাকিরা ইন্টারনেট পরিষেবা বৃদ্ধির জন্য অনলাইন পিটিশনে সই করতে পারেন না। যাদের কন্ঠস্বর পৌঁছয় না তাঁদের কথা ভাবা আমাদের সকলেরই কর্তব্য”।

কোনও জাদু নয়

জুকারবার্গ বলেন তাদের গোটা যাত্রাপথে কোনও ইউরেকা মুহুর্ত নেই, এবং তাঁরা কখনওই ভাবতে পারেননি এত দ্রুত ফেসবুক সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, “আমার স্কুলের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমি ফেসবুকের প্রথম ভার্সনটি তৈরি করি। তারপর থেকে আমারা সেটাকে শুধু আরও উন্নত করে গিয়েছি আর নতুন নতুন জিনিস তৈরি করেছি। আমরা শুধু একটার পর একটা জিনিস তৈরি করেছি আর সেটাই ফ্যাশন হয়ে গিয়েছে।

ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয় বলতে গিয়ে জুকারবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পের কথা বলেন, এই প্রকল্প দৃষ্টিহীনদের ছবির বিষয় বর্ণনা করে শোনাবে।

আদর্শ শুরুয়াতি ব্যবসার উপাদান

জুকারবার্গ বলেন ইদানিংকালে অনেকেই প্রথমে একটি কোম্পানি শুরু করবে বলে ঠিক করে ও পরে কী ব্যবসা, কী ভাবে হবে সেই সব বিষয় ভাবনা চিন্তা করে, উল্টোটা না করে। তিনি বলেন, “আমি যতগুলি বড় কোম্পানির কথা জানি প্রতিটি এমন মানুষদের দ্বারা শুরু হয় যারা কোনও একটি বিষয় নিয়ে ভাবিত ছিল। যে সব উদ্যোগপতি খুব বড় কোম্পানি খুলেছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেরাই ভাবেননি তাঁদের কোম্পানি এত বড় হবে। তাই আমার পরামর্শ হল আপনি কী নিয়ে ভাবিত সে বিষয় মনোযোগ দিন, কোম্পানি খোলার সিদ্ধান্তে নয়।

তিনি আরও মনে করেন যেসব কোম্পানির একাধিক প্রতিষ্ঠাতা সেগুলি সাধারণত বেশি সফল হয়। তিনি বলেন, “একজন মানুষ যত শক্তিশালীই হন না কেন, একটি কোম্পানি চালানোর সব কটি দিক তাঁর একার পক্ষে দেখা সম্ভব না। একাধিক প্রতিষ্ঠাতা ও দক্ষ টিম আপনাকে অনেক বেশি ভালভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে”। ফেসবুকের সাফল্যের স্তম্ভ হিসেবে জুকারবার্গ তাঁর সহকর্মী শেরাইল স্যান্ডবার্গ, ক্রিস হিউগস, জয় পারিখ ও অন্যান্যদের নাম করেন।

চলার পথে ভুল

তাঁর ফেসবুকের যাত্রা পথে সবথেকে ভুল কোনটি জানতে চাইলে জুকারবার্গ হাসতে হাসতে বলেন, “শুধু একটা? আমি সবধরণের ভুল করেছি। পণ্য থেকে প্রযুক্তিগত যতরকমের ভুল হতে পারে। শুরু করার সময় আমি একজন কলেজ ছাত্র ছিলাম এবং সবকিছুই আমি ভুল এবং চেষ্টা থেকে শিখেছি।

তিনি মনে করেন কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে সেদিকে মন না দিয়ে একজনের উচিত কী তাঁদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করে সেদিকে মনযোগ দেওয়া।

অ্যাম্বার অ্যালার্ট

সচেতনতা প্রসার ও দুর্যোগের সময় বাস্তব সময়ে খবর আদান প্রদানের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া বর্তমানে একটি বড় ভূমিকা নিচ্ছে। এই বিষয়ে জুকারবার্গ অ্যাম্বার অ্যালার্টের কথা বলেন। বর্তমানে ইউনাইটেড স্টেটস্ ও কানাডায় এটি চালু রয়েছে। যদি কোনও শিশু নিরুদ্দেশ হয় তাহলে ফেসবুক তার ছবি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য নির্দিষ্ট গ্রাহকদের নিউজ ফিডে দেখায়। প্রায় একবছর হল এই ফিচারটি শুরু হয়েছে এবং গ্রাহকরা খুব ভালভাবে এটি গ্রহণ করেছেন, এখনও অবধি একজন শিশুকে এটির মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।