উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ দিলেন কোলা ম্যান আরজেসি

0

থামস আপ, লিমকা, মাজা-নতুন করে চেনানোর প্রয়োজন নেই। ভারতের বাজার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এইসব নরম পানীয়। তাছাড়া সিট্রা, গোল্ডস্পট এবং জলের বোতল বিসলারিও বহুল প্রচলিত। এই সাফল্য ছাপিয়ে গিয়েছে ব্র্যান্ডের স্রষ্টার নামকেও। যিনি একরকম একা হাতে নিজের ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ২০ বছর পর যখন কোকাকোলার কাছে সবটাই বিক্রি করে দিলেন তখনও গ্রাহকের কাছে নামগুলির জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাঁটা পড়েনি। আসুন তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই আপনাদের।

রমেশ জে চৌহান। আরজেসি নামেই পরিচিতি বেশি। যেভাবে তিলতিল করে সফট ড্রিঙ্কসের ব্র্যান্ডের পরিচিতি দিয়েছেন বাজারে, আরেক ভেঞ্চার বিগ বাইটের ক্ষেত্রেও সমান সময় এবং চেষ্টা বিনিয়োগ করেছেন। বিগ বাইট ভিত নাড়িয়ে দিতে পারত ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের। সারা জীবনে ৬টি সফল ব্র্যান্ড যিনি গড়েছেন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। একথা সেকথায় বহুমূল্য শিক্ষাও পেলাম তাঁর কাছ থেকে।

যে কোনও ব্যবসার জন্য গ্রাহকের মন বোঝা সবচেয়ে জরুরি। আরজেসি সেটা ভালোই বুঝেছিলেন। তিনি যে সময় ব্যবসা শুরু করছিলেন তখন এখনকার মতো উদ্যোক্তার রমরমা ছিল না। ‘যখন যেভাবে যা আসছিল সেটাই করছিলাম। বিরাট কোনও প্ল্যানিং ছিল না। পুঁথিগত নীতির চাইতে মনের জোরের ওপর নির্ভর করে কাজ করতাম। তোড়ের সঙ্গে এগিয়ে যাও, ভুল হলে শুধরে নাও। যা করবে সেটাই তোমার কাজের স্টাইল’, বলেন আরজেসি। তাঁর উপদেশ, মার্কেট শেয়ার, প্রতিযোগিতা এইসবের কাছে মাথা নোয়াতে নেই। ‘ব্যবসার উন্নতির জন্য যা দরকার তাই কর, নিজের ভেতরের ডাক শোনো। তার জন্য পাইচার্ট, মার্কেট ফিগার এইসবের দরকার নেই’, তিনি বলেন। ‘যদি আমার প্রতিযোগীরা এগিয়ে যায়, বস চেঁচাচ্ছেন বলে আমি কি তাদের বারণ করতে পারব? সেটা সম্ভব নয়। তাই লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি স্থির করে রাখতে হবে, নিজেকে শোধরাতে শোধরাতে এগোতে হবে। কখনও হারতে হবে না’, তাঁর উপদেশ। আরজেসি এবং তার বাবা জয়ন্তীলাল চৌহান নিজেদের মনের কথা শুনেছেন এবং সংস্থা গড়ার বিশ্বাস অর্জন করেছেন। যে নীতিতে তাঁরা ব্যবসা করছেন হতে পারে পুরনো ধারণা, কিন্তু বেশ কার্যকর। অফিসে ব্ল্যাকবোর্ড রাখতেন ব্যবসার হিসেব রাখার জন্য এবং টিমকে গাইড করতেন, উৎসাহ দিতেন। ‘কেউ বলে দেবে না কী করতে হবে। যদি জানা না থাকে ইশ্বর দেখবেন। দোকানদার সেই মাল রাখবেন যেটা ভালো লাভ দেবে। প্রথমেই যদি নিজের পণ্য রাখার জন্য তাদের প্রভাবিত করা না যায়, তাহলে পিছিয়ে পড়া অনিবার্য। অধ্যবসায় থাকতে হবে’, আরজেসির সংযোজন।

