কম্পিউটার ছেড়ে ট্যাটুতে মন ভরাচ্ছেন সৈকত

0

দিনভর ডানা ঝাঁপটে উড়ে বেড়ানোর নেশা। নিজেকে বলেন উড়ন্ত পাখি। আর সেই জন্যই হয়ত বেশ কয়েক বছর কর্পোরেটের খাঁচায় কাজ করেও মন বসাতে পারেননি। স্বাধীনতার হাতছানিতে হঠাৎ একদিন বেরিয়ে পড়লেন অন্য গন্তব্যের সন্ধানে। সৈকত সরকার। কম্পিউটার হার্ডওয়ার নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দশ বছর কাটিয়ে, কর্পোরেটের নিশ্চিন্ত চাকরি ছেড়ে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন ট্যাটু আঁকাকেই। রোজগার তো আছেই, সঙ্গে মনের খোরাক। উড়ন্ত পাখির জন্য আর কী চাই?

পড়াশোনা, বড় হওয়া বেলুড়ে। বেলুড়মঠ রামকৃষ্ণ মিশন থেকে কম্পিউটার হার্ডওয়ার নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ারিং পাশের পর নিজের প্রথম স্টার্টআপ মেট্রিক্স কম্পিউটার খুলে ফেলেন। সেই সময় অ্যাসেম্বলড কম্পিউটারের চল ছিল। সেটাই করত মেট্রিক্স কম্পিউটার। একই সঙ্গে চাকরি করতেন বিএসএনএল-এ। সেখান থেকে পরে উইপ্রো সহ বেশকয়েকটি সংস্থায় কাজ করেন। ছোটবেলা থেকে আঁকার হাত বড় ভালো সৈকতের। অনেকটা পারিবারিক প্রাপ্তি। বাড়ির সবাই কোনও না কোনওভাবে আঁকাআঁকিতে জড়িয়ে। প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি চলত আঁকার তালিম। বেলুড় থেকে মৌলালিতে ইলা দত্তর কাছে আঁকা শিখতে আসত ছোট্ট সৈকত। বঙ্গীয় সঙ্গীত পরিষদ থেকে আঁকায় বেচেলর্স টিচার্স ডিগ্রি পান। বহু জায়গায় প্রদর্শনী করেছেন। সনাতন দিন্দার মতো শিল্পীদের চোখের সামনে বিখ্যাত হতে দেখেছেন। আঁকার প্রতি টান রক্তেই ছিল সৈকতের।

চাকরি করতে করতে একসময় যন্ত্র আর কম্পিউটারে হাঁপিয়ে ওঠে সৈকতের শিল্পীমন। মাঝে মাঝেই বিদ্রোহ করত। ঠিক সেই সময়, বছর পাঁচেক আগে, চণ্ডীগড় বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে নতুন জগতের সন্ধান পেলেন বছর বত্রিশের সৈকত। বন্ধুর গায়ে ট্যাটু করাতে এসেছিলেন একজন। ভালো আঁকতে জানতেন বলে বন্ধুর চাপাচাপিতে ট্যাটুর ডিজাইন দেন। ব্যাস, ওই ঢুকে গেল মাথায়। কলকাতা ফিরে এলেও মন থেকে মুছল না ট্যাটুর টান। বন্ধুর কাছ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে ফের চণ্ডীগড় গিয়ে ট্যাটুর ওপর ১৫ দিনের কোর্স করেন। আঁকা তো জানতেনই, শুধু ট্যাটু করার পদ্ধতিটুকু জানাই দরকার ছিল। ফিরে এসে উত্তরপাড়ায় ইমোশন নামে স্টুডিও খুলে ফেলেন। সৈকত বলেন, ‘ট্যাটু করতে শেখার পর সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় নিজের শিল্পীমন দিয়ে। যত হাত পাকবে, ট্যাটুর ধরনও পালটাতে থাকবে’। তবে ইমোশন এখন আর উত্তরপাড়ায় নেই। বেলুড়ের বাড়িতেই ইমোশনের ব্র্যান্ডে ট্যাটুর কাজ চলে। দমদমে নতুন আরও বড় আকারে স্টুডিও খোলার পরিকল্পনা চলছে বলে জানান সৈকত।

কম্পিউটারের যন্ত্রপাতি, তার, ডিভাইস ছাড়ার পর ৪ বছর কেটে গিয়েছে। এক সময়ের হার্ডওয়ার ইঞ্জিনিয়ারের হাতের যাদুতে এখন ট্রাইবাল, মাউড়ি, ট্র্যাডিশনাল, ডটট্যাটু, বায়োমেকানিক্যাল ট্যাটু এবং থ্রি ডি ট্যাটু জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে শরীরের নানা অংশে। এক এখটা ট্যাটু করে এক হাজার থেকে ৩০, ৪০, ৫০ এমনকী ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার। সৈকত জানান, দাম কেমন হবে নির্ভর করে ট্যাটুর ধরনের ওপর। টলিউডের সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সৈকতের ক্লায়েন্ট। সৈকত বলেন, ‘কর্পোরেটে নিশ্চিন্ত চাকরি, বেতন অনেক। কিন্তু বাঁধাধরা গত আমার ভালো লাগে না। ১০ বছরে শান্তি পাইনি। মনের খোরাক মেটেনি। আমি চাই সারাদিন পাখির মতো উড়ে বেড়াতে। পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে যেতে, ট্রেকিং বা বাইকে লম্বা ট্রিপ নেশার মতো টানতে থাকে আমাকে’। কিছুদিন আগে বাইক ট্রিপে লাদাখ ঘুরে এসেছেন। কথায় বলে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। যেখানেই যান না কেন ট্যাটুর কিট হাতছাড়া করেন না সৈকত। তাই ঘুরতে গিয়েও ট্যাটু করে বেড়ান।

বছর খানেক হল ট্যাটুর কাজ করছেন। কোনও বাড়তি প্রচার ছাড়াই ইতিমধ্যে ট্যাটুর জন্য বিখ্যাত রাজা পাইন, নিলয়, বিপ্লব, মহাদেব, কবীরদের নামের সারিতে এখন সৈকতও জায়গা করে নিয়েছেন। কলকাতার বাইরে নানা রাজ্য থেকে ডাক আসে। মাসের অর্ধেকটা বাইরে বাইরেই কাটে। তবে ফিরে আসেন শেকড়ের টানে। বলেন, ‘ডাক এলেও কলকাতা ছেড়ে যেতে পারব না। আড্ডাপ্রিয় আমি। কলকাতা ছেড়ে, কলকাতার আড্ডা, পরিবেশ ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেই পারি না’।

শুধু ট্যাটুতেই আটকে নেই সৈকত। বাড়িতে বাচ্চাদের জন্য আঁকার স্কুল খুলেছেন। ‘ছোট ছোট আঁকিয়েদের সঙ্গে সপ্তাহে একটা দিন কাটিয়ে শরীরে নতুন করে অক্সিজেন পুরে নিই। মজা করতে করতে আঁকতে শেখে ওরা। গল্প হয় কত’, বলেন শিল্পী-উদ্যোক্তা। বিশ্বাস করেন চেতন ভগতের থ্রি ইডিয়টসের মতো গল্পে। ওই গল্পের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান সৈকত। যখন যা ভালো লেগেছে, করেছেন। বিশ্বাস ছিল, হেরে যাবেন না। আর তাই অনেক দেরিতে এই পেশায় এলেও ট্যাটুর জগতে প্রতিনিয়ত নিজের হাতযশের ছাপ রেখে যাচ্ছেন এই কম্পিউটার হার্ডওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।