বিসলারি ইন্টারন্যাশনালে আরজেসি প্রতিদিন ট্যালেন্ট খুঁজে বের করে প্রমোট করতেন। ফলে অনেক বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন এমন লোকের অভাব নেই। আরজেসির মতে, একটা লোকের যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি নয়। তাঁর মতে, ‘যদি কারও শেখার ক্ষিধে থাকে, তাহলে তিনি যা করবেন, বড় বড় ডিগ্রি নিয়ে এসেও অনেকে তা করতে পারবেন না’। তাঁর মতে, ‘বিগ বাইট মুখ থুবড়ে পড়ার কারণ ছিল ঠিক জায়গায় ঠিক লোক না পাওয়া। সবাই সফল ব্র্যান্ডের সঙ্গে থাকতে চায়, কেউ নতুন ব্র্যান্ডের দিকে সহজে ফিরে তাকায় না। যখন বুঝতে পারলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। যারা নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী তাদের নিয়েই টিম গড়া প্রয়োজন’।

আরজেসি সবসময় ব্র্যান্ডে বিশ্বাস করতেন। আর ভরসা রাখতেন ব্যবসা গড়ার ভূমিকায়। ব্যবসা মানেই ব্র্যান্ড। ‘সাবান, চাল, নুন থেকে গাড়ি, যাই হোক না কেন সবার লক্ষ্য কিন্তু ব্র্যান্ড’, তিনি বলেন। আরজেসি স্বীকার করেন, অনেক ব্র্যান্ড তৈরির সাফল্য তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে বটে, তবে আসল হিরো বিজ্ঞাপন সংস্থাই, যাদের প্রচারের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। ‘আমার কনসেপ্ট ছিল সোজাসাপটা। আমি একটা ছোট এজেন্সি খুঁজছিলাম যার কর্নধার আমাদের বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ এবং নিজের অ্যাকাউন্টের দিকে নজর রাখবেন’, আরজেসি নিজের ফর্মূলা বলছিলেন। লিমকা বাজারে পরিচিতি পেয়েছিল ভারতীয় কনসেপ্ট নিম্বু পানির চমকে ভর করে। সাংবাদিক এবং বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ কে কুরেন আমুল বাটার নামটাকেই ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। মাজা এসেছিল ডিউকের পানীয় ম্যাঙ্গোলা থেকে,যার পেছনেও সেই কুরেনেরই অবদান। কিন্তু ম্যাঙ্গোলা সেভাবে পরিচিতি পায়নি। সেই জায়গাটাই ধরে নিয়েছিলেন আরজেসি। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাজা ছিল ভারতের বাজারে প্রথম কাচের বোতলে নরম পানীয়। কোক এবং পেপসির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে ১৯৭৭ সালে বাজারে আসে ব্র্যান্ড থামস-আপ। আরজেসি বলেন, কঠিন লড়াই ছিল। তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করে কোলা দানার নির্যাস ব্যবহার করেননি। ভারতীয়দের একটু কড়া স্বাদ দিতে স্থানীয় উপকরণ যেমন জায়ফল, যষ্টিমধু, দারচিনি এবং ভ্যানিলা দিয়ে অন্যরকম কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে কোকাকোলা থামস-আপ অধিগ্রহণ করে। সেই থামস-আপই বিদেশি ব্র্যান্ডগুলির সঙ্গে সমান তালে বাজার কাঁপাচ্ছে। থামস-আপেরএই সাফল্যই প্রমাণ করে আরজেসি কী করতে চেয়েছিলেন-‘গ্রাহককে বোঝো, নিজের পণ্যে বিশ্বাস রাখো এবং আগ্রাসী হও’।

আরজেসি এঞ্জেল ইনভেস্টর নন। স্টার্টআপ নিয়ে খুব একটা উৎসাহও নেই তাঁর। ‘আমি সেইসব খারাপ শ্রেণির মধ্যে পড়ি যারা নিজের দাপটে চলে। তাই নতুন উদ্যোক্তাদের কী বলতে হবে আমি জানি না’, সোজাসাপটা আরজেসি। তাঁর উপদেশ হল, ‘বড় ব্র্যান্ড তৈরি করতে হলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। মনে মনে ভেবে নিচ্ছি সফল হব, তাতে আমি বিশ্বাস করি না। আগাগোড়া সব ভালো হতে হবে। একটু ভুল হলেই সব শেষ। আমি বলছি না, সব কিছুর উত্তর থাকতে হবে। কিন্তু মূল ধারণা থেকে একটু বেশিই জানতে হবে’। আরজেসি বলেন, ‘ভারতেই অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। যা করতে চাও তাতে আবেগ ঢেলে দাও। লক্ষ্যে স্থির থাক। বাজারে যা দেখবে, শুনবে তার ভিত্তিতে করণীয় ঠিক করবে’।